সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করতে হবে
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৩৫:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৫ ১৮৯ বার পড়া হয়েছে
সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমেই আলোকিত মানুষ গড়া সম্ভব। সকল প্রকার অপশক্তিকে প্রতিহত করার অন্যতম উপায় হলো সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা। তাই সকল প্রকার অপশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সংস্কৃতি চর্চার কোনো বিকল্প নেই।
অনেক রস বৈচিত্রে পরিপূর্ণ আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ। অজস্র গ্রামগঞ্জ গাঁথা আমাদের এ প্রিয় দেশ। সহজ সরল গ্রাম্য মানুষের আচার আচরণ অভ্যাস স্মৃতি সংস্কার কুসংস্কার-রিদ্ধ ইতিহাস ঐতিহ্যের রূপকথা দ্বারা নির্মিত আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের প্রকৃত পরিচয়।
আমাদের শেকড় সংস্কৃতি ছাড়া দেশকে ইতিহাস পরিপূর্ণতা দাবি করতে পারে না। তাই অকৃত্রিম ও সকল ইতিহাসের মাতা আবাহমান গ্রাম-বাংলার সংস্কৃতিকে জানা প্রয়োজন। আমাদের দেশের অর্ন্তদৃষ্টি মেলে জানতে হলে তার গ্রামীণ মানুষ, তার ভাষা সাহিত্য, লৌকিক শিল্প প্রকৃতি, তার গ্রামীণ সমাজকে অবশ্যই বান্ধব দৃষ্টিতে অকপটে নিরীক্ষণ করা চাই। ঐতিহাসিক, ভৌগলিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জনগোষ্ঠীর নৃতাত্বিক বৈশিষ্টের পটভূমিতেই আমাদের গ্রামীণ জীবন বিবেচ্য। লৌকিক প্রতিবেশে লোকজীবনের ভাষা সাহিত্য সংগীত নৃত্যনাট্য, শিল্প, ধর্ম বিশ্বাস, উৎসব পার্বণ ইত্যাদি বহু বিচিত্র অভিব্যক্তি যুক্ত এবং আদি পল্লীজীবন ও আরণ্য জনপদই সেই আবাহমান সংস্কৃতির শেকড়ের লালন ক্ষেত্র।
বোধকরি মানুষ ও তার পারিপার্শ্বিক বিচিত্র ও সচেতন সহযোগিতার ব্যাপার নিয়ে আমাদের সাংস্কৃতিক জগত। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল কৃষিপ্রধান দেশের শতকরা ৭০ জন লোকই ক্ষেতখামার করে জীবিকা নির্বাহ করে। নিতান্ত অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত যারা তাদের অধিকাংশ বাংলার পল্লীতে কৃষি ও অন্যান্য সামান্য ছোট কাজকর্ম করে জীবিকা চালায়। গ্রাম প্রধান বাংলাদেশের সিংহভাগ লোকই বর্হিজগতের সুন্দর সুশিক্ষিত পরিবেশ থেকে বঞ্চিত। তবু আছে তাদের জীবনচর্যা, জীবনের সুখ দুঃখ, সমাজ ধর্ম দেহ মনের বিবিধভাবনা। আর এরই ফলশ্রুতি হলো আমাদের গ্রাম বাংলার আবাহমান সংস্কৃতি।
ত্যি বলতে কি। আমাদের পুরো দেশটাই হলো গ্রামীণ সাংস্কৃতির দেশ। এদেশ লোক সাহিত্যের দেশ, এখানে রয়েছে ভাটিয়ালীর ভাটির স্রোতের গান, শ্বাশত বাংলার ফসল তোলার গান, নানারকম লোকজ উৎসব। নগরজীবনেও আমাদের সুস্থ্য সংস্কৃতির বাস্তব প্রতিভাস একেবারে অনুপস্থিত নয়। কাজের তাগিদে বাংলাদেশের পল্লির সাধারণ অনেক মানুষই শহরের গণ্ডিবদ্ধ জীবনে বাস করতে বাধ্য। মুচি, মেথার, ডোম, কুলিকামিন, শ্রমিক, মজুর, রিক্সাওয়ালা, অশিক্ষিত অমার্জিত দোকানদার, হকার ইত্যাদি শ্রেণির লোক কিন্তু গ্রামের আবেষ্টনী থেকে বিচ্যুত হলেও তাদের মনমেজাজে চিন্তা চেতনায় গ্রামীণ প্রতিবেশের উপর নির্ভরশীল।
তাদের পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্য অনুযায়ী তারা নগর জীবনের পাশাপাশি গ্রামীণ সাংস্কৃতিক জীবনের বিবিধ ভাব প্রদর্শন করতে সর্বদাই উন্মুখ। এদিক থেকে গ্রাম বাংলার আবাহমান সংস্কৃতিক জীবনের নানা প্রতিচ্ছবির আনাগোনা আধুনিকতম শহুরে জীবনেও অনেকখানি উপস্থিত বলে প্রতিয়মান হয়। তবু ও আমাদের দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মের নামে বিভিন্ন সন্ত্রাস চলছে প্রতিনিয়ত। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, ও মানুষ হত্যা, সারা বিশ্বে এখন আতঙ্কের বিষয়।
