৮০ কিলোমিটার সড়কজুড়ে হোটেল-রিসোর্ট, ঝুঁকিপূর্ণ সৈকতে নেই পর্যাপ্ত উদ্ধারব্যবস্থা
পর্যটন অবকাঠামো বাড়ছে, নিরাপত্তায় পিছিয়ে মেরিন ড্রাইভ

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:৩৮:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে
কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভ ঘিরে বাড়ছে পর্যটন অবকাঠামো। শহরের কোলাহল এড়িয়ে নিরিবিলি সৈকত ও রিসোর্টে ছুটছেন পর্যটকেরা। কিন্তু পর্যটনকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়লেও তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গড়ে উঠছে না সমানতালে। বিশেষ করে পেঁচারদ্বীপ, ইনানী ও হিমছড়ির মতো অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী সৈকতে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড, আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম এবং কার্যকর সতর্কতাব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এরই মধ্যে গত বুধবার (২১ অক্টোবর) পেঁচারদ্বীপ সমুদ্রসৈকতে ঢেউয়ের তোড়ে পাঁচ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও সামনে এনেছে পর্যটন অবকাঠামোর বিস্তারের সঙ্গে নিরাপত্তাব্যবস্থার অসামঞ্জস্য। এর আগে গত বছরের ৮ জুলাই একই সৈকতে ঢেউয়ের তোড়ে প্রাণ হারান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী সাবাব ও আসিফ। নিখোঁজ রয়েছেন অরিত্র হাসান।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে নতুন নতুন রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে উঠলেও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারকাজ পরিচালনার সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু সতর্কবার্তা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই; ঝুঁকিপূর্ণ সৈকতে প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড, উদ্ধার সরঞ্জাম ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। অথচ মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন পয়েন্টে এসব সুবিধা কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
নিরিবিলি সৈকতে গিয়ে বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকি
পেঁচারদ্বীপের সৈকতে গত বুধবার প্রাণ হারানো পাঁচ পর্যটক সৈকতসংলগ্ন একটি রিসোর্টে অবস্থান করছিলেন। নিরিবিলি পরিবেশের টানে সেখানে গেলেও সমুদ্রের ঢেউ ও স্রোতের ঝুঁকি সম্পর্কে তাঁদের পর্যাপ্ত ধারণা ছিল কি না, কিংবা বিপদের মুহূর্তে দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল—এমন প্রশ্ন উঠেছে ঘটনার পর।
একই রিসোর্টে অবস্থান করা পর্যটক সাইফ উদ্দিন বলেন, এ ধরনের ঘটনায় পর্যটকেরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ভ্রমণে মানুষ মানসিক প্রশান্তি ও স্বস্তি খোঁজেন। সেখানে যদি জীবনহানির আশঙ্কা থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে অনেকেই কক্সবাজারে আসতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
সমুদ্রে নামার আগে ঝুঁকি, সম্ভাব্য দুর্ঘটনার কারণ এবং নিরাপদ থাকার উপায় সম্পর্কে পর্যটকদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
সাইফ উদ্দিন জানান, ঘটনার দিন দুপুরে নিহত পর্যটকদের সঙ্গে একসঙ্গে খাবার খেয়েছিলেন তিনি। সাত বন্ধুর মধ্যে চারজন ফিরে এসেছেন, আর বাকি তিনজনের মরদেহ এসেছে। পরে বাকি চারজন কান্নাকাটি করতে করতে রিসোর্ট ছেড়ে চলে যান।
তাঁর ভাষায়, ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। একজনকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে আরও কয়েকজনের প্রাণহানির ঘটনা এড়াতে আগে থেকেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের দুর্ভোগও ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
পর্যটকদের সতর্ক করার দায়িত্ব কার?
