ঢাকা ০৯:৩৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ২৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইদ-এ-মিলাদুন্নবি: শরয়ি দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতার বিশ্লেষণ

সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৩:৩৪:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৭৫ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ইসলামের শিক্ষা সবসময় পরিষ্কার আর সোজাসাপ্টা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য কুরআন নাজিল করেছেন, আর রাসুল (সা.) তাঁর জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন কিভাবে সেটা মেনে চলতে হয়। তাই মুসলমান হিসেবে ইবাদত হোক বা উৎসব, ইসলামের নিয়ম হলো—যা কুরআন আর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, শুধু সেটাই গ্রহণযোগ্য। ইতিহাস বলে, রাসুল (সা.) আর তাঁর সাহাবীরা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করতেন এবং দ্বীনে কোনো নতুন কিছু যোগ করতেন না। কিন্তু আজ আমরা সমাজে এমন অনেক উৎসব দেখি, যেগুলোর আসল ইসলামের সাথে সম্পর্ক নেই। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো ইদ-এ-মিলাদুন্নবি। কেউ এটাকে রাসুলপ্রেমের প্রকাশ মনে করেন, আবার কেউ একে বিদআত বলে আখ্যা দেন। তাই সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এই লেখায় আমরা জানব আসলে ইদ-এ-মিলাদুন্নবি সম্পর্কে ইসলামের শরয়ি অবস্থান কী, এর ইতিহাস কোথা থেকে শুরু হলো এবং আমাদের করণীয় কী হওয়া উচিত।

ইসলামে উৎসবের মূলনীতি

ইদে মিলাদুন্নবি মুসলমানদের কোনো উৎসব নয়। কারণ ইসলামে উৎসব নির্ধারণের অধিকার শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)–এর। রাসুল (সা.) নিজে কখনো জন্মদিন পালন করেননি, সাহাবিরাও করেননি। তাই এটি শরিয়তের স্বীকৃত কোনো উৎসব হতে পারে না।

মদিনায় আগমনের পর রাসুল (সা.) দেখলেন, মানুষ দুটি দিনে উৎসব পালন করছে। জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, “জাহেলিয়াতের যুগে আমরা এই দিনে আনন্দ করতাম।” তখন তিনি বললেন, “আল্লাহ তোমাদের জন্য এর চেয়ে উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন—ইদুল ফিতর ও ইদুল আজহা।”

সহিহ হাদিসে বর্ণিত এই ঘটনাটি থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলাম তার অনুসারীদের জন্য নতুন কোনো উৎসব প্রবর্তনের সুযোগ রাখেনি। যদি এই দুটি ইদের বাইরে কোনো উৎসবের প্রয়োজন থাকত, তাহলে রাসুল (সা.) নিজেই তা নির্দিষ্ট করে দিতেন।

ইদ-এ-মিলাদুন্নবির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

রাসুল (সা.) এর জন্মদিন পালন করা হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ কুরআন বা হাদিসের কোথাও নেই। এমনকি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় অনুসারী, সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণ, যারা তাঁর ভালোবাসা ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে অতুলনীয় ছিলেন, তারাও এটি পালন করেননি। ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্ম—সাহাবা, তাবেঈন এবং তাবে-তাবেঈন— যাদেরকে ইসলামের স্বর্ণযুগ বলা হয়, তাদের জীবনেও ইদ-এ-মিলাদুন্নবির কোনো অস্তিত্ব ছিল না। এর কারণ একটাই: এই উৎসব ইসলামের অংশ নয়।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ইদ-এ-মিলাদুন্নবির প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা ঘটে রাসুল (সা.) এর ইন্তিকালের বহু শতক পর। সর্বপ্রথম মিসরের ফাতিমি শাসনামলে এর প্রচলন শুরু হয়, যা ছিল একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক কৌশল। অর্থাৎ, এই উৎসব রাসুল (সা.) এর শিক্ষা থেকে সরাসরি আসেনি, বরং এটি পরবর্তীকালে মানবসৃষ্ট সংযোজন।


বিদআতের ধারণা ও এর ভয়াবহতা

ইসলামে ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো, নতুন কোনো কিছু সংযোজন করা যাবে না। রাসুল (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন কিছু নতুন সংযোজন করবে যা এর অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)। এই হাদিসটি আমাদেরকে সতর্ক করে যে, ইবাদত শুধু সেভাবেই গ্রহণীয়, যেভাবে রাসুল (সা.) নিজে তা পালন করেছেন। নিজেদের ইচ্ছামতো কিছু যোগ করলে তা আল্লাহর কাছে কবুল হয় না।

