হামের চিকিৎসায় ঋণের বোঝা, কমছে না সংক্রমণ, বাড়ছে মৃত্যুও

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৫:৪০:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৪ বার পড়া হয়েছে
হাম শুধু শিশুদের অসুস্থ করে থামেনি, অনেক পরিবারের ঘরেও নামিয়ে এনেছে আর্থিক সংকট। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে মিললেও ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাতায়াত, খাবার ও হাসপাতালে অবস্থানের আনুষঙ্গিক খরচ সামলাতে গিয়ে ঋণের বোঝা নিতে হয়েছে আক্রান্ত ৮৯ শতাংশ পরিবারকে। অর্থাৎ হামে আক্রান্ত প্রতি ১০টি পরিবারের প্রায় ৯টিকেই চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে ধারদেনার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) ও ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি) পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে এমন উদ্বেগজনক চিত্র।
জরিপ অনুযায়ী, হামের চিকিৎসার খরচ জোগাতে ৬১ শতাংশ পরিবার নিজেদের সঞ্চয় ভেঙেছে। সম্পদ বিক্রি করতে হয়েছে ৪ শতাংশ পরিবারকে। আর ৩ শতাংশ পরিবার চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে নির্ভর করেছে দান বা মানবিক সহায়তার ওপর।
তবে আর্থিক ক্ষতির গল্প শুধু চিকিৎসা ব্যয়ে থেমে থাকেনি। অসুস্থ সন্তানের পাশে হাসপাতালে থাকতে গিয়ে অনেক অভিভাবক নিয়মিত কাজে যেতে পারেননি। এতে কারও দৈনিক মজুরি বন্ধ হয়েছে, কারও মাসিক আয় কমেছে। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে কেউ কেউ চাকরিও হারিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত পরিবারগুলোর ওপর।
জরিপে দেখা গেছে, একজন হামে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট খাতে গড়ে ১৫ হাজার ৬১১ টাকা খরচ হয়েছে। কোনো কোনো পরিবারের ক্ষেত্রে সেই ব্যয় বেড়ে ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের ৭৮ শতাংশের প্রধান উপার্জনকারীই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। এসব পরিবারের আয়ও খুব বেশি নয়। ৪০ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা, ৩২ শতাংশের আয় ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা। ১৬ শতাংশ পরিবারের আয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং ১২ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ৬ হাজার টাকারও কম।
কমছে না সংক্রমণ, বাড়ছে মৃত্যুও
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা এখনও উদ্বেগ তৈরি করছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৬৯ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, নিশ্চিত হামে এ পর্যন্ত ১০০ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ৯০২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২ জনে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে জানানো হয়, মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে একজন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়—৪০৪ জন। এরপর সিলেটে ১৫৬, রাজশাহীতে ৯২, ময়মনসিংহে ৭৭, চট্টগ্রামে ৬৫, বরিশালে ৫৭, খুলনায় ৩৭ এবং রংপুরে ১৪ জন মারা গেছেন।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এসেছে আরও ১ হাজার ১১৯ জন। তাদের মধ্যে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৩৪ জন।
এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে রোগী ভর্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৯৩ জনে। এর মধ্যে ১ লাখ ৪১ হাজার ৮১৯ জন চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর মোট সংখ্যা এখন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮০। আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৯০৪।
টিকাদান কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন
জাতীয় হাম ও রুবেলা নির্মূল যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও মহামারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হাম কমার দৃশ্যমান কোনো লক্ষণ নেই। প্রায় সব বয়সের শিশুর মধ্যেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।
তার মতে, ছয় থেকে নয় মাস, নয় মাস থেকে এক বছর এবং এক থেকে পাঁচ বছর—সব বয়সের শিশুর মধ্যেই সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। কোথাও সংক্রমণ কিছুটা কমলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, ঘোষিত টিকাদান কভারেজের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ১০৩ শতাংশ টিকাদান কভারেজের দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের মতে, শুধু টিকা সরবরাহ করলেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। শিশুদের টিকাকেন্দ্রে নিয়ে আসতে অভিভাবকদের উৎসাহিত করতে ব্যাপক জনসচেতনতা প্রয়োজন। পাশাপাশি ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের জ্বর হলে দ্রুত শনাক্ত করে আলাদা রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, হাম এখন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে বয়সসীমা বাড়ানোর পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ এখন বিভিন্ন বয়সী শিশুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ায় প্রচলিত টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি নতুন করে কৌশল নির্ধারণ জরুরি। প্রমাণভিত্তিকভাবে টিকাদানের বয়সসীমা অন্তত ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো, মাঠপর্যায়ে মাইক্রোপ্ল্যানিং জোরদার এবং কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে হাম শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবেই নয়, নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য আরও বড় আর্থিক সংকট হিসেবেও সামনে আসতে পারে। চিকিৎসার ব্যয়, আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ঋণের চাপ—সব মিলিয়ে হামের প্রাদুর্ভাবের অভিঘাত এখন অনেক পরিবারের জীবনযাত্রাতেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলছে।






