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রিসোর্টমালিক, হোটেল কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পর্যটক সোহানুর রহমান।
তিনি বলেন, পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত রিসোর্টমালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরকারের বৈঠক করা উচিত। সমুদ্রে নামার বিধিনিষেধ, বিপদের লক্ষণ এবং নিরাপদ থাকার নিয়ম সম্পর্কে পর্যটকদের স্পষ্ট ধারণা দিতে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সোহানুর রহমানের মতে, পর্যটকেরা সাধারণত স্থানীয় নন। ফলে কোন সময়ে সমুদ্রে নামা নিরাপদ, কোথায় স্রোত বেশি এবং কখন পানিতে নামা থেকে বিরত থাকতে হবে—এসব বিষয়ে তাঁদের অনেকেরই পর্যাপ্ত ধারণা থাকে না। রিসোর্টে পৌঁছানোর পরই পর্যটকদের এসব তথ্য জানানো যেতে পারে। পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোকেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ সৈকতে সার্বক্ষণিক লাইফগার্ড রাখা সম্ভব না হলেও অন্তত একজন প্রশিক্ষিত কর্মীকে জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। তবে শুধু লোকবল নিয়োগ করলেই হবে না, উদ্ধারকাজের উপযোগী সরঞ্জাম ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
লাইফগার্ড ও উদ্ধার সরঞ্জামে ঘাটতি
হোটেল কক্স টুডের মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব শাহ বলেন, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তায় আধুনিক সরঞ্জাম ও উন্নত লাইফগার্ড ব্যবস্থাপনা রয়েছে। চাইলে কক্সবাজারেও এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
তাঁর মতে, এ জন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগ। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করলে পর্যটকদের নিরাপত্তায় আধুনিক উদ্ধারব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন নয়।
সী সেফ লাইফগার্ড সংস্থার প্রকল্প কর্মকর্তা মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বিভিন্ন পয়েন্টে গড়ে ওঠা ইকো রিসোর্টগুলোতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু নির্দেশনা দেওয়া যথেষ্ট নয়। রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে অন্তত একজন স্ট্যান্ডবাই লাইফগার্ড রাখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, পর্যটকেরা যেকোনো সময় সমুদ্রে নামতে পারেন। তাই দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য লাইফগার্ডের উপস্থিতি জরুরি। নিরাপত্তা নির্দেশনা বাস্তবায়নে কঠোরতা না থাকলে এ ধরনের প্রাণহানি অব্যাহত থাকতে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পর্যটন খাতেও।
ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, সী সেফ লাইফগার্ড সংস্থার কার্যক্রম মূলত লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী—এই তিনটি পয়েন্টে পরিচালিত হয়। এসব স্থানে পর্যটকদের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা হয়। তবে ইনানী ও হিমছড়িসহ অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রেও পানিতে ডুবে দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারে জেলা প্রশাসন, হোটেলমালিক ও ট্যুরিস্ট পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
পর্যটকদের কক্সবাজারে পৌঁছানোর আগেই সচেতন করার ওপরও জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও বিমানবন্দরে সমুদ্রে নামার আগে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ে প্রচার চালানো যেতে পারে। এতে পর্যটকেরা সৈকতে পৌঁছানোর আগেই নিরাপত্তাবিধি সম্পর্কে ধারণা পাবেন।
ফায়ার সার্ভিসের পরিকল্পনা, বাস্তবায়নের সময় অনিশ্চিত
মেরিন ড্রাইভে পর্যটকদের নিরাপত্তা জোরদার করতে স্থল ও ডুবুরি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এসব ইউনিট অগ্নিনির্বাপণের পাশাপাশি সমুদ্রে গোসলে নেমে ভেসে যাওয়া বা বিপদে পড়া পর্যটকদের উদ্ধারে কাজ করবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, মেরিন ড্রাইভে স্থল ও ডুবুরি—দুই ধরনের ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। অগ্নিনির্বাপণের পাশাপাশি সমুদ্রে বিপদে পড়া পর্যটকদের উদ্ধারের কাজও করবে এসব ইউনিট।
তবে পরিকল্পনাটি কবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাননি তিনি। ফলে মেরিন ড্রাইভের ঝুঁকিপূর্ণ সৈকতগুলোতে জরুরি উদ্ধারসেবা কবে নাগাদ কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
১২ বছরে ৮৫ পর্যটকের মৃত্যু
সী সেফ লাইফগার্ড সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গোসলে নেমে গত ১২ বছরে ৮৫ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ পর্যটককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। বিশেষ করে পর্যটন অবকাঠামো যখন শহরের বাইরে নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে, তখন সেসব স্থানে নিরাপত্তা ও উদ্ধারসেবার সক্ষমতাও সমান গুরুত্ব দিয়ে বাড়ানো প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ সৈকত চিহ্নিত করা, প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড নিয়োগ, আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এবং পর্যটকদের নিয়মিত সতর্ক করার উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন এবং সমন্বয়ও স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
পর্যটন অবকাঠামো বাড়লেই নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিত হয় না। সমুদ্রের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর প্রস্তুতি, দ্রুত উদ্ধারসেবা এবং আগাম সতর্কতার ব্যবস্থা না থাকলে মেরিন ড্রাইভের আকর্ষণীয় সৈকতগুলোতেই প্রাণহানির ঝুঁকি থেকে যাবে।





















