পরীক্ষা তিন মাস এগিয়ে, উদ্বেগে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৩:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
শিক্ষাবর্ষের শুরুতে পাঠ্যবই পেতে মার্চ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা, মাঝপথে কারিকুলাম পরিবর্তন, দীর্ঘ ছুটি ও শ্রেণি পাঠদানে ঘাটতির মধ্যেই আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা তিন মাস এগিয়ে আনার সরকারি সিদ্ধান্তে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে।
২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা আগামী ৭ জানুয়ারি এবং এইচএসসি পরীক্ষা ৬ জুন আয়োজনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণার পর থেকেই এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, পর্যাপ্ত শ্রেণি পাঠদান ও প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়ে পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনা কতটা যৌক্তিক।
রাজশাহীর ধোপাঘাটা আলহাজ কলিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আনভিয়া সুলতানা বলেন, এতদিন তারা মার্চ বা এপ্রিলকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হঠাৎ জানুয়ারিতে পরীক্ষা নির্ধারণ করায় সিলেবাস শেষ করা নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান ঊষা। তিনি বলেন, মার্চে বই পেয়েছেন, নিয়মিত ক্লাসও হয়নি। এখন কোচিং ও বাসায় পড়েই প্রস্তুতি এগিয়ে নিতে হচ্ছে।
শিক্ষক ও অভিভাবকদের অনেকেই বলছেন, শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত পাঠদান ছাড়া শুধু পরীক্ষার তারিখ এগিয়ে আনা শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
ঢাকার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রেজাউল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা বই হাতে পেয়েছে মার্চে। এরপর রোজার ছুটি, চলমান এসএসসি পরীক্ষা এবং ঈদের ছুটির কারণে বছরের বড় একটি সময় কার্যত নষ্ট হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
আরেক শিক্ষক মোহাম্মদ জুয়েল রানা মনে করেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষার্থীদের কোচিংনির্ভরতা আরও বাড়বে। তিনি বলেন, করোনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও একাধিক কারিকুলাম পরিবর্তনের ধাক্কা সামলে উঠতেই না উঠতেই পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের বিষয়টিও সামনে আনছেন শিক্ষকরা। তাদের মতে, পরিকল্পনাহীন পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থীরা শেখার চেয়ে কেবল পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে।
অভিভাবকদের মধ্যেও রয়েছে উদ্বেগ। ঢাকার নারিন্দার বাসিন্দা হারুন অর রশিদ বলেন, সেশনজট কমানো প্রয়োজন হলেও একসঙ্গে তিন মাস সময় কমিয়ে দেওয়া যৌক্তিক হয়নি।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, সেশনজট কমানো এবং শিক্ষাবর্ষকে সময়মতো ফিরিয়ে আনতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো ডিসেম্বর মাসে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজন করা।
মন্ত্রী বলেন, “ক্রমশ ব্যবধান কমিয়ে ডিসেম্বরকে পরীক্ষার আদর্শ সময় হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছি।”
তিনি আরও জানান, সেশনজটের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর উচ্চমাধ্যমিক শেষ করতে ২০ বছর বয়স হয়ে যাচ্ছে, যা দেশের জনমিতিক সুবিধার জন্য ক্ষতিকর।
তবে শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ বলছেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আরও ধীর ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল।
গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, যেসব শিক্ষার্থী এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়বে, তাদের বাস্তব পরিস্থিতি আরও গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।
তার মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্তে তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতামত আরও গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল। অন্যথায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে শঙ্কা বাড়বে এবং কোচিংনির্ভরতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশীদ পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের সময় বাঁচানো প্রয়োজন।
তবে তিনি মনে করেন, শিক্ষাব্যবস্থাকে কার্যকর করতে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পাঠদানের মান উন্নয়নের ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

























