বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগের অবসান
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:১৫:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬ ২৯ বার পড়া হয়েছে
ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাবেক মন্ত্রী এবং দেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের নাম Tofail Ahmed। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অসংখ্য উত্থান-পতন পেরিয়ে বারবার নতুনভাবে ফিরে আসা এই নেতা সোমবার (১ জুন) বিকেলে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন এক অনন্য চরিত্র—যিনি ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতা, আন্দোলনের মঞ্চ থেকে মন্ত্রিসভা—সব জায়গাতেই রেখে গেছেন দৃশ্যমান পদচিহ্ন। জীবনের নানা রাজনৈতিক ঝড়-ঝাপটা, কারাবরণ ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি নিজেকে বারবার পুনর্গঠন করেছিলেন। তাই অনেকের কাছেই তিনি ছিলেন এক রাজনৈতিক ‘ফিনিক্স’।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছাত্রজীবনেই নেতৃত্বের গুণাবলি প্রকাশ পায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ভিপি নির্বাচিত হন। পরে ডাকসুর ভিপি হিসেবে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে আলোচিত হয়ে ওঠেন।
ইতিহাসের এক স্মরণীয় মুহূর্তে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন তোফায়েল আহমেদ। সেই ঘোষণা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিব বাহিনীর চার আঞ্চলিক প্রধানের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সংসদীয় রাজনীতিতেও ছিল তাঁর দীর্ঘ ও সফল পথচলা। ভোলা-১ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে জনগণের আস্থা ধরে রাখেন। বিভিন্ন সময়ে শিল্প, বাণিজ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবনে বহুবার কারাবরণও করতে হয়েছে তাঁকে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর টানা ৩৩ মাস কারাগারে ছিলেন। তবে প্রতিকূলতা কখনো তাঁর রাজনৈতিক যাত্রাকে থামাতে পারেনি।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম, একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নীসহ অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন হারাল এক অভিজ্ঞ, সংগ্রামী ও ইতিহাসের সাক্ষী নেতাকে; যার জীবনগাথা দেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।






















