ঢাকা ১২:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অডিটের নামে লাখ লাখ টাকা ঘুষ? সুলতান আহমেদের সম্পদের পাহাড়

সুপন রায়
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:৪০:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬ ৬৪ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) অডিট অফিসার সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের নামে ঘুষ আদায়, দীর্ঘদিন একই দপ্তরে অবস্থান এবং অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের অডিট বা পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুকূলে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই অর্থের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অডিটের নামে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সময় অডিট কর্মকর্তাদের একটি অংশ বিভিন্নভাবে অর্থ দাবি করেন। অডিট প্রতিবেদনে অনুকূল মন্তব্য দেওয়ার আশ্বাস, আপত্তি কমানো কিংবা কোনো বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

লতান আহমেদের বিরুদ্ধে এমন একটি অভিযোগ সামনে আসে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বরইহাটি আইডিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত জুনে ১০টি প্রতিষ্ঠান অডিট করতে যান সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক ফজিলাতুন্নেসা ও সুলতান আহমেদ।

অভিযোগকারীদের দাবি, শুরুতে কোনো অর্থ দিতে হবে না বলা হলেও পরে ঢাকায় এসে ওই বিদ্যালয়ের সাতজন শিক্ষকের পক্ষে অডিট প্রতিবেদন দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সুলতান আহমেদ ১১ লাখ টাকা নেন।

বিষয়টি জানাজানি হলে প্রতিষ্ঠানটির জমিদাতা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের সন্তান অলিউর শেখ ডিআইএর পরিচালকের কাছে অভিযোগ করেন। অভিযোগের সঙ্গে ঘুষ লেনদেনের একটি অডিও রেকর্ডও জমা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাঁর।

অলিউর শেখের ভাষ্য, সাতজন শিক্ষক ঢাকার গুলশানে গিয়ে সুলতান আহমেদকে টাকা দিয়েছেন—এমন তথ্যের অডিও রেকর্ড তাঁদের কাছে রয়েছে।

তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সুলতান আহমেদের বক্তব্য বা তাঁর পক্ষের ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনের তথ্যের মধ্যে পাওয়া যায়নি।

আরও একটি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ

মুকসুদপুরের বহুগ্রাম প্রতাপ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকেও অডিটে ভালো প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলে টাকা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিপুল চন্দ্র দাস অভিযোগ করেন, অডিট কর্মকর্তার পক্ষ থেকে অর্থ চাওয়ার বিষয়টি তাঁদের কাছে আসে। তবে তিনি দাবি করেন, তাঁরা কোনো টাকা দেননি।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ডিআইএর কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

আট বছরের বেশি একই দপ্তরে থাকার অভিযোগ

সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হলো—নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দীর্ঘ সময় তিনি ডিআইএতে কর্মরত ছিলেন।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী অডিট অধিদপ্তর থেকে আসা কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট সময় পর নিজ দপ্তরে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা। কিন্তু সুলতান আহমেদ ও আরেক অডিট অফিসার ফিরোজ হোসেন আট বছরেরও বেশি সময় ডিআইএতে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরই মধ্যে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর দুজনকেই ডিআইএ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। গত বছরের ২ ডিসেম্বর তাঁদের নিজ নিজ বিভাগে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

‘ঘুষ সিন্ডিকেট’ নিয়ে অভিযোগ

ডিআইএর কর্মকাণ্ড ঘিরে একটি সংঘবদ্ধ ঘুষচক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দপ্তরের কয়েকজন পরিদর্শক, সহকারী পরিদর্শক, অডিট অফিসার ও অডিটরকে নিয়ে এই চক্র গড়ে উঠেছে।

তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সময় এই চক্রের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে অর্থ আদায় করেন। তবে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন

সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকার জিগাতলায় জমি, ধানমন্ডিতে একাধিক ফ্ল্যাট, বসিলা ও মধুসিটিসহ বিভিন্ন এলাকায় তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে জমি ও ফ্ল্যাট রয়েছে।

তবে এসব সম্পদের মালিকানা, বাজারমূল্য এবং বৈধ আয়ের উৎস সম্পর্কে কোনো সরকারি নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখানে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।

