ঢাকা ০৩:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথ কতটা খোলা, সামনে কী কী বাধা?

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৩০:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬ ২৭ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন তিনি। সম্প্রতি দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা জানান শেখ হাসিনা।

তার এই বক্তব্যের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আলোচনা তৈরি হয়েছে, তেমনি দুই দেশের সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যেই ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দিল্লি যান এবং পরদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে ওই সফরের কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করা হয়নি।

এখন মূল প্রশ্ন—শেখ হাসিনা চাইলে কি সত্যিই ডিসেম্বরেই দেশে ফিরতে পারবেন? আর ফিরলে কোন পথে ফিরবেন?

পাসপোর্ট না থাকলে কীভাবে ফিরবেন?

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে প্রথম যে বিষয়টি সামনে আসে, সেটি হলো তাঁর পাসপোর্ট। বাংলাদেশ সরকার তাঁর পাসপোর্ট বাতিল করেছে বলে জানানো হয়েছে। ফলে সাধারণ প্রক্রিয়ায় পাসপোর্ট ব্যবহার করে তাঁর বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ নেই।

তবে সাবেক কূটনীতিক ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি এম হুমায়ুন কবীরের মতে, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে দেশে ফেরার অধিকার তাঁর রয়েছে।

তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বৈধ পাসপোর্ট থাকলে সেটি ব্যবহার করে শেখ হাসিনা ফিরতে পারেন। পাসপোর্ট না থাকলে তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে ট্রাভেল পারমিট বা ভ্রমণ-সংক্রান্ত অনুমতিপত্রের জন্য আবেদন করতে পারেন। সরকার সেই আবেদনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

অর্থাৎ পাসপোর্ট না থাকা একেবারে অতিক্রম-অযোগ্য বাধা নয়। তবে ট্রাভেল ডকুমেন্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করবে।

দ্বিতীয় পথ—ভারত থেকে প্রত্যর্পণ

শেখ হাসিনা নিজে না ফিরলে আরেকটি সম্ভাব্য পথ হলো প্রত্যর্পণ।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এক দেশের অভিযুক্ত বা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অন্য দেশের কাছে হস্তান্তরের সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই অনুরোধের বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

চুক্তিতে কিছু ব্যতিক্রম ও আইনি শর্ত থাকায় বাংলাদেশ অনুরোধ করলেই ভারত তাঁকে হস্তান্তর করতে বাধ্য—এমন সরল সমীকরণও নেই।

ফলে প্রত্যর্পণের পথটি আইনি দিক থেকে খোলা থাকলেও বাস্তবে সেটি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ভারত সরকারের সিদ্ধান্ত ও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর।

নিজে ফিরলে কী হবে?

শেখ হাসিনা যদি কোনো সমঝোতা ছাড়াই নিজ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে—এমন অবস্থায় দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এলিনা খানের মতে, দেশে প্রবেশের পর আইন অনুযায়ী তাঁকে হেফাজতে নেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের নির্ধারিত সময়সীমাও ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে। ফলে দেশে ফেরার পর তাঁর বিরুদ্ধে আদালতের রায় অনুযায়ী পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এগোবে।

তাহলে দেশে ফেরার ঘোষণা কেন?

এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতিও জড়িয়ে আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। দলটির অনেক নেতাই আত্মগোপনে কিংবা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

এই পরিস্থিতিতে দলকে সক্রিয় রাখা এবং রাজনৈতিক অস্তিত্ব ধরে রাখার জন্য শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ তাঁর বাস্তবে দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাঈদ ফেরদৌস মনে করেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে সরাসরি আইনি ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত কি শুধু শেখ হাসিনার?

বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তের ওপরও পুরোপুরি নির্ভর করছে না।

তিনি বাংলাদেশের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বড় একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা। ফলে তাঁর প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা আইনি বিষয় নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও জড়িয়ে রয়েছে।

সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীরের মতে, এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্তে একাধিক পক্ষ ও স্বার্থ জড়িত থাকে। তাই বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম।

শেখ হাসিনা ইস্যু কি ঢাকা-দিল্লির দরকষাকষির অংশ?

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দীর্ঘায়িত হওয়া এবং বাংলাদেশ সরকারের তাঁকে ফেরত চাওয়ার বিষয়টি ইতোমধ্যে দুই দেশের কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

এ কারণে প্রশ্ন উঠছে—ভারত কি শেখ হাসিনার অবস্থানকে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় কোনো কূটনৈতিক leverage বা দরকষাকষির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করছে?

এম হুমায়ুন কবীরের মতে, ভারত যদি বিষয়টিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে তা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আইনি ও প্রক্রিয়াগত কিছু পথ রয়েছে—নিজে বৈধ ভ্রমণ নথি নিয়ে ফেরা, ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে আসা কিংবা প্রত্যর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশে ফেরত আসা। কিন্তু কোন পথ বাস্তবে কার্যকর হবে, সেটি নির্ভর করবে তাঁর সিদ্ধান্ত, বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান, ভারতের সম্মতি এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সমীকরণের ওপর।

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে—ডিসেম্বরে ঘোষিত সেই প্রত্যাবর্তন কি সত্যিই বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি এটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথ কতটা খোলা, সামনে কী কী বাধা?

