ঢাকা ০৩:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২২ কোম্পানি বানিয়ে কেনা হয় ১১৬ কোটি শেয়ার

ইসলামী ব্যাংকের টাকায় ইসলামী ব্যাংক দখলে এস আলম!

বিশেষ প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৩:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬ ৫০ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

১০ বছর আগে ইসলামী ব্যাংকের টাকা দিয়েই ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপ। দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংকের মালিকানায় বসতে বাইরে থেকে কোনো টাকা আসেনি, বরং ব্যবহৃত হয়েছে ব্যাংকটিরই টাকা। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্তে উঠে এসেছে এমনই এক বিস্ময়কর চিত্র।

সংস্থাটির দাবি, ইসলামী ব্যাংকসহ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণের অর্থ ব্যবহার করে ধাপে ধাপে ব্যাংকটির ৭২ শতাংশ শেয়ার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এস আলম গ্রুপ। পরে সেই নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগিয়ে আরও বড় অঙ্কের ঋণ সুবিধা নেয়।

বিএফআইইউর অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৪ ও ১৫ ধারা লঙ্ঘন করে ৭২ শতাংশের বেশি শেয়ার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মাধ্যমে ব্যাংকের ঋণের টাকা ব্যবহার করে শেয়ার কেনা হয়েছে বলে প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সেই মালিকানা অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

হাইকোর্টে জমা দেওয়া ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বিএফআইইউ জানিয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের শেয়ার কেনাসংক্রান্ত নথি ও তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ শেয়ার এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত। একদল কাগুজে বা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়। পরে সেই টাকা ব্যবহার করে ইসলামী ব্যাংকের ৭২ শতাংশ শেয়ার কিনে ব্যাংকটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর ব্যাংকের মালিকানাকে ভিত্তি করে আরও বড় অঙ্কের ঋণ সুবিধা নেওয়া হয় এবং আর্থিক ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করা হয়।

বিএফআইইউর প্রতিবেদনে এ ঘটনাকে কেবল একটি করপোরেট অধিগ্রহণ হিসেবে নয়, বরং ‘রেগুলেটরি ক্যাপচার’-এর একটি ধ্রুপদি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিজস্ব মূলধন ব্যবহার করে একটি ব্যাংকের মালিকানা অর্জন করে এবং পরবর্তীতে সেই ব্যাংককে নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

প্রক্সি শেয়ারহোল্ডার ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র

বিএফআইইউর তদন্তে দেখা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ ২২ জন প্রক্সি বা বেনামি শেয়ারহোল্ডার এবং কয়েকটি সন্দেহভাজন কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের ৭২ শতাংশ শেয়ার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেয়ার কেনার জন্য ব্যবহৃত টাকার বড় অংশ এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের হিসাবের মাধ্যমে প্রবাহিত হয় এবং এসব টাকার উৎস ছিল ইসলামী ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ।

এ ছাড়া শেয়ার কেনা দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের একটি লেনদেনে এস আলম গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের কোম্পানি সচিবের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে বিএফআইইউ সন্দেহ করছে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেনা শেয়ারগুলোর পেছনেও এস আলম গ্রুপের যোগসূত্র রয়েছে। এ অভিযোগ প্রমাণিত হলে ইসলামী ব্যাংকে গ্রুপটির প্রকৃত মালিকানা দাঁড়াবে প্রায় ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ। এ কারণে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র উন্মোচনে আরও গভীর তদন্তের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

এ ঘটনায় হাইকোর্ট ইতোমধ্যে রুল জারি করেছেন। আদালত জানতে চেয়েছেন, কীভাবে ২৪টি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা ৮১.৯২ শতাংশ শেয়ার বৈধ হিসেবে গণ্য করা যায় এবং কেন সেগুলো বাজেয়াপ্ত করা হবে না। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ ক্রোক, ভোটাধিকার স্থগিত এবং পরিচালকদের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নথিপত্র বিশ্লেষণে যা পাওয়া গেছে

বিএফআইইউ জানিয়েছে, ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (সাবেক এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক), ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, মার্চেন্ট সিকিউরিটিজ, নিউ এরা সিকিউরিটিজসহ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে সংরক্ষিত জমা ও ঋণ হিসাবের রেকর্ড, ভাউচার, অনুমোদনের চিঠি এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সংস্থাটির দাবি, এসব তথ্য পর্যালোচনায় স্পষ্ট হয়েছে যে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ক্রয়ের পেছনে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল।