স্ত্রী ও পরিবারের নামে সম্পদ, সরকারি বাসা বাণিজ্য

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) অডিট কর্মকর্তা সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পদ এবং সরকারি আবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, তাঁর স্ত্রী সেলিনা গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে অডিটর হিসেবে কর্মরত। তাঁকে ঘিরেও সরকারি বাসা বরাদ্দ ও হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে একটি কথিত ‘বাসা বাণিজ্য চক্রের’ সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে। এই চক্রে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের গেজেটেড ও নন-গেজেটেড কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি আবাসন বরাদ্দ ও বাসা পরিবর্তনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি মহল আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকে।

সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

সুলতান আহমেদের নামে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জমি ও ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজধানীর জিগাতলায় প্রায় চার কাঠা জমি, ধানমন্ডিতে দুটি ফ্ল্যাট এবং বসিলার মধুসিটিসহ বিভিন্ন এলাকায় তাঁর সম্পদ রয়েছে। পাশাপাশি স্ত্রী, ছেলে-মেয়েদের নামেও ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদ থাকার দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, একজন সরকারি কর্মচারীর বৈধ আয় ও ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না। তাঁদের মতে, সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়ের অর্থের উৎস এবং আয়কর নথির সঙ্গে সম্পদের হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থাকলে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক লেনদেন এবং সম্পদ বিবরণী যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

তদন্তের দাবি

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অডিটের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। বিশেষ করে কোনো অভিযোগের সঙ্গে অডিও রেকর্ড, লিখিত অভিযোগ বা আর্থিক লেনদেনের তথ্য থাকলে সেগুলো যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা বের করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত না করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

দুদক কর্মকর্তারা যা বলছেন

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তারা বলেন, সরকারি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার আগে সংশ্লিষ্ট অভিযোগ, আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উৎসসহ সব তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।

তাঁরা আরও বলেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সম্পদের অসামঞ্জস্য পাওয়া গেলে কিংবা ঘুষ লেনদেনের প্রমাণ মিললে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অভিযোগকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া নথি, অডিও-ভিডিও, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য এবং সম্পদ বিবরণীসহ সংশ্লিষ্ট সব তথ্য যাচাই করা হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

অডিটের নামে লাখ লাখ টাকা ঘুষ? সুলতান আহমেদের সম্পদের পাহাড়

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:৪০:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) অডিট অফিসার সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের নামে ঘুষ আদায়, দীর্ঘদিন একই দপ্তরে অবস্থান এবং অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের অডিট বা পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুকূলে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই অর্থের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অডিটের নামে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সময় অডিট কর্মকর্তাদের একটি অংশ বিভিন্নভাবে অর্থ দাবি করেন। অডিট প্রতিবেদনে অনুকূল মন্তব্য দেওয়ার আশ্বাস, আপত্তি কমানো কিংবা কোনো বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

লতান আহমেদের বিরুদ্ধে এমন একটি অভিযোগ সামনে আসে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বরইহাটি আইডিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত জুনে ১০টি প্রতিষ্ঠান অডিট করতে যান সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক ফজিলাতুন্নেসা ও সুলতান আহমেদ।

অভিযোগকারীদের দাবি, শুরুতে কোনো অর্থ দিতে হবে না বলা হলেও পরে ঢাকায় এসে ওই বিদ্যালয়ের সাতজন শিক্ষকের পক্ষে অডিট প্রতিবেদন দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সুলতান আহমেদ ১১ লাখ টাকা নেন।

বিষয়টি জানাজানি হলে প্রতিষ্ঠানটির জমিদাতা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের সন্তান অলিউর শেখ ডিআইএর পরিচালকের কাছে অভিযোগ করেন। অভিযোগের সঙ্গে ঘুষ লেনদেনের একটি অডিও রেকর্ডও জমা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাঁর।

অলিউর শেখের ভাষ্য, সাতজন শিক্ষক ঢাকার গুলশানে গিয়ে সুলতান আহমেদকে টাকা দিয়েছেন—এমন তথ্যের অডিও রেকর্ড তাঁদের কাছে রয়েছে।

তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সুলতান আহমেদের বক্তব্য বা তাঁর পক্ষের ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনের তথ্যের মধ্যে পাওয়া যায়নি।

আরও একটি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ

মুকসুদপুরের বহুগ্রাম প্রতাপ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকেও অডিটে ভালো প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলে টাকা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিপুল চন্দ্র দাস অভিযোগ করেন, অডিট কর্মকর্তার পক্ষ থেকে অর্থ চাওয়ার বিষয়টি তাঁদের কাছে আসে। তবে তিনি দাবি করেন, তাঁরা কোনো টাকা দেননি।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ডিআইএর কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

আট বছরের বেশি একই দপ্তরে থাকার অভিযোগ

সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হলো—নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দীর্ঘ সময় তিনি ডিআইএতে কর্মরত ছিলেন।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী অডিট অধিদপ্তর থেকে আসা কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট সময় পর নিজ দপ্তরে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা। কিন্তু সুলতান আহমেদ ও আরেক অডিট অফিসার ফিরোজ হোসেন আট বছরেরও বেশি সময় ডিআইএতে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরই মধ্যে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর দুজনকেই ডিআইএ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। গত বছরের ২ ডিসেম্বর তাঁদের নিজ নিজ বিভাগে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

‘ঘুষ সিন্ডিকেট’ নিয়ে অভিযোগ

ডিআইএর কর্মকাণ্ড ঘিরে একটি সংঘবদ্ধ ঘুষচক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দপ্তরের কয়েকজন পরিদর্শক, সহকারী পরিদর্শক, অডিট অফিসার ও অডিটরকে নিয়ে এই চক্র গড়ে উঠেছে।

তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সময় এই চক্রের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে অর্থ আদায় করেন। তবে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন

সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকার জিগাতলায় জমি, ধানমন্ডিতে একাধিক ফ্ল্যাট, বসিলা ও মধুসিটিসহ বিভিন্ন এলাকায় তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে জমি ও ফ্ল্যাট রয়েছে।

তবে এসব সম্পদের মালিকানা, বাজারমূল্য এবং বৈধ আয়ের উৎস সম্পর্কে কোনো সরকারি নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখানে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।

স্ত্রী ও পরিবারের নামে সম্পদ, সরকারি বাসা বাণিজ্য

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) অডিট কর্মকর্তা সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পদ এবং সরকারি আবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, তাঁর স্ত্রী সেলিনা গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে অডিটর হিসেবে কর্মরত। তাঁকে ঘিরেও সরকারি বাসা বরাদ্দ ও হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে একটি কথিত ‘বাসা বাণিজ্য চক্রের’ সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে। এই চক্রে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের গেজেটেড ও নন-গেজেটেড কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি আবাসন বরাদ্দ ও বাসা পরিবর্তনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি মহল আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকে।

সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

সুলতান আহমেদের নামে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জমি ও ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজধানীর জিগাতলায় প্রায় চার কাঠা জমি, ধানমন্ডিতে দুটি ফ্ল্যাট এবং বসিলার মধুসিটিসহ বিভিন্ন এলাকায় তাঁর সম্পদ রয়েছে। পাশাপাশি স্ত্রী, ছেলে-মেয়েদের নামেও ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদ থাকার দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, একজন সরকারি কর্মচারীর বৈধ আয় ও ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না। তাঁদের মতে, সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়ের অর্থের উৎস এবং আয়কর নথির সঙ্গে সম্পদের হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থাকলে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক লেনদেন এবং সম্পদ বিবরণী যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

তদন্তের দাবি

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অডিটের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। বিশেষ করে কোনো অভিযোগের সঙ্গে অডিও রেকর্ড, লিখিত অভিযোগ বা আর্থিক লেনদেনের তথ্য থাকলে সেগুলো যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা বের করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত না করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

দুদক কর্মকর্তারা যা বলছেন

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তারা বলেন, সরকারি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার আগে সংশ্লিষ্ট অভিযোগ, আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উৎসসহ সব তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।

তাঁরা আরও বলেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সম্পদের অসামঞ্জস্য পাওয়া গেলে কিংবা ঘুষ লেনদেনের প্রমাণ মিললে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অভিযোগকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া নথি, অডিও-ভিডিও, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য এবং সম্পদ বিবরণীসহ সংশ্লিষ্ট সব তথ্য যাচাই করা হবে।