একটি দেশের অন্যতম চালিকাশক্তি হলো সে দেশের আগামী প্রজন্ম। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশের আগামী প্রজন্মকে সুস্থ্য সাংস্কৃতিক মূলধারায় আনা প্রয়োজন। তাই সন্ত্রাস দমনে দেশে একটি সাংস্কৃতিক গণজাগরণ তৈরি করতে হবে। জেলা-উপজেলায় শিল্পকলা একাডেমি-শিশু একাডেমিগুলো এখন ঘুমোচ্ছে, এদের জাগিয়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতার মতো সহশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। নিয়মিতভাবে বাঙালি/জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক চর্চা থাকতে হবে। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই ভারত ও বাংলাদেশের দুই প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। সম্প্রতি বর্তমান সরকার এই বলে আশ্বস্ত করেন যে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় আপনি নিজেকে কখনো একা ভাববেন না। ভারত সব সময় পাশে থেকে আপনাকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে যাবে।’ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সাধ্যমতো সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও এ ব্যাপারে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। অনেক ক্ষেত্রে বৈশ্বিক উদ্যোগের চেয়েও আঞ্চলিক উদ্যোগ অনেক বেশি কার্যকর হয়। দেখা গেছে, কোনো একটি ঘটনা ঘটিয়ে এক দেশের অপরাধীরা আরেক দেশে গিয়ে আত্মগোপন করে। সন্ত্রাসীরা যাতে এভাবে সীমান্ত অতিক্রম করতে না পারে তার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা। তা ছাড়া সন্ত্রাসীদের অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহ রোধ করতেও দুই দেশের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে বেনাপোলের আধুনিক চেকপোস্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এখানে এমন সব অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছে, যাতে লুকিয়ে অস্ত্র আনার সুযোগ খুব কমই পাওয়া যাবে। আটটি স্থলবন্দরে দ্রুত আধুনিক চেকপোস্ট স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া অরক্ষিত সম্পূর্ণ সীমান্ত সুরক্ষিত করতে হবে, যেন কোনোভাবেই অস্ত্র ও বিস্ফোরকের চালান দেশে না ঢুকতে পারে। শুধু ভারত নয়, মিয়ানমারের সঙ্গেও একই ধরনের সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের সন্ত্রাসরা রিক্রুট, প্রশিক্ষণ ও অর্থ সংগ্রহে মালয়েশিয়াকে ব্যবহার করছে। এ ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর যেমন কঠোর ভূমিকা নিয়েছে, তেমনি কঠোর ভূমিকা যেন মালয়েশিয়ার সরকারও নেয়, সে জন্য তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। একইভাবে আলোচনা চালাতে হবে প্রতিবেশী অন্য দেশের সঙ্গেও।
কারণ একটাই, আমরা কোনোভাবেই বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদের বিস্তার দেখতে চাই না। এ জন্য সরকারের ওপর দায়িত্ব হয়ে গেছে, সন্ত্রাসের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের প্রতিহত করা। একজন সংস্কৃতবান মানুষ কখনো সন্ত্রাস তৎপরতা কিংবা মানুষ হত্যা ও সন্ত্রাসী কাজে অংশ নিতে পারে না। বরং সে সমাজের আলোকিত মানুষ হিসেবে এগিয়ে আসে সমাজের সাধারণ মানুষের জন্য। তাই, সন্ত্রাসবাদ, মানুষ হত্যা, হানাহানি, কাটাকাটি বন্ধ হবার সময় এখনই। একটা জাতির মানবিক গঠনের পেছনে তাই আবাহমান সংস্কৃতির গুরুত্ব অপরিসীম। এই অস্থির সময়ে আমাদের আগামী প্রজন্মকে তাই সুস্থ সাংস্কৃতিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ও বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চেতনায় অনুপ্রাণিত করতে হবে। তাদের গড়ে তুলতে হবে আলোকিত মানুষ হিসেবে।
লেখক: মোহাম্মদ কবির হোসেন
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার
মাধবপুর, হবিগঞ্জ




