সাত কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু

তদন্ত অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কিনে একীভূত করার প্রাথমিক পর্যায়ে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়, যেগুলোর প্রত্যেকটিই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

এর মধ্যে প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনাল ৭১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা মূল্যের ২ লাখ ২৩ হাজার শেয়ার কেনে। এ টাকা এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের হিসাব থেকে স্থানান্তর করা হয়েছিল। অর্থায়নের অংশ হিসেবে মোমেন্টাম বিজনেস সেন্টার, এপিক অ্যাবল ট্রেডার্স, ইনভেনশন ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, আবদুল আউয়াল অ্যান্ড সন্স (পটিয়া), নবির ট্রেডিং এবং এক্সিস্টেন্স ট্রেড এজেন্সিসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণ ব্যবহার করা হয়। বিএফআইইউ এসব প্রতিষ্ঠানকে এস আলম গ্রুপের সহযোগী বা কাগুজে প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনালের ভাইস চেয়ারম্যান ও মনোনীত পরিচালক তানভীর আহমেদ সাইফুল আলম মাসুদের ভাগ্নে।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে এক্সেল ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং ৬ কোটি ৪৩ লাখ শেয়ার কেনে। টাকার উৎস ছিল সোনালী ট্রেডার্স, এস আলম সুপার এডিবল অয়েল ও এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ। এক্সেল ডায়িংয়ের পরিচালক বদরুন্নেসা ও ওয়াহিদুল আলমকে এস আলমের নিকটাত্মীয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। টাকা জোগান দেওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপি ঋণগ্রহীতার তালিকায়ও রয়েছে।

একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আর্মাডা স্পিনিং মিলস ইসলামী ব্যাংকের ৩ কোটি ৩৭ লাখ শেয়ার কেনে। এ টাকা এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল ও এস আলম রিফাইন্ড সুগার থেকে আসে। পাশাপাশি গ্রিন এক্সপোজ ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণও ব্যবহৃত হয়, যাকে বিএফআইইউ কাগুজে প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক জেসমিন আরশাদ সাইফুল আলম মাসুদের শ্যালক মো. আরশাদের স্ত্রী।

২০১৭ সালে ইউনিক্যাপ সিকিউরিটিজের মাধ্যমে গ্র্যান্ড বিজনেস ৩ কোটি ২৫ লাখ শেয়ার কেনে, যার টাকা এসেছিল এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটালের মাধ্যমে এবিসি ভেঞ্চারস ২ কোটি ২৩ লাখ শেয়ার কেনে, যার অর্থায়ন করে সোনালী ট্রেডার্স।

প্লাটিনাম এনডেভারস ৩ কোটি ২২ লাখ শেয়ার কেনে এস আলম স্টিলস, এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, জেনেসিস টেক্সটাইলস অ্যাকসেসরিজ অ্যান্ড অ্যাপারেলস, এস আলম প্রপার্টিজ এবং এস আলম অ্যান্ড কোম্পানির মাধ্যমে রাউটিং করা টাকায়। টাকার একটি অংশ প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনালের বিও অ্যাকাউন্ট থেকেও আসে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মোস্তান বিল্লাহ আদিল সাইফুল আলম মাসুদের ভাগ্নে।

ব্লু ইন্টারন্যাশনাল ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে ৩ কোটি ২৩ লাখ শেয়ার কেনে। টাকা আসে সোনালী ট্রেডার্স, চেমন ইস্পাত, এস আলম স্টিলস, এস আলম অ্যান্ড কোম্পানি, এস আলম প্রপার্টিজ এবং জেনেসিস টেক্সটাইলসের হিসাব থেকে। অর্থায়নের একটি অংশ প্লাটিনাম এনডেভারসের হিসাব থেকেও পাওয়া গেছে।

যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, ব্লু ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশফিকুর রহমান সাইফুল আলম মাসুদের আত্মীয় এবং তার জামাতার মালিকানাধীন ইউনিটেক্স গ্রুপের একজন কর্মকর্তা।

শেয়ার কেনা থেকে খেলাপি ঋণের সম্পর্ক

তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, ২০১৭ সালে একটি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত সহায়তায় ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ। যেসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুরুতে শেয়ার কেনা হয়েছিল, পরবর্তীতে সেগুলোর অনেকগুলোই ব্যাংকটির শীর্ষ খেলাপি গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে ওঠে।

ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের মধ্যে ১৫টি প্রতিষ্ঠানকে এস আলম গ্রুপ ও সাইফুল আলম মাসুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় রয়েছেন সাইফুল আলম মাসুদ, তার ছেলে আহসানুল আলম, মেয়ের জামাই বেলাল আহমেদ, তার ভাইয়েরা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। মাসুদের অন্য ভাইদের মধ্যে রয়েছেন আবদুল্লাহ হাসান, ওসমান গনি, আবদুস সামাদ লাবু, রাশেদুল আলম ও শহিদুল আলম।

ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের নামে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ব্যাংকের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণগ্রহীতা। এর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা।

এরপর রয়েছে এস আলম রিফাইন্ড সুগারের ১০ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের ১০ হাজার ১১৩ কোটি টাকা, সোনালী ট্রেডার্সের ৪ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা এবং চেমন ইস্পাতের ৩ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ। এ চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটির টাকা শেয়ার কেনার সময় ব্যবহৃত হয়েছিল।

শীর্ষ খেলাপিদের তালিকায় আরও রয়েছে আহসানুল আলমের মালিকানাধীন ইনফিনিয়া সিআর স্ট্রিপস, যার খেলাপি ঋণ ২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। এস আলম কোল্ড রোলেড স্টিলসের খেলাপি ঋণ ২ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, কর্ণফুলী ফুডসের ১ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা এবং ইনহেরেন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড ইমপেক্সের ১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। ইনহেরেন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড ইমপেক্সের মালিক আনসারুল আলম চৌধুরী সাইফুল আলম মাসুদের আত্মীয় ও তার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক।

একনজরে এস আলম-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ার

বিএফআইইউর প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, লায়নহেড বিজনেস রিসোর্সেস, এক্সেলসিওর ইমপেক্স কোম্পানি, আর্মাডা স্পিনিং মিলস, জেএমসি বিল্ডার্স, প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনাল, ব্লু ইন্টারন্যাশনাল, এবিসি ভেনচারস, প্লাটিনাম এনডেভরস এবং গ্র্যান্ড বিজনেস প্রত্যেকে প্রায় ২ থেকে ২.০২ শতাংশ হারে শেয়ার ধারণ করেছে।

এ ছাড়া পারসেপ্টা এনডেভরস ২.২৮ শতাংশ, কিংস্টন ফ্লোর মিলস ২.৫১ শতাংশ, এক্সেল ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং ৩.৪০ শতাংশ, ম্যারাথন ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ৩.৯৪ শতাংশ এবং এভারগ্রিন শিপিং ৪.১৮ শতাংশ শেয়ার ধারণ করেছে।

অন্যদিকে হলিস্টিক ইন্টারন্যাশনাল ৪.৮৯ শতাংশ, হাইক্লাশ বিজনেস এন্টারপ্রাইজেস ৪.৮৪ শতাংশ, ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি ৪.৮২ শতাংশ, ক্যারোলিনা বিজনেস এন্টারপ্রাইজেস ৪.৮২ শতাংশ, ব্রডওয়ে ইমপেক্স কোম্পানি ৪.৭৬ শতাংশ, ইউনিগ্লোব বিজনেস রিসোর্সেস ৪.৬৭ শতাংশ, পিকস বিজনেস এন্টারপ্রাইজেস ৪.৫১ শতাংশ এবং কিংসওয়ে এনডেভরস ৪.৪০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইন কী বলে

সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ৫ শতাংশের বেশি এবং অনুমতি নিয়ে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ার ধারণ করতে পারে। বিএফআইইউর অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৪ ও ১৫ ধারা লঙ্ঘন করে ৭২ শতাংশের বেশি শেয়ার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শেয়ার সরাসরি সাইফুল আলম মাসুদের নামে না থাকলেও যদি প্রমাণ করা যায় যে শেয়ার কেনার টাকা তার নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এসেছে, তাহলে মালিকানা আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব। একইভাবে পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মাধ্যমে ব্যাংকের ঋণের টাকা ব্যবহার করে শেয়ার কেনা হয়েছে বলে প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সেই মালিকানা অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন খান বলেন, ইসলামী ব্যাংকের ধারণকৃত শেয়ারগুলো একক গ্রুপের হাতে থাকা কেন অবৈধ হবে না, সে বিষয়ে আদালতে রিট করা হয়েছে। আদালত রিট গ্রহণ করে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তে এ বিষয়ে প্রমাণও পাওয়া গেছে বলে তিনি জেনেছেন। বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই আদালতে শুনানি হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

২২ কোম্পানি বানিয়ে কেনা হয় ১১৬ কোটি শেয়ার

ইসলামী ব্যাংকের টাকায় ইসলামী ব্যাংক দখলে এস আলম!

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৩:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬

১০ বছর আগে ইসলামী ব্যাংকের টাকা দিয়েই ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপ। দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংকের মালিকানায় বসতে বাইরে থেকে কোনো টাকা আসেনি, বরং ব্যবহৃত হয়েছে ব্যাংকটিরই টাকা। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্তে উঠে এসেছে এমনই এক বিস্ময়কর চিত্র।

সংস্থাটির দাবি, ইসলামী ব্যাংকসহ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণের অর্থ ব্যবহার করে ধাপে ধাপে ব্যাংকটির ৭২ শতাংশ শেয়ার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এস আলম গ্রুপ। পরে সেই নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগিয়ে আরও বড় অঙ্কের ঋণ সুবিধা নেয়।

বিএফআইইউর অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৪ ও ১৫ ধারা লঙ্ঘন করে ৭২ শতাংশের বেশি শেয়ার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মাধ্যমে ব্যাংকের ঋণের টাকা ব্যবহার করে শেয়ার কেনা হয়েছে বলে প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সেই মালিকানা অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

হাইকোর্টে জমা দেওয়া ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বিএফআইইউ জানিয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের শেয়ার কেনাসংক্রান্ত নথি ও তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ শেয়ার এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত। একদল কাগুজে বা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়। পরে সেই টাকা ব্যবহার করে ইসলামী ব্যাংকের ৭২ শতাংশ শেয়ার কিনে ব্যাংকটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর ব্যাংকের মালিকানাকে ভিত্তি করে আরও বড় অঙ্কের ঋণ সুবিধা নেওয়া হয় এবং আর্থিক ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করা হয়।

বিএফআইইউর প্রতিবেদনে এ ঘটনাকে কেবল একটি করপোরেট অধিগ্রহণ হিসেবে নয়, বরং ‘রেগুলেটরি ক্যাপচার’-এর একটি ধ্রুপদি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিজস্ব মূলধন ব্যবহার করে একটি ব্যাংকের মালিকানা অর্জন করে এবং পরবর্তীতে সেই ব্যাংককে নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

প্রক্সি শেয়ারহোল্ডার ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র

বিএফআইইউর তদন্তে দেখা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ ২২ জন প্রক্সি বা বেনামি শেয়ারহোল্ডার এবং কয়েকটি সন্দেহভাজন কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের ৭২ শতাংশ শেয়ার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেয়ার কেনার জন্য ব্যবহৃত টাকার বড় অংশ এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের হিসাবের মাধ্যমে প্রবাহিত হয় এবং এসব টাকার উৎস ছিল ইসলামী ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ।

এ ছাড়া শেয়ার কেনা দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের একটি লেনদেনে এস আলম গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের কোম্পানি সচিবের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে বিএফআইইউ সন্দেহ করছে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেনা শেয়ারগুলোর পেছনেও এস আলম গ্রুপের যোগসূত্র রয়েছে। এ অভিযোগ প্রমাণিত হলে ইসলামী ব্যাংকে গ্রুপটির প্রকৃত মালিকানা দাঁড়াবে প্রায় ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ। এ কারণে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র উন্মোচনে আরও গভীর তদন্তের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

এ ঘটনায় হাইকোর্ট ইতোমধ্যে রুল জারি করেছেন। আদালত জানতে চেয়েছেন, কীভাবে ২৪টি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা ৮১.৯২ শতাংশ শেয়ার বৈধ হিসেবে গণ্য করা যায় এবং কেন সেগুলো বাজেয়াপ্ত করা হবে না। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ ক্রোক, ভোটাধিকার স্থগিত এবং পরিচালকদের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নথিপত্র বিশ্লেষণে যা পাওয়া গেছে

বিএফআইইউ জানিয়েছে, ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (সাবেক এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক), ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, মার্চেন্ট সিকিউরিটিজ, নিউ এরা সিকিউরিটিজসহ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে সংরক্ষিত জমা ও ঋণ হিসাবের রেকর্ড, ভাউচার, অনুমোদনের চিঠি এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সংস্থাটির দাবি, এসব তথ্য পর্যালোচনায় স্পষ্ট হয়েছে যে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ক্রয়ের পেছনে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল।

সাত কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু

তদন্ত অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কিনে একীভূত করার প্রাথমিক পর্যায়ে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়, যেগুলোর প্রত্যেকটিই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

এর মধ্যে প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনাল ৭১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা মূল্যের ২ লাখ ২৩ হাজার শেয়ার কেনে। এ টাকা এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের হিসাব থেকে স্থানান্তর করা হয়েছিল। অর্থায়নের অংশ হিসেবে মোমেন্টাম বিজনেস সেন্টার, এপিক অ্যাবল ট্রেডার্স, ইনভেনশন ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, আবদুল আউয়াল অ্যান্ড সন্স (পটিয়া), নবির ট্রেডিং এবং এক্সিস্টেন্স ট্রেড এজেন্সিসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণ ব্যবহার করা হয়। বিএফআইইউ এসব প্রতিষ্ঠানকে এস আলম গ্রুপের সহযোগী বা কাগুজে প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনালের ভাইস চেয়ারম্যান ও মনোনীত পরিচালক তানভীর আহমেদ সাইফুল আলম মাসুদের ভাগ্নে।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে এক্সেল ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং ৬ কোটি ৪৩ লাখ শেয়ার কেনে। টাকার উৎস ছিল সোনালী ট্রেডার্স, এস আলম সুপার এডিবল অয়েল ও এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ। এক্সেল ডায়িংয়ের পরিচালক বদরুন্নেসা ও ওয়াহিদুল আলমকে এস আলমের নিকটাত্মীয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। টাকা জোগান দেওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপি ঋণগ্রহীতার তালিকায়ও রয়েছে।

একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আর্মাডা স্পিনিং মিলস ইসলামী ব্যাংকের ৩ কোটি ৩৭ লাখ শেয়ার কেনে। এ টাকা এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল ও এস আলম রিফাইন্ড সুগার থেকে আসে। পাশাপাশি গ্রিন এক্সপোজ ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণও ব্যবহৃত হয়, যাকে বিএফআইইউ কাগুজে প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক জেসমিন আরশাদ সাইফুল আলম মাসুদের শ্যালক মো. আরশাদের স্ত্রী।

২০১৭ সালে ইউনিক্যাপ সিকিউরিটিজের মাধ্যমে গ্র্যান্ড বিজনেস ৩ কোটি ২৫ লাখ শেয়ার কেনে, যার টাকা এসেছিল এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটালের মাধ্যমে এবিসি ভেঞ্চারস ২ কোটি ২৩ লাখ শেয়ার কেনে, যার অর্থায়ন করে সোনালী ট্রেডার্স।

প্লাটিনাম এনডেভারস ৩ কোটি ২২ লাখ শেয়ার কেনে এস আলম স্টিলস, এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, জেনেসিস টেক্সটাইলস অ্যাকসেসরিজ অ্যান্ড অ্যাপারেলস, এস আলম প্রপার্টিজ এবং এস আলম অ্যান্ড কোম্পানির মাধ্যমে রাউটিং করা টাকায়। টাকার একটি অংশ প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনালের বিও অ্যাকাউন্ট থেকেও আসে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মোস্তান বিল্লাহ আদিল সাইফুল আলম মাসুদের ভাগ্নে।

ব্লু ইন্টারন্যাশনাল ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে ৩ কোটি ২৩ লাখ শেয়ার কেনে। টাকা আসে সোনালী ট্রেডার্স, চেমন ইস্পাত, এস আলম স্টিলস, এস আলম অ্যান্ড কোম্পানি, এস আলম প্রপার্টিজ এবং জেনেসিস টেক্সটাইলসের হিসাব থেকে। অর্থায়নের একটি অংশ প্লাটিনাম এনডেভারসের হিসাব থেকেও পাওয়া গেছে।

যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, ব্লু ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশফিকুর রহমান সাইফুল আলম মাসুদের আত্মীয় এবং তার জামাতার মালিকানাধীন ইউনিটেক্স গ্রুপের একজন কর্মকর্তা।

শেয়ার কেনা থেকে খেলাপি ঋণের সম্পর্ক

তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, ২০১৭ সালে একটি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত সহায়তায় ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ। যেসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুরুতে শেয়ার কেনা হয়েছিল, পরবর্তীতে সেগুলোর অনেকগুলোই ব্যাংকটির শীর্ষ খেলাপি গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে ওঠে।

ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের মধ্যে ১৫টি প্রতিষ্ঠানকে এস আলম গ্রুপ ও সাইফুল আলম মাসুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় রয়েছেন সাইফুল আলম মাসুদ, তার ছেলে আহসানুল আলম, মেয়ের জামাই বেলাল আহমেদ, তার ভাইয়েরা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। মাসুদের অন্য ভাইদের মধ্যে রয়েছেন আবদুল্লাহ হাসান, ওসমান গনি, আবদুস সামাদ লাবু, রাশেদুল আলম ও শহিদুল আলম।

ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের নামে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ব্যাংকের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণগ্রহীতা। এর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা।

এরপর রয়েছে এস আলম রিফাইন্ড সুগারের ১০ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের ১০ হাজার ১১৩ কোটি টাকা, সোনালী ট্রেডার্সের ৪ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা এবং চেমন ইস্পাতের ৩ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ। এ চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটির টাকা শেয়ার কেনার সময় ব্যবহৃত হয়েছিল।

শীর্ষ খেলাপিদের তালিকায় আরও রয়েছে আহসানুল আলমের মালিকানাধীন ইনফিনিয়া সিআর স্ট্রিপস, যার খেলাপি ঋণ ২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। এস আলম কোল্ড রোলেড স্টিলসের খেলাপি ঋণ ২ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, কর্ণফুলী ফুডসের ১ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা এবং ইনহেরেন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড ইমপেক্সের ১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। ইনহেরেন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড ইমপেক্সের মালিক আনসারুল আলম চৌধুরী সাইফুল আলম মাসুদের আত্মীয় ও তার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক।

একনজরে এস আলম-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ার

বিএফআইইউর প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, লায়নহেড বিজনেস রিসোর্সেস, এক্সেলসিওর ইমপেক্স কোম্পানি, আর্মাডা স্পিনিং মিলস, জেএমসি বিল্ডার্স, প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনাল, ব্লু ইন্টারন্যাশনাল, এবিসি ভেনচারস, প্লাটিনাম এনডেভরস এবং গ্র্যান্ড বিজনেস প্রত্যেকে প্রায় ২ থেকে ২.০২ শতাংশ হারে শেয়ার ধারণ করেছে।

এ ছাড়া পারসেপ্টা এনডেভরস ২.২৮ শতাংশ, কিংস্টন ফ্লোর মিলস ২.৫১ শতাংশ, এক্সেল ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং ৩.৪০ শতাংশ, ম্যারাথন ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ৩.৯৪ শতাংশ এবং এভারগ্রিন শিপিং ৪.১৮ শতাংশ শেয়ার ধারণ করেছে।

অন্যদিকে হলিস্টিক ইন্টারন্যাশনাল ৪.৮৯ শতাংশ, হাইক্লাশ বিজনেস এন্টারপ্রাইজেস ৪.৮৪ শতাংশ, ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি ৪.৮২ শতাংশ, ক্যারোলিনা বিজনেস এন্টারপ্রাইজেস ৪.৮২ শতাংশ, ব্রডওয়ে ইমপেক্স কোম্পানি ৪.৭৬ শতাংশ, ইউনিগ্লোব বিজনেস রিসোর্সেস ৪.৬৭ শতাংশ, পিকস বিজনেস এন্টারপ্রাইজেস ৪.৫১ শতাংশ এবং কিংসওয়ে এনডেভরস ৪.৪০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইন কী বলে

সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ৫ শতাংশের বেশি এবং অনুমতি নিয়ে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ার ধারণ করতে পারে। বিএফআইইউর অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৪ ও ১৫ ধারা লঙ্ঘন করে ৭২ শতাংশের বেশি শেয়ার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শেয়ার সরাসরি সাইফুল আলম মাসুদের নামে না থাকলেও যদি প্রমাণ করা যায় যে শেয়ার কেনার টাকা তার নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এসেছে, তাহলে মালিকানা আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব। একইভাবে পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মাধ্যমে ব্যাংকের ঋণের টাকা ব্যবহার করে শেয়ার কেনা হয়েছে বলে প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সেই মালিকানা অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন খান বলেন, ইসলামী ব্যাংকের ধারণকৃত শেয়ারগুলো একক গ্রুপের হাতে থাকা কেন অবৈধ হবে না, সে বিষয়ে আদালতে রিট করা হয়েছে। আদালত রিট গ্রহণ করে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তে এ বিষয়ে প্রমাণও পাওয়া গেছে বলে তিনি জেনেছেন। বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই আদালতে শুনানি হবে।