ট্রাম্পের জনসমর্থন, ইরান যুদ্ধ ও অভিবাসননীতি ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন: কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে কোন আসনগুলো গুরুত্বপূর্ণ?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৪৮:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছর কেমন যাবে, তার অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলের ওপর। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের এই দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে লড়ছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি। অন্যদিকে, দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে রয়েছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।
নির্বাচনে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে ট্রাম্পের আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণী উদ্যোগ বাধার মুখে পড়তে পারে। বিপরীতে, দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে মেয়াদের বাকি সময়ে নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে তুলনামূলক সুবিধা পাবেন তিনি।
তবে এই লড়াইয়ের ফল নির্ধারণ করবে কেবল জাতীয় জনমত নয়; গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্য ও নির্বাচনী এলাকার ভোটও হয়ে উঠতে পারে নিয়ামক।
প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার লড়াই
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতেই দুই বছর পরপর নির্বাচন হয়। ফলে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিটি আসনই নতুন করে নির্ধারিত হবে।
বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি। তাদের সঙ্গে ভোট দেন একজন স্বতন্ত্র সদস্য। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের আসন ২১৩টি। এই ব্যবধান এতটাই কম যে কয়েকটি আসনের ফল বদলালেই কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হতে পারে রিপাবলিকানদের।
তবে ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে সমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাত্র ১৮টি আসনকে অনিশ্চিত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১৪টি বর্তমানে রিপাবলিকানদের এবং চারটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে।
ডেমোক্র্যাটদের জন্য সুবিধা হলো, অনিশ্চিত আসনগুলোর বাইরে আরও কিছু আসন তাদের জয়ের সম্ভাবনা বা দলটির দিকে ঝুঁকে আছে বলে বিবেচিত। এসব আসনে প্রত্যাশিত ফল পেলে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবেও মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারানোর ঝুঁকিতে থাকে। ১৯৩৪ সাল থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ ধরনের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল গড়ে ২৭টি আসন হারিয়েছে। ২৩টি নির্বাচনের মধ্যে মাত্র তিনবার তারা আসন বাড়াতে পেরেছে।
সিনেটে লড়াই আরও কঠিন ডেমোক্র্যাটদের
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ক্ষেত্রে রিপাবলিকানরা তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ১০০ সদস্যের এই কক্ষে তাদের আসন ৫৩টি। এ ছাড়া দুজন স্বতন্ত্র সদস্য সাধারণত রিপাবলিকানদের সঙ্গে ভোট দেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের আসন ৪৫টি।
সিনেট সদস্যরা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন। প্রতি দুই বছর অন্তর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবারের নির্বাচনে ৩৫টি আসনে ভোট হবে। তবে কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের বিশ্লেষণে মাত্র সাতটি আসনকে অনিশ্চিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি রিপাবলিকান এবং একটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের জন্য লড়াইটি বেশ কঠিন। তাদের নিজেদের একটি আসন ধরে রাখার পাশাপাশি রিপাবলিকানদের দখলে থাকা কয়েকটি আসনও জয় করতে হবে। বিশেষ করে মিশিগানে নিজেদের আসন ধরে রাখা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আব্দুল এল-সায়েদ এবং রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। রজার্স ট্রাম্পের মিত্র এবং সাবেক এফবিআই কর্মকর্তা। এ ছাড়া ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প যে অঙ্গরাজ্যগুলোতে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন, সেসব জায়গায়ও সিনেটের আসন জয়ের চেষ্টা করছে ডেমোক্র্যাটরা। তালিকায় রয়েছে আলাস্কা, আইওয়া ও ওহাইও।
টেক্সাসেও ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। সেখানে প্রাক্তন শিক্ষক জেমস টালারিকো রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের মুখোমুখি হচ্ছেন। টালারিকো জয়ী হলে ১৯৮৮ সালের পর টেক্সাস থেকে প্রথম ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব
নির্বাচনে ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে জীবনযাত্রার ব্যয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আমেরিকানদের জীবনযাত্রাকে সাশ্রয়ী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু জ্বালানি, খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ তাঁর দলের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
২৪ ফেব্রুয়ারি স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে গ্যাসের দাম প্রতি গ্যালন ২ দশমিক ৩০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। তবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম বেড়ে প্রতি গ্যালন চার ডলারে পৌঁছায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর অর্থনৈতিক চাপও পড়েছে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর। আগস্টে পরিচালিত এক জরিপে ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা ইরান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্যসেবা ও অভিবাসননীতিও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ট্রাম্প প্রশাসন সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশের সংখ্যা কমানোর বিষয়টিকে নিজেদের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা স্বাস্থ্যবিমার উচ্চ ব্যয় এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির প্রভাবকে প্রচারের কেন্দ্রে রাখছেন।
জনসমর্থনে পিছিয়ে ট্রাম্প
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের ভালো-মন্দ ফলের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের জনসমর্থন গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। জনমত জরিপবিষয়ক ওয়েবসাইট সিলভার বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে ট্রাম্পের জনসমর্থন ছিল ৫০ শতাংশের কিছু বেশি। পরে তা কমে ৪০ শতাংশের ঘরে নেমে আসে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক অভিযানে যুক্ত হওয়ার সময় তাঁর জনসমর্থন ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ। এর পর তা আরও কমে যায়। বর্তমানে এই হার প্রায় ৩৭ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের একই সময়ে তাঁর জনসমর্থন ছিল ৪৩ শতাংশ। জো বাইডেনের মেয়াদের একই পর্যায়ে তা ছিল ৪০ শতাংশ। ওই দুই মেয়াদেই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, যদিও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরেছিল।
এই পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষেই জয়ের সম্ভাবনা দেখছে। তবে জনমত জরিপ সব সময় নির্বাচনের ফল নির্ভুলভাবে অনুমান করতে পারে না। অতীতেও ট্রাম্প ও তাঁর দল জরিপের পূর্বাভাস ছাড়িয়ে নির্বাচনে ভালো ফল করেছে।
প্রচারে অর্থের প্রভাব
নির্বাচনী প্রচারে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও রিপাবলিকানরা এগিয়ে রয়েছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর হাতে নগদ অর্থ ছিল প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের হাতে ছিল ২৩০ মিলিয়ন ডলারের কিছু কম।
এর বাইরে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ আন্দোলনের তহবিল সংগ্রহ ও ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলোর কাছেও ১৬০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ ছিল।
এই অর্থ নির্বাচনী বিজ্ঞাপন ও প্রচার কার্যক্রমে ব্যবহার করছে রিপাবলিকানরা। গবেষণা সংস্থা অ্যাডইমপ্যাক্টের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মার্কিন ভোটারদের লক্ষ্য করে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। এতে রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় ২০০ মিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় করেছে। বিশেষ করে অনিশ্চিত সিনেট আসনগুলোতে তাদের বিজ্ঞাপন ব্যয় ছিল বেশি।
শেষ মুহূর্তের এই প্রচার ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে এবং রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করছে ট্রাম্পের দল।
ফলের পর নজর ২০২৮ সালের নির্বাচনে
সব মিলিয়ে জনসমর্থন, জীবনযাত্রার ব্যয়, ইরান যুদ্ধ এবং স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অসন্তোষ ডেমোক্র্যাটদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। তবে রিপাবলিকানদের সাংগঠনিক শক্তি, নির্বাচনী তহবিল ও প্রচার ব্যয় ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছর আইন প্রণয়ন ও নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়তে পারে তাঁর প্রশাসন। আর রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্পের জন্য তা হবে রাজনৈতিক স্বস্তি।
নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে পরবর্তী বড় আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কারণে ট্রাম্প তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। ফলে তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন এবং ডেমোক্র্যাটরা কোন নীতি ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মাঠে নামবে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হবে।






