বিদআত অর্থাৎ ধর্মে নতুন প্রথা চালু করাকে ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে রাসুল (সা.) কিয়ামতের দিন তাঁর হাউজে কাওসারের কাছে কিছু লোককে আসতে না দেওয়ার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। যখন তিনি জানতে চাইলেন যে, তারা কি তাঁর উম্মত? উত্তরে বলা হলো, “আপনি চলে যাওয়ার পর এরা দ্বীনে নতুন কিছু সংযোজন করেছিল।” এটি বিদআতের ভয়াবহতা প্রমাণ করে, যা শুধু পার্থিব নয়, বরং আখিরাতেও ক্ষতির কারণ হবে।


অন্য ধর্মের অনুকরণ

মুসলিমদের জন্য এটি একটি মৌলিক বিধান যে তারা অন্য কোনো জাতির অনুকরণ করবে না। রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ করে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত।” ইদ-এ-মিলাদুন্নবি পালনের প্রথাটি অনেকটা হিন্দু, বৌদ্ধদের দেবতা, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের নবি ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের জন্মদিন পালনের রীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। মুসলমানরা যখন এটি পালন করে, তখন অজান্তেই তারা অন্য ধর্মের সংস্কৃতিকে অনুকরণ করে বসে, যা ইসলামের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করে।

বাংলাদেশে প্রচলিত রীতিনীতি ও তার শরয়ি ভিত্তি

আমাদের সমাজে ইদ-এ-মিলাদুন্নবি উপলক্ষে যেসব আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত, যেমন জশনে জুলুস, শোভাযাত্রা, আলোকসজ্জা, মিষ্টি বিতরণ, ইত্যাদি—এগুলোর কোনোটিরই শরয়ি ভিত্তি নেই। যদি কেউ এগুলিকে ইবাদত বলে দাবি করে, তবে তার জন্য অবশ্যই কুরআন বা সহিহ হাদিসের সুস্পষ্ট প্রমাণ পেশ করতে হবে। যদি প্রমাণ না থাকে, তাহলে এগুলি কেবল সামাজিক আয়োজন বা প্রথা হিসেবে গণ্য হবে। আর যখন এমন কোনো প্রথাকে ধর্মের অংশ হিসেবে বিশ্বাস করা হয়, তখন তা বিদআতে রূপান্তরিত হয়।

রাসুলপ্রেম প্রকাশের সঠিক পদ্ধতি

যদি প্রশ্ন আসে, রাসুল (সা.) এর প্রতি ভালোবাসা কীভাবে প্রকাশ করব? ইসলাম এর সহজ ও সুন্দর সমাধান দিয়েছে। আল্লাহ তা’আলা কুরআনে বলেছেন, (হে রাসুল (সা.) বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ ও তোমাদিগকে ভালবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু। (সূরাঃ আল ইমরান, আয়াতঃ ৩১)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, রাসুল (সা.) এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা হলো তাঁর সুন্নাহকে অনুসরণ করা। এর মানে হলো:
বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা।

তাঁর সিরাত (জীবনী) পাঠ করে তা থেকে শিক্ষা নেওয়া।

তাঁর আদর্শ ও শিক্ষা সমাজে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা।

দৈনন্দিন জীবনে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করা।

এছাড়াও রাসুল (সা.) নিজে সোমবারে রোজা রাখতেন এবং এর কারণ হিসেবে বলেছিলেন, “এই দিনেই আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।” এটিই হলো তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি সুন্নাহসম্মত তরিকা। এই আমলটি ব্যক্তিগত ইবাদত, কোনো উৎসব নয়।

বাস্তবতা ও আমাদের করণীয়

বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে আনুষ্ঠানিকতার প্রতি গুরুত্ব দিতে গিয়ে ফরজ ইবাদতগুলো প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। মানুষ নামাজ, রোজা, যাকাতের মতো মৌলিক বিধান পালনে যতটা যত্নবান হওয়া উচিত, ততটা নয়। রাসুল (সা.) এর প্রতি সত্যিকারের প্রেম হলো তাঁর নির্দেশিত ফরজ ও সুন্নাহগুলো যথাযথভাবে পালন করা।

সুতরাং, ইদ-এ-মিলাদুন্নবির মতো নতুন ও বিতর্কিত উৎসবের পেছনে না ছুটে, আমাদের উচিত রাসুল (সা.) এর শিক্ষাগুলোকে জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা। আমাদের জীবন যদি তাঁর সুন্নাহর আলোয় আলোকিত হয়, তবে সেটাই হবে তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন।

ইসলামে উৎসবের দিন দুটি: ইদ-উল-ফিতর ও ইদ-উল-আযহা। এর বাইরে কোনো উৎসব শরিয়তের চোখে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আসুন, আমরা তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে তাঁর প্রকৃত প্রেমিক হওয়ার চেষ্টা করি।

সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী
লেখক ও সমাজ গবেষক

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

ইদ-এ-মিলাদুন্নবি: শরয়ি দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতার বিশ্লেষণ

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৩:৩৪:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫

ইসলামের শিক্ষা সবসময় পরিষ্কার আর সোজাসাপ্টা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য কুরআন নাজিল করেছেন, আর রাসুল (সা.) তাঁর জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন কিভাবে সেটা মেনে চলতে হয়। তাই মুসলমান হিসেবে ইবাদত হোক বা উৎসব, ইসলামের নিয়ম হলো—যা কুরআন আর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, শুধু সেটাই গ্রহণযোগ্য। ইতিহাস বলে, রাসুল (সা.) আর তাঁর সাহাবীরা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করতেন এবং দ্বীনে কোনো নতুন কিছু যোগ করতেন না। কিন্তু আজ আমরা সমাজে এমন অনেক উৎসব দেখি, যেগুলোর আসল ইসলামের সাথে সম্পর্ক নেই। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো ইদ-এ-মিলাদুন্নবি। কেউ এটাকে রাসুলপ্রেমের প্রকাশ মনে করেন, আবার কেউ একে বিদআত বলে আখ্যা দেন। তাই সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এই লেখায় আমরা জানব আসলে ইদ-এ-মিলাদুন্নবি সম্পর্কে ইসলামের শরয়ি অবস্থান কী, এর ইতিহাস কোথা থেকে শুরু হলো এবং আমাদের করণীয় কী হওয়া উচিত।

ইসলামে উৎসবের মূলনীতি

ইদে মিলাদুন্নবি মুসলমানদের কোনো উৎসব নয়। কারণ ইসলামে উৎসব নির্ধারণের অধিকার শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)–এর। রাসুল (সা.) নিজে কখনো জন্মদিন পালন করেননি, সাহাবিরাও করেননি। তাই এটি শরিয়তের স্বীকৃত কোনো উৎসব হতে পারে না।

মদিনায় আগমনের পর রাসুল (সা.) দেখলেন, মানুষ দুটি দিনে উৎসব পালন করছে। জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, “জাহেলিয়াতের যুগে আমরা এই দিনে আনন্দ করতাম।” তখন তিনি বললেন, “আল্লাহ তোমাদের জন্য এর চেয়ে উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন—ইদুল ফিতর ও ইদুল আজহা।”

সহিহ হাদিসে বর্ণিত এই ঘটনাটি থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলাম তার অনুসারীদের জন্য নতুন কোনো উৎসব প্রবর্তনের সুযোগ রাখেনি। যদি এই দুটি ইদের বাইরে কোনো উৎসবের প্রয়োজন থাকত, তাহলে রাসুল (সা.) নিজেই তা নির্দিষ্ট করে দিতেন।

ইদ-এ-মিলাদুন্নবির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

রাসুল (সা.) এর জন্মদিন পালন করা হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ কুরআন বা হাদিসের কোথাও নেই। এমনকি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় অনুসারী, সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণ, যারা তাঁর ভালোবাসা ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে অতুলনীয় ছিলেন, তারাও এটি পালন করেননি। ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্ম—সাহাবা, তাবেঈন এবং তাবে-তাবেঈন— যাদেরকে ইসলামের স্বর্ণযুগ বলা হয়, তাদের জীবনেও ইদ-এ-মিলাদুন্নবির কোনো অস্তিত্ব ছিল না। এর কারণ একটাই: এই উৎসব ইসলামের অংশ নয়।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ইদ-এ-মিলাদুন্নবির প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা ঘটে রাসুল (সা.) এর ইন্তিকালের বহু শতক পর। সর্বপ্রথম মিসরের ফাতিমি শাসনামলে এর প্রচলন শুরু হয়, যা ছিল একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক কৌশল। অর্থাৎ, এই উৎসব রাসুল (সা.) এর শিক্ষা থেকে সরাসরি আসেনি, বরং এটি পরবর্তীকালে মানবসৃষ্ট সংযোজন।


বিদআতের ধারণা ও এর ভয়াবহতা

ইসলামে ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো, নতুন কোনো কিছু সংযোজন করা যাবে না। রাসুল (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন কিছু নতুন সংযোজন করবে যা এর অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)। এই হাদিসটি আমাদেরকে সতর্ক করে যে, ইবাদত শুধু সেভাবেই গ্রহণীয়, যেভাবে রাসুল (সা.) নিজে তা পালন করেছেন। নিজেদের ইচ্ছামতো কিছু যোগ করলে তা আল্লাহর কাছে কবুল হয় না।

