এস আলমের সাইপ্রাস কানেকশন: টাকাপাচার তদন্তে নতুন মোড়
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৪৭:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬ ৩৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশে ব্যাংক জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই ইউরোপের দেশ সাইপ্রাসে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ ও তার স্ত্রী ফারজানা পারভীনের মালিকানাধীন একটি দোতলা বাড়ি জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির নিকোসিয়া জেলা আদালত। গত অন্তর্বর্তী সরকারের অনুরোধে নেওয়া এ পদক্ষেপকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বহুল আলোচিত ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ কর্মসূচির মাধ্যমে সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব পাওয়া এই ব্যবসায়ীর আন্তর্জাতিক সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক।
সাইফুল আলম মাসুদ ও তার পরিবারের সদস্যদের সম্প্রতি আরব আমিরাতের দুবাইয়ে দেখা গেছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সাইপ্রাসে সম্পত্তি জব্দ
সাইপ্রাসভিত্তিক গণমাধ্যম সাইপ্রাস মেইল, ফিলিনিউজ ও সাইপ্রাস ইনফর্মের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৯ মে সাইপ্রাসের অর্থপাচারবিরোধী সংস্থা মোকাসের আবেদনের পর নিকোসিয়া জেলা আদালত পারেক্কলিসিয়া এলাকায় অবস্থিত সাইফুল আলমের দোতলা বাড়িটি ক্রোক করার নির্দেশ দেন। বাংলাদেশে চলমান ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে পারস্পরিক আইনি সহায়তা প্রক্রিয়ার আওতায় এ আদেশ দেওয়া হয়।
চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত শিল্পগ্রুপ এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ ও তার পরিবারের সদস্যরা ২০১৬ সালে ‘সাইপ্রাস ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’ বা বহুল পরিচিত ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ কর্মসূচির মাধ্যমে সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব পান। পরে নানা বিতর্কের মুখে ২০২০ সালে কর্মসূচিটি বাতিল করা হয়। তবে এস আলম ও তার পরিবারের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
১৩৪ বাস কেনার নামে ঋণ ও কারাদণ্ড
সাইপ্রাসে সম্পত্তি জব্দের আদেশের একদিন পর গত ২১ মে চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত-১ এর বিচারক সাইফুল আলম মাসুদসহ তার ১০ জন স্বজন ও সহযোগীকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেন। আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের গ্রেপ্তারে সাজা পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে এস আলম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওজি ট্রাভেলস লিমিটেডের নামে ৮৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকার ঋণ নেওয়ার মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।২০২৪ সালের ১০ মার্চ থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত আট দফায় খাতুনগঞ্জ শাখার মাধ্যমে ঋণের ওই টাকা ছাড় করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত বাসগুলো আর কেনা হয়নি। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন সাইফুল আলম মাসুদ ছাড়াও তার স্ত্রী ফারজানা পারভীন ও ছেলে আহসানুল আলম, ভাই ওসমান গনি, রাশেদুল আলম, আব্দুস সামাদ লাবু, আব্দুল্লাহ হাসান, শহীদুল আলম ও অন্য সহযোগীরা।
৮০০ কোটি ইউরো পাচারের অভিযোগ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাইপ্রাসে পাঠানো নথিতে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে সাইফুল আলম ও তাঁর সহযোগীরা ব্যাংক জালিয়াতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে। এ তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগসহ একাধিক সংস্থা কাজ করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই সময়কার গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এর আগে প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, ৮০০ কোটি ইউরো বা ১ লাখ ১৩ হাজার ৯৫২ কোটি টাকারও বেশি অর্থ পাচারের ঘটনায় সাইফুল আলম মাসুদ ছিলেন মূল হোতা। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, অফশোর কোম্পানি ও জটিল আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে তিনি সম্পদ কিনেছেন, যাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় লেনদেনের সুস্পষ্ট চিহ্ন না থাকে।
বাংলাদেশ থেকে সাইপ্রাসে পাঠানো আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ভিন্ন নামে ও শেল কোম্পানির মাধ্যমে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে এসব ঋণের বড় অংশ খেলাপিতে পরিণত হয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে তারল্যসংকট তৈরি করে।
অফশোর কোম্পানি ও ট্রাস্টের নেটওয়ার্ক
তদন্তে অ্যাকলেয়ার ইন্টারন্যাশনাল নামের সাইপ্রাসে নিবন্ধিত একটি কোম্পানির বিষয়ও উঠে এসেছে। অ্যাকলেয়ার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড অধিগ্রহণের পর ২০১৬ সালে সাইফুল আলম কোম্পানিটির মালিকানা নেন। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, তদন্তাধীন অর্থ স্থানান্তরে কোম্পানিটি ব্যবহার করা হয়েছিল কি না। আদালতের নথিতে সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ ও জার্সিভিত্তিক একাধিক কোম্পানি ও ট্রাস্ট নেটওয়ার্কের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
তবে সাইফুল আলম মাসুদ সব অভিযোগ অস্বীকার করে কুইন ইমানুয়েল নামের একটি আইনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে দাবি করেছেন, তাঁর বিনিয়োগ বৈধ বিদেশি উৎস থেকে এসেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপগুলো অযৌক্তিক। সম্পদ জব্দের মতো পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির পরিপন্থী বলেও দাবি করেছেন তিনি।
ঢাকার আদালতের আগের আদেশ
এর আগে ২০২৫ সালের ২৪ জুন ঢাকার আদালত সাইপ্রাসে সাইফুল আলমের একটি দোতলা বাড়ি বাজেয়াপ্ত এবং সাইপ্রাস ও ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে তাঁর ও তাঁর স্ত্রী ফারজানা পারভীনের নামে নিবন্ধিত কোম্পানির শেয়ার জব্দের নির্দেশ দিয়েছিলেন। দুদকের তিনটি পৃথক আবেদন মঞ্জুর করে ঢাকা মহানগর সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন গালিব ওই আদেশ দেন। এক বছর সেই আদেশে সাড়া দিলেন সাইপ্রাসের আদালত।
বাংলাদেশের সেই আদেশে ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের ১৯টি কোম্পানিতে থাকা তাঁদের শেয়ার জব্দের নির্দেশও দেওয়া হয়। এর মধ্যে হাজেক ইন্টারন্যাশনাল পিটিই লিমিটেডে ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার মূল্যের ইক্যুইটি এবং পিকক প্রপার্টি হোল্ডিংসে অঘোষিত পরিমাণ ইক্যুইটি ছিল। পাশাপাশি জার্সি ট্রাস্ট কোম্পানির অধীন ছয়টি ট্রাস্টে থাকা বিভিন্ন বিনিয়োগও জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন
সাইফুল আলম মাসুদ সম্প্রতি বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন। বাংলাদেশে ফৌজদারি দায় এড়ানোর উদ্দেশ্যে তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মাসুদের সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্বও রয়েছে।






















