ক্লাসরুম থেকে আর ফেরা হলো না, ধসে পড়ল স্কুলভবন—ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে স্বপ্নগুলো

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৩:১৬:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে
পাকিস্তানের পেশোয়ারে ক্লাস চলাকালে স্কুলভবন ধসে প্রাণ হারিয়েছে ২৮ শিক্ষার্থী। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েছে আরও বহু শিশু। সন্তানদের খোঁজে স্কুলের সামনে উদ্বিগ্ন বাবা-মায়ের ভিড়, আর ভেতরে চলছে উদ্ধার অভিযান। মর্মান্তিক এই ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে স্কুলভবনের নিরাপত্তা ও নির্মাণমান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন।
সকালে অন্য দিনের মতোই স্কুলে এসেছিল শিশুরা। কারও হাতে বই, কারও চোখে নতুন কিছু শেখার স্বপ্ন। শ্রেণিকক্ষে চলছিল পাঠদান। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেই পরিচিত পরিবেশ পরিণত হলো মৃত্যুপুরীতে। হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল স্কুলভবন। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল ধুলা, ইট-পাথর আর ভাঙা কংক্রিট। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ল কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ারে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অন্তত ২৮ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহত শিশুদের বয়স ৬ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে। প্রাণ হারিয়েছেন একজন শিক্ষিকাও। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অন্তত ৪০ জন আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যে স্কুলে সন্তানদের নিরাপদে রেখে যাওয়ার কথা ছিল অভিভাবকদের, সেই স্কুলের সামনেই এখন তাঁদের উৎকণ্ঠিত অপেক্ষা। কেউ জানতে চাইছেন, তাঁর সন্তানকে উদ্ধার করা হয়েছে কি না। কেউ হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ছুটছেন। আবার কেউ ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছেন একটি আশার খবরের।
ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে স্বপ্নগুলো
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে স্কুলভবনটি ধসে পড়ে। খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উদ্ধারকাজ শুরু হওয়ার আগেই অনেকে নিজেরাই ভাঙা কংক্রিট ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে শিশুদের বের করে আনার চেষ্টা করেন।
পরে উদ্ধারকারীরাও ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান শুরু করেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে অন্তত ৪৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁদের অনেকেই আহত। আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতালগুলোকে সতর্ক রাখা হয়েছে।
তবে উদ্ধারকাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। কারণ, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অনেকের আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। উদ্ধারকারীরা তাঁদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। প্রতিটি মুহূর্ত যেন অপেক্ষমাণ পরিবারগুলোর কাছে দীর্ঘ হয়ে উঠছে।
সন্তানের কোনো খোঁজ না পেয়ে স্কুলের সামনে ভিড় করছেন অভিভাবকেরা। কারও অপেক্ষা সন্তানের জীবিত ফিরে আসার, কারও অপেক্ষা অন্তত একটি নিশ্চিত খবরের। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে উদ্ধার অভিযান চলতে থাকলেও সব শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে।
কেন ভেঙে পড়ল স্কুলভবন?
দুর্ঘটনার পর স্কুলটির নির্মাণমান ও ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রাথমিকভাবে ভবনটির গঠন দুর্বল ছিল বলে জানা গেছে। তবে ঠিক কী কারণে এটি ধসে পড়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ইতিমধ্যে ভবনটির মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। নির্মাণে কোনো অনিয়ম ছিল কি না, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না কিংবা ভবনটির নিরাপত্তা যাচাইয়ে কোনো ঘাটতি ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
পাকিস্তানে ভবন নির্মাণের মান ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। পেশোয়ারের এই দুর্ঘটনাও সেই উদ্বেগকে নতুন করে সামনে এনেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নির্মাণসংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট অনিয়মকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা যাচ্ছে না।
রাষ্ট্রের কাছে নিরাপদ স্কুলের প্রত্যাশা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিশুদের শেখার জায়গা, তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠার পরিসর। সেখানে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন থাকার কথা নয়। অথচ পেশোয়ারের এই দুর্ঘটনা সেই মৌলিক নিরাপত্তার প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে।
ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। আহতদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
এদিকে, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে খাইবার পাখতুনখোয়ার নতুন প্রশাসন স্কুলভবনগুলোর নিরাপত্তা পরীক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে। এর মাধ্যমে ভবনগুলোর কাঠামোগত অবস্থা যাচাই এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
প্রদেশটিতে কয়েক দিন আগেই রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হওয়ার প্রেক্ষাপটে দুর্ঘটনাটি নতুন প্রশাসনের সামনে নিরাপত্তা ও জনসেবার বিষয়েও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
শোকের পাশাপাশি জবাবদিহিও জরুরি
পেশোয়ারের স্কুলভবন ধসের ঘটনায় সবচেয়ে বড় ক্ষতি অপূরণীয়—যেসব শিশু আর বাড়ি ফিরবে না, তাদের পরিবার কোনো ক্ষতিপূরণেই প্রিয়জনকে ফিরে পাবে না। যেসব পরিবার এখনো সন্তানদের খোঁজে অপেক্ষা করছে, তাদের জন্য প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে গভীর উৎকণ্ঠায়।
এই পরিস্থিতিতে জরুরি হলো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো, আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো।
একই সঙ্গে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও দায় নির্ধারণও জরুরি। স্কুলভবনটি কেন ধসে পড়ল, নিরাপত্তা যাচাইয়ে কোনো ঘাটতি ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা প্রয়োজন—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার।
কারণ, একটি স্কুলভবন ধসে পড়া মানে শুধু একটি স্থাপনা ভেঙে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য শিশুর জীবন, পরিবারের স্বপ্ন এবং একটি সমাজের ভবিষ্যৎ। পেশোয়ারের এই মর্মান্তিক ঘটনা তাই মনে করিয়ে দিচ্ছে, শিশুদের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা কোনো বাড়তি সুবিধা নয়—এটি তাদের মৌলিক প্রয়োজন।



























