জাপানের সঙ্গে ৬.৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা, দ্রুত আসছে প্রতিনিধি দল

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০২:৫২:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েনের বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। এ বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত বাংলাদেশে জাপানি প্রতিনিধি দল পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কান্তেইয়ে দুই নেতার দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন বৈঠকের এসব বিষয় জানান।
বৈঠকে তারেক রহমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও শিল্পায়নের লক্ষ্য অর্জনে জাপান সরকার এবং দেশটির বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। আর ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জ্বালানি ও অবকাঠামোয় জাপানি বিনিয়োগের আহ্বান
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তারেক রহমান। এ ক্ষেত্রে জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
এশিয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় সাম্প্রতিক ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানের বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে আধুনিক ও সমন্বিত যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। এ লক্ষ্যে দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক এবং দেশব্যাপী উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
এসব বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়ন, কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও অর্থায়নে জাপানের সহযোগিতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জাপানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব
প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন তারেক রহমান। এ উদ্যোগের মাধ্যমে জাপানের কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ মেধাবী, উদ্যোক্তা এবং প্রযুক্তি খাতের দক্ষ জনশক্তির সংযোগ স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রস্তাবিত টেক পার্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনের মতো খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
পাশাপাশি মহাকাশবিজ্ঞান, স্যাটেলাইট প্রকৌশল ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে জাপানের অগ্রসর সক্ষমতার সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নে তাঁর সরকার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, করনীতি, শুল্ক ছাড়করণ এবং অর্থ স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা ও দক্ষতা বাড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি দ্রুত কার্যকর করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি। চুক্তিটির সুফল দুই দেশের জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে উভয় পক্ষকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
সম্পর্ক জোরদারে যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব
দুই দেশের সহযোগিতার অগ্রাধিকারভিত্তিক খাত চিহ্নিত করা এবং গৃহীত উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে মন্ত্রীপর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তারেক রহমান।
বৈঠকের সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি এ শীর্ষ বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। এ অধ্যায় আরও গভীর আস্থা, বিস্তৃত অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শক্তিশালী বিনিয়োগ সম্পর্ক এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে।
দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
জাতিসংঘ ও ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আলোচনা
বৈঠকে জাতিসংঘ, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন দুই নেতা। বহুপাক্ষিকতা, আন্তর্জাতিক শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার বিষয়ে দুই দেশের অভিন্ন অঙ্গীকার তুলে ধরেন তারেক রহমান।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচনে জাপানের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
একটি অবাধ, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্ব্যক্ত করে আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাপানের সহযোগিতা কামনা
মিয়ানমারের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি এবং এর ফলে সৃষ্ট রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতি সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারেক রহমান। তিনি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ, নির্বিঘ্ন মানবিক সহায়তা নিশ্চিত এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের মানবিক প্রচেষ্টায় জাপানের সহযোগিতার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।
রাখাইনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে জাপানের সক্রিয় সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে দ্রুত নিজ দেশে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে।
ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রত্যয়
বৈঠকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাপানের দ্রুত স্বীকৃতি প্রদান এবং দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতার বিষয়টি স্মরণ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জাপানের বিশেষ স্থান রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা, শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুইবার জাপান সফর এবং তাঁর মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক জোরদারে অবদানের কথাও স্মরণ করেন। তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
বৈঠকের শেষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তারেক রহমান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও জাপানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও গভীর ও বিস্তৃত হবে।





















