ঢাকা ১০:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হামের থাবায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল, বাড়ছে শিশু মৃত্যু

চট্টগ্রাম ব্যুরো
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১১:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬ ১০০ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে হাম ও হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়া। গত দুই মাসে এসব রোগে ১৬০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। প্রতিদিন বাড়ছে রোগীর চাপ, সংকট দেখা দিয়েছে শয্যা, জনবল ও ওষুধে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ হতে স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ সময় লাগছে। অনেক শিশুকে ৬০ লিটার পর্যন্ত হাইফ্লো ন্যাজেল ক্যানোলা দিতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত চার মাসে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৮৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জানুয়ারিতে ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়ায় ৬৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৬০ জন, মার্চে হামের উপসর্গ ও নিউমোনিয়ায় ৭০ জন এবং এপ্রিলে ৯০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালে বিভিন্ন রোগে মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৮০ জনে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

রোববার ভোর পর্যন্ত শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল ১৯৯ জন রোগী। দুপুরের মধ্যে আরও প্রায় ৫০ জন ভর্তি হয়। হাসপাতাল সূত্র জানায়, দিন শেষে রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩০০-তে পৌঁছায়। বেড সংকট এতটাই প্রকট যে একটি বেডে তিনজন করে শিশু ও তাদের স্বজনদের থাকতে হচ্ছে।

৮ ও ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, হাম, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও ব্রেইন ইনফেকশনে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাই বেশি। আগে প্রতিদিন ৬০-৭০ জন রোগী ভর্তি হলেও এখন তা ১০০ ছাড়িয়েছে।

চিকিৎসাধীন শিশুদের অনেকেই অপুষ্টিতে ভুগছে। হামের পর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শ্বাসকষ্টে ভোগা শিশুদের সংখ্যাও বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, অপুষ্টি আক্রান্ত শিশুদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

নার্সরা বলছেন, সীমিত জনবল দিয়ে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। হাম ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত চিকিৎসকও পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে হাসপাতালের স্টোরে ওষুধ মজুদ থাকার দাবি করা হলেও রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। অনেক পরিবারকে প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। পিআইসিইউতে ভর্তি এক শিশুর স্বজন জানান, ছয় দিনে শুধু ওষুধ কিনতেই তাদের ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (স্টোর) ডা. মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হাম ও নিউমোনি পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ওষুধ সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা চলছে।

তবে হাসপাতালের স্টোর থেকে ওষুধ পাচারের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু কর্মচারী হাসপাতালের ওষুধ বাইরে বিক্রি করছে।

শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, প্রতিদিন স্রোতের মতো রোগী আসছে। সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় কাউকে ফেরানো যাচ্ছে না। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চিকিৎসক ও নার্সরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

পিআইসিইউর দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. ধীমান চৌধুরী জানান, ২০টি সিটের মধ্যে ১৫টিই হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের দীর্ঘদিন আইসিইউতে রাখতে হওয়ায় নতুন রোগীদের সিট দিতে সমস্যা হচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

হামের থাবায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল, বাড়ছে শিশু মৃত্যু

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১১:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে হাম ও হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়া। গত দুই মাসে এসব রোগে ১৬০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। প্রতিদিন বাড়ছে রোগীর চাপ, সংকট দেখা দিয়েছে শয্যা, জনবল ও ওষুধে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ হতে স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ সময় লাগছে। অনেক শিশুকে ৬০ লিটার পর্যন্ত হাইফ্লো ন্যাজেল ক্যানোলা দিতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত চার মাসে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৮৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জানুয়ারিতে ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়ায় ৬৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৬০ জন, মার্চে হামের উপসর্গ ও নিউমোনিয়ায় ৭০ জন এবং এপ্রিলে ৯০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালে বিভিন্ন রোগে মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৮০ জনে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

রোববার ভোর পর্যন্ত শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল ১৯৯ জন রোগী। দুপুরের মধ্যে আরও প্রায় ৫০ জন ভর্তি হয়। হাসপাতাল সূত্র জানায়, দিন শেষে রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩০০-তে পৌঁছায়। বেড সংকট এতটাই প্রকট যে একটি বেডে তিনজন করে শিশু ও তাদের স্বজনদের থাকতে হচ্ছে।

৮ ও ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, হাম, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও ব্রেইন ইনফেকশনে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাই বেশি। আগে প্রতিদিন ৬০-৭০ জন রোগী ভর্তি হলেও এখন তা ১০০ ছাড়িয়েছে।

চিকিৎসাধীন শিশুদের অনেকেই অপুষ্টিতে ভুগছে। হামের পর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শ্বাসকষ্টে ভোগা শিশুদের সংখ্যাও বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, অপুষ্টি আক্রান্ত শিশুদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

নার্সরা বলছেন, সীমিত জনবল দিয়ে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। হাম ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত চিকিৎসকও পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে হাসপাতালের স্টোরে ওষুধ মজুদ থাকার দাবি করা হলেও রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। অনেক পরিবারকে প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। পিআইসিইউতে ভর্তি এক শিশুর স্বজন জানান, ছয় দিনে শুধু ওষুধ কিনতেই তাদের ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (স্টোর) ডা. মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হাম ও নিউমোনি পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ওষুধ সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা চলছে।

তবে হাসপাতালের স্টোর থেকে ওষুধ পাচারের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু কর্মচারী হাসপাতালের ওষুধ বাইরে বিক্রি করছে।

শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, প্রতিদিন স্রোতের মতো রোগী আসছে। সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় কাউকে ফেরানো যাচ্ছে না। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চিকিৎসক ও নার্সরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

পিআইসিইউর দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. ধীমান চৌধুরী জানান, ২০টি সিটের মধ্যে ১৫টিই হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের দীর্ঘদিন আইসিইউতে রাখতে হওয়ায় নতুন রোগীদের সিট দিতে সমস্যা হচ্ছে।