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৩০:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন তিনি। সম্প্রতি দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা জানান শেখ হাসিনা।

তার এই বক্তব্যের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আলোচনা তৈরি হয়েছে, তেমনি দুই দেশের সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যেই ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দিল্লি যান এবং পরদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে ওই সফরের কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করা হয়নি।

এখন মূল প্রশ্ন—শেখ হাসিনা চাইলে কি সত্যিই ডিসেম্বরেই দেশে ফিরতে পারবেন? আর ফিরলে কোন পথে ফিরবেন?

পাসপোর্ট না থাকলে কীভাবে ফিরবেন?

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে প্রথম যে বিষয়টি সামনে আসে, সেটি হলো তাঁর পাসপোর্ট। বাংলাদেশ সরকার তাঁর পাসপোর্ট বাতিল করেছে বলে জানানো হয়েছে। ফলে সাধারণ প্রক্রিয়ায় পাসপোর্ট ব্যবহার করে তাঁর বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ নেই।

তবে সাবেক কূটনীতিক ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি এম হুমায়ুন কবীরের মতে, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে দেশে ফেরার অধিকার তাঁর রয়েছে।

তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বৈধ পাসপোর্ট থাকলে সেটি ব্যবহার করে শেখ হাসিনা ফিরতে পারেন। পাসপোর্ট না থাকলে তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে ট্রাভেল পারমিট বা ভ্রমণ-সংক্রান্ত অনুমতিপত্রের জন্য আবেদন করতে পারেন। সরকার সেই আবেদনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

অর্থাৎ পাসপোর্ট না থাকা একেবারে অতিক্রম-অযোগ্য বাধা নয়। তবে ট্রাভেল ডকুমেন্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করবে।

দ্বিতীয় পথ—ভারত থেকে প্রত্যর্পণ

শেখ হাসিনা নিজে না ফিরলে আরেকটি সম্ভাব্য পথ হলো প্রত্যর্পণ।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এক দেশের অভিযুক্ত বা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অন্য দেশের কাছে হস্তান্তরের সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই অনুরোধের বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

চুক্তিতে কিছু ব্যতিক্রম ও আইনি শর্ত থাকায় বাংলাদেশ অনুরোধ করলেই ভারত তাঁকে হস্তান্তর করতে বাধ্য—এমন সরল সমীকরণও নেই।

ফলে প্রত্যর্পণের পথটি আইনি দিক থেকে খোলা থাকলেও বাস্তবে সেটি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ভারত সরকারের সিদ্ধান্ত ও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর।

নিজে ফিরলে কী হবে?

শেখ হাসিনা যদি কোনো সমঝোতা ছাড়াই নিজ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে—এমন অবস্থায় দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এলিনা খানের মতে, দেশে প্রবেশের পর আইন অনুযায়ী তাঁকে হেফাজতে নেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের নির্ধারিত সময়সীমাও ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে। ফলে দেশে ফেরার পর তাঁর বিরুদ্ধে আদালতের রায় অনুযায়ী পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এগোবে।

তাহলে দেশে ফেরার ঘোষণা কেন?

এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতিও জড়িয়ে আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। দলটির অনেক নেতাই আত্মগোপনে কিংবা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

এই পরিস্থিতিতে দলকে সক্রিয় রাখা এবং রাজনৈতিক অস্তিত্ব ধরে রাখার জন্য শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ তাঁর বাস্তবে দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাঈদ ফেরদৌস মনে করেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে সরাসরি আইনি ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত কি শুধু শেখ হাসিনার?

বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তের ওপরও পুরোপুরি নির্ভর করছে না।

তিনি বাংলাদেশের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বড় একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা। ফলে তাঁর প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা আইনি বিষয় নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও জড়িয়ে রয়েছে।

সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীরের মতে, এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্তে একাধিক পক্ষ ও স্বার্থ জড়িত থাকে। তাই বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম।

শেখ হাসিনা ইস্যু কি ঢাকা-দিল্লির দরকষাকষির অংশ?

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দীর্ঘায়িত হওয়া এবং বাংলাদেশ সরকারের তাঁকে ফেরত চাওয়ার বিষয়টি ইতোমধ্যে দুই দেশের কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

এ কারণে প্রশ্ন উঠছে—ভারত কি শেখ হাসিনার অবস্থানকে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় কোনো কূটনৈতিক leverage বা দরকষাকষির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করছে?

এম হুমায়ুন কবীরের মতে, ভারত যদি বিষয়টিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে তা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আইনি ও প্রক্রিয়াগত কিছু পথ রয়েছে—নিজে বৈধ ভ্রমণ নথি নিয়ে ফেরা, ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে আসা কিংবা প্রত্যর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশে ফেরত আসা। কিন্তু কোন পথ বাস্তবে কার্যকর হবে, সেটি নির্ভর করবে তাঁর সিদ্ধান্ত, বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান, ভারতের সম্মতি এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সমীকরণের ওপর।

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে—ডিসেম্বরে ঘোষিত সেই প্রত্যাবর্তন কি সত্যিই বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি এটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে?