লাশ ফেরে, ফেরে না জীবনের স্বস্তি

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:৩৩:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
সীমান্তে গুলি চলে কয়েক সেকেন্ড। এরপর সবকিছু থেমে যায়। নদীর ওপারে পড়ে থাকে একটি নিথর দেহ, আর এপারে শুরু হয় একটি পরিবারের দীর্ঘ অনিশ্চয়তার জীবন। কয়েকদিন পর পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে মরদেহ দেশে ফিরে আসে। আত্মীয়স্বজনের কান্নার মধ্যে শেষ হয় দাফন। কিন্তু তারপর? নিহত ব্যক্তির স্ত্রী-সন্তান, বৃদ্ধ মা-বাবা কিংবা অসহায় পরিবারগুলোর খবর আর কেউ রাখে না—এমন অভিযোগই উঠেছে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার সীমান্তবর্তী জনপদে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর গুলিতে প্রাণ হারানো বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, জীবিকার ব্যবস্থা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না। ফলে সীমান্তে একজন মানুষের মৃত্যু কেবল একটি প্রাণহানি নয়, বরং একটি পরিবারের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ডুবে যায়।
রাণীশংকৈলের জগদল ও ধর্মগড় সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। সীমান্তঘেঁষা এসব গ্রামের অনেক মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে নদী, চর কিংবা সীমান্তসংলগ্ন জমিতে কাজ করতে যান। কখনো ঘাস কাটতে, কখনো মাছ ধরতে, আবার কখনো কৃষিকাজ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে ধর্মগড় ইউনিয়নের শাহানাবাদ এলাকার বাসিন্দা আইজুল সীমান্ত এলাকায় ঘাস কাটতে গেলে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন। পরে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারানোর পর চরম সংকটে পড়ে তাঁর পরিবার। সংসারের ব্যয় চালাতে না পেরে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। প্রতিবেশীরা জানান, গ্রামের ভিটেমাটি থাকলেও জীবিকার অভাবে পরিবারটি এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।
একইভাবে কলোনীপাড়া এলাকার জিন্নাত নাগর নদীতে মাছ ধরার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন বলে দাবি স্থানীয়দের। তাঁর মৃত্যুর পরও পরিবারের জীবনযুদ্ধে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। বরং সন্তানদের লেখাপড়া, সংসারের ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু আইজুল বা জিন্নাত নন, বিভিন্ন সময়ে আইজুল, এরশাদসহ আরও কয়েকজন বাংলাদেশি সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। প্রতিটি মৃত্যুর পর কিছুদিন আলোচনা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় সেই পরিবারগুলোর আর্তনাদ।
এসব মৃত্যুর এক নীরব সাক্ষী নাগর নদীর নৌকার মাঝি আব্দুর রহমান। বহু বছর ধরে তিনি সীমান্ত এলাকায় বিজিবির সঙ্গে নদী পারাপারের কাজে যুক্ত। ভারত থেকে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা বহু মরদেহ তাঁর নৌকাতেই এসেছে এপারে।
কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, আমি অনেক লাশ বাংলাদেশে নিয়ে এসেছি। সম্প্রতি ফতেপুর এলাকার একটি লাশও নিয়ে আসতে হয়েছে। যখন লাশ নৌকায় তুলি, তখন পরিবারের কান্না দেখে নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। কিন্তু আমাদের কিছুই করার থাকে না। কাজ শেষ হলে সবাই চলে যায়, কিন্তু পরিবারগুলোর কষ্ট রয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা হারুন অর রশিদ বলেন, “মরদেহ ফিরিয়ে দেওয়াই দায়িত্বের শেষ হতে পারে না। যেসব পরিবার সীমান্তে তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়েছে, তাদের জন্য সরকারি পুনর্বাসন, সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। তা না হলে এসব পরিবার আরও দারিদ্র্যের মধ্যে ডুবে যাবে।
তিনি আরও বলেন, সীমান্তে প্রতিটি প্রাণহানি কেবল একটি সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তাই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদেরও একই ধরনের মত। তাঁদের ভাষ্য, সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জীবনযাত্রা এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকেই দারিদ্র্যের কারণে সীমান্তঘেঁষা এলাকায় কাজ করতে বাধ্য হন। দুর্ঘটনা বা গুলিতে প্রাণহানির পর পরিবারগুলোর পাশে রাষ্ট্রকে আরও কার্যকরভাবে দাঁড়ানো উচিত।
সীমান্তে নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি)। তবে পরিবারের পুনর্বাসন বা দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার বিষয়ে কী উদ্যোগ রয়েছে—এ প্রশ্নে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে ভিন্ন চিত্র।
এ বিষয়ে ৫০ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আখলাকুর রহমান বলেন, “সীমান্তে কোনো বাংলাদেশি নিহত হলে বিজিবি প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনে এবং স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে। তবে পরবর্তী সময়ে পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়ে আমার জানা নেই। আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি।
অন্যদিকে ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক রফিকুল হক বলেন, সীমান্তে নিহত ব্যক্তিদের বিষয়ে সরকার নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী আমাদের অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি দুঃখজনক যে আমরা এখনো সেভাবে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারিনি। এমন কোনো পরিবার থাকলে আমাদের জানানো হলে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনায় শুধু কূটনৈতিক প্রতিবাদ বা মরদেহ ফেরত আনার মধ্যেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী সহায়তা তহবিল, পুনর্বাসন কর্মসূচি এবং সন্তানদের শিক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া গেলে অন্তত পরিবারগুলো নতুন করে বাঁচার সুযোগ পাবে।
রাণীশংকৈলের সীমান্তে প্রতিবার গুলি চলার পর খবরের শিরোনাম হয় একজন নিহত বাংলাদেশির নাম। কয়েকদিন পরে সেই খবর হারিয়ে যায়। কিন্তু হারিয়ে যায় না বিধবার দীর্ঘশ্বাস, এতিম সন্তানের অনিশ্চয়তা কিংবা বৃদ্ধ মা-বাবার অপেক্ষা। নাগর নদীর নৌকার মাঝি আব্দুর রহমানের নৌকা হয়তো আবারও কোনো একদিন আরেকটি মরদেহ নিয়ে ফিরবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—মরদেহ ফিরিয়ে আনার পর সেই পরিবারগুলোর জীবনের দায়িত্ব কি শুধু তাদের নিজেদেরই?


















