ঢাকা ০৬:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অর্থপাচারের অভিযোগে ৬ ব্যাংকের বিরুদ্ধে নজরদারি

বিশেষ প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:১৭:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশের ব্যাংকিং খাতে বৈদেশিক লেনদেনে অনিয়ম ও সম্ভাব্য অর্থপাচারের অভিযোগে ছয়টি ব্যাংকের বিরুদ্ধে বিশেষ তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংক মিলিয়ে গঠিত ছয়টি বিশেষ তদন্ত দল ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে।

তদন্তের আওতায় রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক, বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংক এবং বিদেশি এইচএসবিসি।

বুধবার (৮ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক লেনদেন, বিশেষ করে আমদানি দায় পরিশোধে ব্যবহৃত নস্ট্রো (Nostro) হিসাব বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে আমদানির অর্থ পরিশোধ করা হলেও গ্রাহকের নামে ব্যাংকের হিসাবে কোনো ঋণ বা দায় দেখানো হয়নি। ফলে লেনদেনের প্রকৃত তথ্য ব্যাংকের হিসাবপত্রে প্রতিফলিত হয়নি, যা অর্থপাচারের সম্ভাব্য কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, এসব লেনদেন আড়াল করতে ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। তদন্তকারীরা সার্ভার থেকে তথ্য পুনরুদ্ধার করে কোন কোন লেনদেন গোপন করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে কত অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে ট্রেজারি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এ কারণে আর্থিক নথির পাশাপাশি সার্ভার লগ, ব্যবহারকারীর কার্যক্রম, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং তথ্য পরিবর্তনের ইতিহাসও যাচাই করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এ তদন্তের জন্য ছয়টি পৃথক বিশেষ দল গঠন করেছে। এসব দলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাও রয়েছেন। প্রতিটি দল নির্দিষ্ট একটি ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেন, নস্ট্রো হিসাব, ট্রেজারি কার্যক্রম এবং আইটি অবকাঠামো পরীক্ষা করছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তে অনিয়ম বা অর্থপাচারের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, গ্রাহক ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছেও পাঠানো হবে।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং অর্থপাচার প্রতিরোধে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বৈদেশিক লেনদেনের ওপর এই বিশেষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তাদের মতে, নস্ট্রো হিসাবের অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হবে। তাই দায়ীদের শনাক্ত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে একাধিক জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার বলেন, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নস্ট্রো হিসাব অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ হিসাবে অনিয়ম বা তথ্য গোপনের ঘটনা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই তদন্তটি নিরপেক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

অর্থপাচারের অভিযোগে ৬ ব্যাংকের বিরুদ্ধে নজরদারি

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:১৭:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

দেশের ব্যাংকিং খাতে বৈদেশিক লেনদেনে অনিয়ম ও সম্ভাব্য অর্থপাচারের অভিযোগে ছয়টি ব্যাংকের বিরুদ্ধে বিশেষ তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংক মিলিয়ে গঠিত ছয়টি বিশেষ তদন্ত দল ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে।

তদন্তের আওতায় রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক, বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংক এবং বিদেশি এইচএসবিসি।

বুধবার (৮ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক লেনদেন, বিশেষ করে আমদানি দায় পরিশোধে ব্যবহৃত নস্ট্রো (Nostro) হিসাব বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে আমদানির অর্থ পরিশোধ করা হলেও গ্রাহকের নামে ব্যাংকের হিসাবে কোনো ঋণ বা দায় দেখানো হয়নি। ফলে লেনদেনের প্রকৃত তথ্য ব্যাংকের হিসাবপত্রে প্রতিফলিত হয়নি, যা অর্থপাচারের সম্ভাব্য কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, এসব লেনদেন আড়াল করতে ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। তদন্তকারীরা সার্ভার থেকে তথ্য পুনরুদ্ধার করে কোন কোন লেনদেন গোপন করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে কত অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে ট্রেজারি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এ কারণে আর্থিক নথির পাশাপাশি সার্ভার লগ, ব্যবহারকারীর কার্যক্রম, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং তথ্য পরিবর্তনের ইতিহাসও যাচাই করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এ তদন্তের জন্য ছয়টি পৃথক বিশেষ দল গঠন করেছে। এসব দলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাও রয়েছেন। প্রতিটি দল নির্দিষ্ট একটি ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেন, নস্ট্রো হিসাব, ট্রেজারি কার্যক্রম এবং আইটি অবকাঠামো পরীক্ষা করছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তে অনিয়ম বা অর্থপাচারের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, গ্রাহক ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছেও পাঠানো হবে।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং অর্থপাচার প্রতিরোধে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বৈদেশিক লেনদেনের ওপর এই বিশেষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তাদের মতে, নস্ট্রো হিসাবের অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হবে। তাই দায়ীদের শনাক্ত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে একাধিক জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার বলেন, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নস্ট্রো হিসাব অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ হিসাবে অনিয়ম বা তথ্য গোপনের ঘটনা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই তদন্তটি নিরপেক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি।