এস আলম ইস্যুতে মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর-সাইপ্রাসজুড়ে তদন্তের জাল
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৩৮:০০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদ, যিনি ‘এস আলম’ নামে পরিচিত, তাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তদন্ত ও আইনি চাপ ক্রমশ বাড়ছে। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তার বিরুদ্ধে ইউরোপের একটি দেশে সম্পত্তি জব্দ, বাংলাদেশের আদালতে কারাদণ্ড এবং সিঙ্গাপুরে চলমান তদন্ত—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
মালয়েশিয়ার শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক সংবাদমাধ্যম দ্য এজ-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলমের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য চট্টগ্রাম থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হলেও এর একটি বড় অংশ গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের ভিত্তিতে—এমন অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, কুয়ালালামপুরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি পাঁচতারা হোটেলকে ঘিরেও নজরদারি চলছে। এসব সম্পত্তির মালিকানা ও অর্থের উৎস যাচাইয়ে বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কাজ করছে বলে দাবি করা হয়েছে।
কুয়ালালামপুরের মোড়ে দাঁড়িয়ে দুই হোটেল, মালিকানার সুতো যায় সিঙ্গাপুরে
সাইফুল আলম মাসুদের আন্তর্জাতিক সম্পদভান্ডারের সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশগুলোর একটি অবস্থিত কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে জালান সুলতান ইসমাইল ও জালান আমপাং সড়কের সংযোগস্থলে। সেখানে রয়েছে রেনেসাঁ কুয়ালালামপুর হোটেল অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টার এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার। ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল সংস্থার কোম্পানি অনুসন্ধান তথ্য অনুযায়ী, ওয়াইআইএফ হোল্ডিং মালয়েশিয়া এসডিএন বিএইচডি কোম্পানিটির শতভাগ মালিকানা ধারণ করে। ওই কোম্পানির নথিতে দেখা যায়, ওং ওয়াই চিয়ং, পু সিন ইয়ে এবং আরিভালাগান চোকালিঙ্গাম নামের তিনজন পরিচালক। প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণভাবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ওয়াইআইএফ হোল্ডিং পিটিই লিমিটেডের মালিকানাধীন।
ওয়াইআইএফ হোল্ডিং পিটিই লিমিটেডের নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যক্রম হলো আর্থিক বহির্ভূত ও বীমা-সংশ্লিষ্ট খাতে পরিচালিত কোম্পানিগুলোর হোল্ডিং কোম্পানি হিসেবে কাজ করা। এর শেয়ারহোল্ডার হলো হিলড্রিকস এশিয়া গ্রোথ ফান্ড ভিসিসি। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে রয়েছেন চু কি সিয়ং, যিনি একই সঙ্গে হিলড্রিকস ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা।
শেয়ার বিক্রি, নিয়ন্ত্রকের জিজ্ঞাসাবাদ, জড়িত কোম্পানিগুলোতেও অস্থিরতা
হিলড্রিকস ক্যাপিটালের বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে রয়েছে মালয়েশিয়ার রাবার কম্পাউন্ড প্রস্তুতকারী ও পরিবেশক জিআইআইবি হোল্ডিংস বিএইচডি। কোম্পানির নথি অনুযায়ী, হিলড্রিকস এশিয়া গ্রোথ ফান্ড ১-এর পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এইচএজিএফ ইনভেস্টমেন্ট (আই) পিটিই লিমিটেড একসময় জিআইআইবির ১৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিল। পরে তারা কিছু শেয়ার বিক্রি করে এবং গত ২১ মে দাখিল করা নথি অনুযায়ী তারা উল্লেখযোগ্য শেয়ার হারিয়েছে।
জিআইআইবি বিভিন্ন কারণে আলোচনায় এসেছে। দুর্নীতি তদন্ত, করপোরেট ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ, আইনি বিরোধ এবং আর্থিক ক্ষতির ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির নাম উঠে এসেছে। সম্প্রতি কোম্পানিটির শেয়ারের দাম এক সকালেই ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে চার বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালে গত ৪ মে মালয়েশিয়ার পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বুরসা মালয়েশিয়া এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
ডুবন্ত চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানেও বিনিয়োগ, লক্ষ্য নতুন ঘাঁটি
অন্যদিকে চলতি বছরের মার্চে হিলড্রিকস এশিয়া গ্রোথ ফান্ড ভিসিসি সিঙ্গাপুরের বিনোদনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এমএম২ এশিয়া লিমিটেডের প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে এগিয়ে আসে। তারা এমএম২ এশিয়ার সঙ্গে একটি টার্ম শিটে স্বাক্ষর করে, যার আওতায় ১৫ মিলিয়ন সিঙ্গাপুরিয়ান ডলারের শেয়ার প্লেসমেন্ট এবং সর্বোচ্চ ১০ মিলিয়ন সিঙ্গাপুরিয়ান ডলারের পূর্ণ আন্ডাররাইটেড রাইটস ইস্যুর মাধ্যমে নতুন মূলধন সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়। চুক্তিটি এখনও চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এমএম২ এশিয়া কনটেন্ট ও গণমাধ্যম প্রযোজনা এবং বিতরণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিষ্ঠানটি মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে ক্যাথে সিনেপ্লেক্সেসের মালিক। তবে সিঙ্গাপুরের দেউলিয়াত্ব, পুনর্গঠন ও বিলুপ্তি আইনের আওতায় আদালত অনুমোদিত পুনর্গঠন কার্যক্রম চলাকালে প্রতিষ্ঠানটি সুরক্ষা আদেশের অধীনে পরিচালিত হচ্ছিল। গত সেপ্টেম্বর ক্যাথে উভয় দেশেই তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
রেনেসাঁ হোটেলটি ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল ২০২০ সালে বড় ধরনের সংস্কারের জন্য বন্ধ করে দেয়। পরে ২০২৩ সালের অক্টোবরে এটি আবার চালু হয়, মালয়েশিয়ায় ম্যারিয়টের প্রথম দ্বৈত-ব্র্যান্ডের সম্পত্তি হিসেবে। পশ্চিম অংশে রেনেসাঁ এবং পূর্ব অংশে নতুন ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন পরিচালিত হচ্ছে। ম্যারিয়টের সরকারি ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চ্যানেলগুলোতে এখনও উভয় হোটেলের মালিক হিসেবে ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের নাম উল্লেখ রয়েছে।
বর্তমান পর্যায়ে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ হোটেল দুটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে বা সম্পত্তিগুলোর ওপর কোনো জব্দাদেশ জারি হয়েছে, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ এবং জার্সি পর্যন্ত বিস্তৃত আন্তর্জাতিক তদন্তের পরিধি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ যখন বিভিন্ন দেশে সম্পদ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ চালাচ্ছে, তখন গ্রুপটির সঙ্গে সম্পর্কিত মালয়েশিয়ার সম্পদগুলোও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। মালয়েশিয়ার স্থানীয় সূত্রগুলো ‘দ্য এজ’কে জানিয়েছে, মোট ৯১৯টি কক্ষবিশিষ্ট এই দুটি হোটেল কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রির জন্য বাজারে তোলা হয়নি। তবে কয়েক বছর আগে উভয় সম্পদের জন্য সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন রিঙ্গিত (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৭ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা)। একাধিক রিয়েল এস্টেট এজেন্টের মতে, এই মূল্য অনেক বেশি এবং বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন ৮৫০ মিলিয়ন থেকে ৯৫০ মিলিয়ন রিঙ্গিতের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৫ হাজার ৭৬৪ কোটি থেকে ২৮ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা) মধ্যে হওয়া উচিত।
যে শহরে হোটেল, সেখানেই প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর
‘দ্য এজে’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় কূটনৈতিক দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী জয়ের পর গঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। জানা গেছে, বিদেশ সফরের প্রথম আমন্ত্রণ এসেছিল ভারত থেকে। এরপর মালয়েশিয়া এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের পক্ষ থেকেও আমন্ত্রণ আসে। গত সপ্তাহে ‘দ্য এজে’র নিশ্চিত হওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২১ ও ২২ জুন দুই দিনের সফরে তারেক রহমান কুয়ালালামপুরে যাবেন। সফরের দ্বিতীয় দিনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ হাইকমিশন গত ২৪ মে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সফরটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করে। একই সপ্তাহে গত ১৯ মে সাইপ্রাসে সাইফুল আলম মাসুদের সম্পত্তি জব্দ করা হয়। পরে মালয়েশিয়া ইতিবাচক সাড়া দেয় এবং গত ১ জুন প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ নিশ্চিত করেন। এখনও চূড়ান্ত না হওয়া সফরসূচিতে অভিবাসন, শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক আলোচনা থাকার কথা রয়েছে। বর্তমানে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন।
‘দ্য এজে’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনাপ্রবাহের এই দৈবসংযোগ সহজে উপেক্ষা করার নয়। বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে এমন একটি দেশকে বেছে নিয়েছেন, যেখানে এস আলম গ্রুপের সবচেয়ে দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক সম্পদ বলে বিবেচিত দুটি ম্যারিয়ট ব্র্যান্ডের হোটেল অবস্থিত। দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক অপরাধবিষয়ক সহযোগিতা আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে স্থান পাবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এক সপ্তাহে দুই দেশে দুই ধাক্কা: সাইপ্রাসে জব্দ, চট্টগ্রামে দণ্ড
গত ১৯ মে সাইপ্রাসের নিকোসিয়া জেলা আদালত সাইফুল আলম মাসুদ এবং তাঁর স্ত্রী ফারজানা পারভীনের মালিকানাধীন সাইপ্রাসের পারেক্লিসিয়া এলাকায় অবস্থিত দুইতলা একটি আবাসিক সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দেন। বাংলাদেশের গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনুরোধে পারস্পরিক আইনি সহায়তা প্রক্রিয়ার আওতায় সাইপ্রাসের অর্থপাচারবিরোধী ইউনিট মোকাসের আবেদনের পর আদালত এই আদেশ জারি করেন।
তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ থেকে ৮ বিলিয়ন ইউরোর (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা) বেশি অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর প্রকাশ্যে এই অঙ্কের কথা উল্লেখ করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সাইফুল আলম মাসুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছিল, যার অনেকগুলোই পরে খেলাপি হয়ে যায়। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, এসব ঋণের অর্থ সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ এবং জার্সিতে নিবন্ধিত বিভিন্ন কোম্পানি ও ট্রাস্টের জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিদেশে স্থানান্তর করা হয়েছিল কি না।
তদন্তের একটি অংশে এস আলমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাইপ্রাসে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান অ্যাক্লেয়ার ইন্টারন্যাশনালের বিষয়টিও রয়েছে। ২০১৬ সালে অ্যাক্লেয়ার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড অধিগ্রহণের মাধ্যমে তিনি প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেন। একই বছর তিনি সাইপ্রাসের ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ বা বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব কর্মসূচির আওতায় সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব অর্জন করেন। পরবর্তীতে সাইপ্রাস সরকার ওই কর্মসূচি বাতিল করে।
সাইপ্রাসের কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশের তদন্তকারীরা ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে সাইফুল আলম মাসুদ ও তাঁর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেন এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম পর্যালোচনা করছেন। আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠান কুইন ইমানুয়েল উরকহার্ট অ্যান্ড সুলিভানের নেতৃত্বাধীন আইনি টিমের মাধ্যমে সাইফুল আলম মাসুদ সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁর বিনিয়োগের অর্থ বৈধ বিদেশি উৎস থেকে এসেছে।
সাইপ্রাসে সম্পত্তি জব্দের আদেশের পরদিন বাংলাদেশেও তিনি আরেকটি আইনি ধাক্কার মুখে পড়েন। গত ২১ মে চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত-১-এর বিচারক মো. হেলাল উদ্দিন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে নেওয়া ৮৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকার ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় সাইফুল আলম মাসুদ এবং তাঁর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীসহ ১০ জনকে পাঁচ মাসের দেওয়ানি কারাদণ্ড দেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে তাঁর স্ত্রী, ছেলেরা এবং ভাইয়েরাও রয়েছেন। ওই ঋণটি এস আলম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওজি ট্রাভেলস লিমিটেডকে ১৩৪টি বাস কেনার উদ্দেশ্যে বিতরণ করা হয়েছিল বলে আদালতে উল্লেখ করা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে এস আলমকে দণ্ডিত করল। অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এস আলম গ্রুপ ব্যাপক আর্থিক প্রভাব ও ক্ষমতা অর্জন করেছিল। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে সাইফুল আলম মাসুদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ধারণা করা হয়, তাঁরা বর্তমানে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন।
হোটেল, ফ্ল্যাট, শেয়ার: সিঙ্গাপুরে ১ বিলিয়ন ডলারের অদৃশ্য সাম্রাজ্য
সাইফুল আলম মাসুদ ২০২৩ সালে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব লাভ করেন। সেই সিঙ্গাপুর এখন তাঁর বিদেশি সম্পদ সাম্রাজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের তদন্ত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া বিদেশে অর্থ স্থানান্তর ও বিনিয়োগ করে তিনি সিঙ্গাপুরে অন্তত ১ বিলিয়ন সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯৫ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা) মূল্যের একটি ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। এই সাম্রাজ্যের আওতায় হোটেল, আবাসিক সম্পত্তি, খুচরা বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং বিভিন্ন কোম্পানিতে শেয়ার অধিগ্রহণ করা হয়েছে।
আগের বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সাইফুল আলম মাসুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বড় অধিগ্রহণের তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩২৮ কক্ষবিশিষ্ট হোটেল গ্র্যান্ড চ্যান্সেলর, যা ১৭ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২১ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা) কেনা হয়েছিল। এছাড়া লিটল ইন্ডিয়ায় ১০ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা) মূল্যের খুচরা বাণিজ্যিক সম্পত্তি এবং ২০১৯ সালে ১২ কোটি ৫৬ লাখ মার্কিন ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৫ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা) আইবিস নভেনা হোটেল অধিগ্রহণের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
৪০টি ব্যাংক হিসাব, ৮ কোম্পানির শেয়ার: আদালতের জালে আটকে পরিবারও
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ঢাকার একটি আদালত সাইফুল আলম মাসুদের মালিকানাধীন ৪০টি ব্যাংক হিসাব, তাঁর স্ত্রীর ছয়টি হিসাব এবং সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত আটটি কোম্পানির শেয়ার জব্দের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি তাঁর দুই ছেলে আহসানুল আলম ও আশরাফুল আলম, মেয়ে মায়মুনা খানম এবং মেয়ের জামাই বেলাল আহমেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হয়। দম্পতির যৌথ মালিকানাধীন সিঙ্গাপুরের দুটি কোম্পানিতে প্রায় ৬৮ লাখ সিঙ্গাপুর ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা) বিনিয়োগও অবরুদ্ধ করা হয়।
সিঙ্গাপুরের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে চিঠি দিয়ে এস আলম গ্রুপের দেশীয় ও বিদেশি সম্পদের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। এটি ইঙ্গিত করছে যে সিঙ্গাপুরের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) অভিযোগ করেছে, সাইফুল আলম মাসুদ সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা) সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার বিদেশে পাচার করেছেন। এই অর্থ পাচারের একটি অংশ সিঙ্গাপুরভিত্তিক ‘কানালি লজিস্টিকস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠানটিকেই মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণের বাহন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।
তবে সাইফুল আলম মাসুদের সিঙ্গাপুরভিত্তিক আইনজীবী প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ং পার্টনারশিপ’ বাংলাদেশের আইনি কার্যক্রমকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বর্ণনা করেছে। তাদের দাবি, সম্পদ জব্দের পদক্ষেপগুলো ‘অবৈধ, খামখেয়ালি ও বৈষম্যমূলক’ উপায়ে নেওয়া হয়েছে এবং এর ফলে বৈধ ব্যবসায়িক কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।






















