রেড নোটিশ কী, কেন গুরুত্বপূর্ণ?
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৩০:০৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬ ৫১ বার পড়া হয়েছে
আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের রেড নোটিশে বর্তমানে ৫৯ জন বাংলাদেশির নাম থাকলেও তাদের বেশিরভাগকেই এখনো দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। এ বাস্তবতার মধ্যেই সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এখনো সহজ নয়। এটি নির্ভর করবে বাংলাদেশের আইনি প্রস্তুতি, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আদালত ও প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর।
রেড নোটিশ কী, কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ইন্টারপোলের রেড নোটিশকে অনেকেই আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মনে করলেও বাস্তবে এটি একটি সতর্কবার্তা মাত্র। কোনো ব্যক্তি একটি দেশে অপরাধের অভিযোগে পলাতক থাকলে তার অবস্থান শনাক্ত, নজরদারি বা সাময়িক আটকের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে অবহিত করা হয়। তবে রেড নোটিশ জারি হলেই সংশ্লিষ্ট দেশ তাকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য নয়।
প্রতিটি দেশ নিজস্ব আইন ও বিচারিক কাঠামোর ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় রেড নোটিশ কার্যকর করবে কি না।
তালিকায় যাদের নাম
ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত বাংলাদেশিদের মধ্যে রয়েছেন আরাভ খান ওরফে রবিউল ইসলাম, শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ, গোলাম ফারুক অভি, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত খন্দকার আবদুর রশীদ ও শরীফুল হক ডালিম, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত আবুল কালাম আজাদসহ আরও অনেকে।
তবে তাদের অধিকাংশই এখনো বিদেশে অবস্থান করছেন এবং প্রত্যর্পণ করা সম্ভব হয়নি।
যাদের দেশে আনা গেছে
সাম্প্রতিক সময়ে দুবাই থেকে দুই আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। নরসিংদীর আলোচিত হত্যা মামলার আসামি মহসিন মিয়া ও আরিফ সরকারকে ইন্টারপোলের সহায়তা এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় দেশে ফিরিয়ে আনে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
আরাভ ও জিসান কেন অধরাই রয়ে গেলেন?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, আরাভ খান ও জিসান আহমেদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব ও পরিচয়সংক্রান্ত জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক দেশের পাসপোর্ট ব্যবহারের অভিযোগ ছিল এবং তারা নিজেদের বাংলাদেশি পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন।
ফলে পরিচয় যাচাই, নাগরিকত্ব নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতার কারণে তাদের প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগোয়নি।
বেনজীরের ক্ষেত্রে কী ভিন্ন?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বেনজীর আহমেদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক।
- তিনি বর্তমানে দুবাই পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।
- তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার ও জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফৌজদারি অপরাধ।
- বাংলাদেশের আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও মামলার নথি বিদ্যমান।
- তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ ইতোমধ্যে অগ্রসর হয়েছে।
এসব বিষয় প্রত্যর্পণ আবেদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। ফলে প্রচলিত কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এগোতে হবে।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আদালতের আদেশ, মামলার নথি, অভিযোগপত্র, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং অপরাধসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্যসহ একটি শক্তিশালী আইনি আবেদনপত্র পাঠাতে হবে।
আমিরাতের আদালত যাচাই করবে—
- অভিযোগগুলো তাদের আইনেও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কি না,
- মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না,
- অভিযুক্তের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি আছে কি না,
- বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করছে কি না।
৩০ দিনের মধ্যে আবেদন
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তারের পর ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হবে। এ লক্ষ্যে দুদক, পুলিশ সদর দপ্তর, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ করছে।
সামনে কী হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে রেড নোটিশভুক্ত অনেক বাংলাদেশির তুলনায় বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। তবে তা নিশ্চিত নয়।
তিনি চাইলে দুবাইয়ের আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে প্রত্যর্পণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারেন। সেক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশে থাকা ৫৯ বাংলাদেশির মধ্যে অধিকাংশই এখনো অধরা থাকলেও বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন নজর থাকবে, তাকে শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা সম্ভব হয় কি না।

























