বিবিসির প্রতিবেদন/ তারেক রহমানকে দিল্লিতে নিতে এত আগ্রহ কেন ভারতের?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৮:২৪:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে জোর দিচ্ছে দিল্লি। আর সেই সমীকরণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরে নিতে বিশেষ আগ্রহ দেখাচ্ছে ভারত। আনুষ্ঠানিকভাবে সফরের তারিখ চূড়ান্ত না হলেও একাধিক আমন্ত্রণ, উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ এবং রাষ্ট্রপতি ভবনের ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান ঘিরে আগাম ই-মেইল পাঠানোর ঘটনায় সফর নিয়ে জল্পনা তীব্র হয়েছে।
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই তাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানায় দিল্লি। ভারতের হাইকমিশনারও জানিয়েছেন, সফর হলে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও স্মরণীয় অভ্যর্থনা দেওয়া হবে। পরে অবশ্য রাষ্ট্রপতি ভবনের সেই ই-মেইল প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
দিল্লির এত আগ্রহ কেন?
মূল কারণ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন সমীকরণ। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়ে।
বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দিল্লি সেই সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায় পুনর্গঠন করতে চাইছে। বিদ্যুৎ-জ্বালানি, চিকিৎসা ভিসা ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগও ধীরে ধীরে সক্রিয় হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় বাধা শেখ হাসিনা?
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। ঢাকা তাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করেছে। বাংলাদেশের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডও দিয়েছে। তবে হাসিনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং ভারত জানিয়েছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধ তারা বিবেচনা করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাসিনার ভারতের মাটি থেকে দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য। বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা এবং তারেক রহমানের সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তার বক্তব্য নতুন করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি করেছে। ভারত অবশ্য জানিয়েছে, ওই অনুষ্ঠানে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং বাংলাদেশের সরকার নিয়ে করা বক্তব্যকে তারা সমর্থন করে না।
পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতাও ভাবাচ্ছে দিল্লিকে
শুধু হাসিনা ইস্যুই নয়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সম্ভাব্য পরিবর্তনও ভারতের আগ্রহ বাড়িয়েছে। হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কেও উষ্ণতা দেখা গেছে। উচ্চপর্যায়ের সামরিক সফর, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তা সমীকরণে বাংলাদেশের আগ্রহ—সবকিছুই পর্যবেক্ষণ করছে দিল্লি।
বাংলাদেশ ভারতের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত, ভৌগোলিক নৈকট্য, ভাষা-সংস্কৃতির যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের গুরুত্ব ভারতের কাছে অনেক।
তবে নতুন বাস্তবতায় দিল্লির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো হাসিনা-যুগের ঘনিষ্ঠতার পুনরাবৃত্তি না করে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। একইভাবে তারেক রহমানের সরকারেরও চ্যালেঞ্জ—ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি যে স্বাধীন, সেই বার্তা স্পষ্ট রাখা।
সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এবং ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনকে ঘিরে তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত।
সব মিলিয়ে, দিল্লির বার্তা স্পষ্ট—শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের সরকারের সঙ্গে দ্রুত সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে চায় ভারত। কিন্তু হাসিনার প্রত্যর্পণ, তার রাজনৈতিক তৎপরতা এবং বাংলাদেশের বদলে যাওয়া পররাষ্ট্রনীতিই সেই পথে বড় বাধা।
