বিদআত অর্থাৎ ধর্মে নতুন প্রথা চালু করাকে ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে রাসুল (সা.) কিয়ামতের দিন তাঁর হাউজে কাওসারের কাছে কিছু লোককে আসতে না দেওয়ার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। যখন তিনি জানতে চাইলেন যে, তারা কি তাঁর উম্মত? উত্তরে বলা হলো, “আপনি চলে যাওয়ার পর এরা দ্বীনে নতুন কিছু সংযোজন করেছিল।” এটি বিদআতের ভয়াবহতা প্রমাণ করে, যা শুধু পার্থিব নয়, বরং আখিরাতেও ক্ষতির কারণ হবে।


অন্য ধর্মের অনুকরণ

মুসলিমদের জন্য এটি একটি মৌলিক বিধান যে তারা অন্য কোনো জাতির অনুকরণ করবে না। রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ করে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত।” ইদ-এ-মিলাদুন্নবি পালনের প্রথাটি অনেকটা হিন্দু, বৌদ্ধদের দেবতা, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের নবি ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের জন্মদিন পালনের রীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। মুসলমানরা যখন এটি পালন করে, তখন অজান্তেই তারা অন্য ধর্মের সংস্কৃতিকে অনুকরণ করে বসে, যা ইসলামের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করে।

বাংলাদেশে প্রচলিত রীতিনীতি ও তার শরয়ি ভিত্তি

আমাদের সমাজে ইদ-এ-মিলাদুন্নবি উপলক্ষে যেসব আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত, যেমন জশনে জুলুস, শোভাযাত্রা, আলোকসজ্জা, মিষ্টি বিতরণ, ইত্যাদি—এগুলোর কোনোটিরই শরয়ি ভিত্তি নেই। যদি কেউ এগুলিকে ইবাদত বলে দাবি করে, তবে তার জন্য অবশ্যই কুরআন বা সহিহ হাদিসের সুস্পষ্ট প্রমাণ পেশ করতে হবে। যদি প্রমাণ না থাকে, তাহলে এগুলি কেবল সামাজিক আয়োজন বা প্রথা হিসেবে গণ্য হবে। আর যখন এমন কোনো প্রথাকে ধর্মের অংশ হিসেবে বিশ্বাস করা হয়, তখন তা বিদআতে রূপান্তরিত হয়।

রাসুলপ্রেম প্রকাশের সঠিক পদ্ধতি

যদি প্রশ্ন আসে, রাসুল (সা.) এর প্রতি ভালোবাসা কীভাবে প্রকাশ করব? ইসলাম এর সহজ ও সুন্দর সমাধান দিয়েছে। আল্লাহ তা’আলা কুরআনে বলেছেন, (হে রাসুল (সা.) বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ ও তোমাদিগকে ভালবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু। (সূরাঃ আল ইমরান, আয়াতঃ ৩১)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, রাসুল (সা.) এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা হলো তাঁর সুন্নাহকে অনুসরণ করা। এর মানে হলো:
বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা।

তাঁর সিরাত (জীবনী) পাঠ করে তা থেকে শিক্ষা নেওয়া।

তাঁর আদর্শ ও শিক্ষা সমাজে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা।

দৈনন্দিন জীবনে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করা।

এছাড়াও রাসুল (সা.) নিজে সোমবারে রোজা রাখতেন এবং এর কারণ হিসেবে বলেছিলেন, “এই দিনেই আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।” এটিই হলো তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি সুন্নাহসম্মত তরিকা। এই আমলটি ব্যক্তিগত ইবাদত, কোনো উৎসব নয়।

বাস্তবতা ও আমাদের করণীয়

বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে আনুষ্ঠানিকতার প্রতি গুরুত্ব দিতে গিয়ে ফরজ ইবাদতগুলো প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। মানুষ নামাজ, রোজা, যাকাতের মতো মৌলিক বিধান পালনে যতটা যত্নবান হওয়া উচিত, ততটা নয়। রাসুল (সা.) এর প্রতি সত্যিকারের প্রেম হলো তাঁর নির্দেশিত ফরজ ও সুন্নাহগুলো যথাযথভাবে পালন করা।

সুতরাং, ইদ-এ-মিলাদুন্নবির মতো নতুন ও বিতর্কিত উৎসবের পেছনে না ছুটে, আমাদের উচিত রাসুল (সা.) এর শিক্ষাগুলোকে জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা। আমাদের জীবন যদি তাঁর সুন্নাহর আলোয় আলোকিত হয়, তবে সেটাই হবে তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন।

ইসলামে উৎসবের দিন দুটি: ইদ-উল-ফিতর ও ইদ-উল-আযহা। এর বাইরে কোনো উৎসব শরিয়তের চোখে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আসুন, আমরা তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে তাঁর প্রকৃত প্রেমিক হওয়ার চেষ্টা করি।

সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী
লেখক ও সমাজ গবেষক