ঢাকা ০৫:০৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিসি ফিটলিস্টের ভাইভা ঘিরে বিতর্ক: তালিকায় ‘বিতর্কিত’ কর্মকর্তারা

সুপন রায়
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১২:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ৪৪ বার পড়া হয়েছে

ছবি: প্রতিকী

বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ ঘিরে নতুন করে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছে—নিয়মিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে হঠাৎ ফোন করে কর্মকর্তাদের ভাইভায় ডাকা হয়েছে, এমনকি জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তারাও সেই তালিকায় রয়েছেন।

ডিসি ফিটলিস্ট তৈরির জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ২৮ ও ২৯তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৬৯ কর্মকর্তাকে ভাইভায় ডাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো আগাম নোটিশ বা ওয়েবসাইটে প্রকাশ না করে সরাসরি ফোনে ডাকার ঘটনা প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেওয়াজ অনুযায়ী এই ধরনের ভাইভার আগে আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয় এবং তা প্রকাশ করা হয় মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে। কিন্তু এবার সেই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি—যা অনেক কর্মকর্তার কাছে ‘নজিরবিহীন’ বলে মনে হয়েছে।

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—ভাইভায় ডাকা কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিয়োগে জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন-এ মামলাও চলমান।

বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার ২৯তম ব্যাচের এসকল কর্মকর্তাদের মধ্যে ৪জন রয়েছে যারা ছাত্রলীগের সুপারিশ নিয়ে বাবার মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট না থাকলেও এমনকি মুক্তিযোদ্ধা কোটাতে আবেদন না করেও অবৈধভাবে এই ব্যাচের সাথে যোগদান করেছেন। জালিয়াতি করে যোগদান করায় তাদের বিরুদ্ধে চলমান রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা।

ভাইভার তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তালিকার ১১ নম্বরে রয়েছে এ দিকে ছাত্রলীগের সুপারিশ নিয়ে বাবার মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট না থাকলেও এমনকি মুক্তিযোদ্ধা কোটাতে আবেদন না করেও অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের সচিব নাহিদা বারিক এর নাম। আওয়ামী শাসনামলে এই কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার হিসেবে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগদান করেন। এরপর সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে বন্দর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়, ফতুল্লা রাজস্ব সার্কেল, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের একান্ত সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় চাকরি করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে বনশিল্প করপোরেশনে বদলি করা হয়।

তালিকার ১৪ নম্বরে রয়েছে ২৯ বিসিএসএ এসআরও এর মাধ্যমে ছাত্রলীগ কোটায় নিয়োগ পাওয়া পরিকল্পনা বিভাগের উপপ্রধান নাসরীন পারভীন। এই কর্মকর্তা আওয়ামী আমলে গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার, টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার, জামালপুর ও গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়ন ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলে তাকে পরিকল্পনা বিভাগে বদলি করা হয়। তালিকার ১৩ নম্বরে রয়েছে একইভাবে নিয়োগ পাওয়া সাজিয়া আফরিনের নাম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, যদি কোনো অসৎ উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে এমন গোপনীয়ভাবে ভাইভা আয়োজনের প্রয়োজন পড়ত না। এতে পুরো ফিটলিস্ট প্রণয়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, ডিসি পদে নিয়োগের আগে কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা, পদোন্নতি, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন এবং প্রশাসনিক দক্ষতার ভিত্তিতে যাচাই করা হয়। কিন্তু বর্তমান প্রক্রিয়া সেই নীতিমালার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এই পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে এমন বিতর্ক জনমনে আস্থা সংকট তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

ডিসি ফিটলিস্টের ভাইভা ঘিরে বিতর্ক: তালিকায় ‘বিতর্কিত’ কর্মকর্তারা

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১২:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ ঘিরে নতুন করে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছে—নিয়মিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে হঠাৎ ফোন করে কর্মকর্তাদের ভাইভায় ডাকা হয়েছে, এমনকি জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তারাও সেই তালিকায় রয়েছেন।

ডিসি ফিটলিস্ট তৈরির জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ২৮ ও ২৯তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৬৯ কর্মকর্তাকে ভাইভায় ডাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো আগাম নোটিশ বা ওয়েবসাইটে প্রকাশ না করে সরাসরি ফোনে ডাকার ঘটনা প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেওয়াজ অনুযায়ী এই ধরনের ভাইভার আগে আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয় এবং তা প্রকাশ করা হয় মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে। কিন্তু এবার সেই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি—যা অনেক কর্মকর্তার কাছে ‘নজিরবিহীন’ বলে মনে হয়েছে।

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—ভাইভায় ডাকা কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিয়োগে জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন-এ মামলাও চলমান।

বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার ২৯তম ব্যাচের এসকল কর্মকর্তাদের মধ্যে ৪জন রয়েছে যারা ছাত্রলীগের সুপারিশ নিয়ে বাবার মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট না থাকলেও এমনকি মুক্তিযোদ্ধা কোটাতে আবেদন না করেও অবৈধভাবে এই ব্যাচের সাথে যোগদান করেছেন। জালিয়াতি করে যোগদান করায় তাদের বিরুদ্ধে চলমান রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা।

ভাইভার তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তালিকার ১১ নম্বরে রয়েছে এ দিকে ছাত্রলীগের সুপারিশ নিয়ে বাবার মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট না থাকলেও এমনকি মুক্তিযোদ্ধা কোটাতে আবেদন না করেও অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের সচিব নাহিদা বারিক এর নাম। আওয়ামী শাসনামলে এই কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার হিসেবে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগদান করেন। এরপর সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে বন্দর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়, ফতুল্লা রাজস্ব সার্কেল, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের একান্ত সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় চাকরি করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে বনশিল্প করপোরেশনে বদলি করা হয়।

তালিকার ১৪ নম্বরে রয়েছে ২৯ বিসিএসএ এসআরও এর মাধ্যমে ছাত্রলীগ কোটায় নিয়োগ পাওয়া পরিকল্পনা বিভাগের উপপ্রধান নাসরীন পারভীন। এই কর্মকর্তা আওয়ামী আমলে গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার, টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার, জামালপুর ও গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়ন ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলে তাকে পরিকল্পনা বিভাগে বদলি করা হয়। তালিকার ১৩ নম্বরে রয়েছে একইভাবে নিয়োগ পাওয়া সাজিয়া আফরিনের নাম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, যদি কোনো অসৎ উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে এমন গোপনীয়ভাবে ভাইভা আয়োজনের প্রয়োজন পড়ত না। এতে পুরো ফিটলিস্ট প্রণয়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, ডিসি পদে নিয়োগের আগে কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা, পদোন্নতি, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন এবং প্রশাসনিক দক্ষতার ভিত্তিতে যাচাই করা হয়। কিন্তু বর্তমান প্রক্রিয়া সেই নীতিমালার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এই পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে এমন বিতর্ক জনমনে আস্থা সংকট তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।