ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী কমাতে কঠোর হচ্ছে ইসি, পাঁচ গুণ বাড়ছে জামানত

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০২:৫৯:৫১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে বিধিমালায় একাধিক কঠোরতা আনছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে চেয়ারম্যান প্রার্থীদের জামানত পাঁচ গুণ বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য প্রার্থীদের জামানত ৫ হাজার টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দ্বিগুণ করা হচ্ছে নির্বাচনি ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা।
নির্বাচনি অপরাধের শাস্তি বাড়ানোর পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে নির্বাচন বাতিল বা বন্ধ করার ক্ষমতাও ইসির হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হচ্ছে না।
চূড়ান্ত সংশোধনী, গেজেট প্রকাশের অপেক্ষা
২০১৬ সালের স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালায় সংশোধন এনে নতুন বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে এটি ইসিতে ফেরত এসেছে। আগামী সপ্তাহে এসআরও নম্বর দেওয়ার জন্য সংশোধিত বিধিমালা আবার আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে।
এদিকে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদ নির্বাচনের বিধিমালাতেও সংশোধন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব বিধিমালা ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
জামানত ও নির্বাচনি ব্যয় বাড়ছে
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, ইউপি চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীদের জামানত ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে। সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে জামানত ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন নিয়মে মোট প্রদত্ত ভোটের অন্তত ১৫ শতাংশ না পেলে প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। বর্তমানে প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ বা ১২ দশমিক ৫ শতাংশের কম ভোট পেলে জামানত বাজেয়াপ্তের বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে চেয়ারম্যান প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা ৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রার্থী কমানোর লক্ষ্য
ইসি সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় ও প্রতীকবিহীন পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হওয়ায় ইউপিসহ অন্যান্য নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। এতে ব্যালটে বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর নাম যুক্ত করা, ভোটকেন্দ্র পরিচালনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রার্থীদের এজেন্ট, কর্মী ও সমর্থকদের উপস্থিতির কারণে নির্বাচন পরিচালনার ব্যয়ও বাড়তে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থী সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন বিধিনিষেধ যুক্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কমিশন।
যোগ্য প্রার্থীদের অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ
নির্বাচনসংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, জামানত পাঁচ গুণ বাড়ানো এবং জামানত রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ভোটের হার বাড়ানোর ফলে প্রার্থী সংখ্যা কমতে পারে। তবে আর্থিকভাবে তুলনামূলক দুর্বল হলেও যোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের অনেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত হতে পারেন—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আবদুল আলীম বলেন, জামানত বাড়ানো হলে প্রার্থী সংখ্যা কমতে পারে এবং নির্বাচন পরিচালনার ব্যয় ও ব্যবস্থাপনা সহজ হতে পারে। তবে এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। বেশি জামানতের কারণে যোগ্য ও জনপ্রিয় অনেকের নির্বাচনে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।
তাঁর মতে, বর্তমানে কিছু প্রার্থী মূল প্রার্থীর পক্ষে ‘ডামি’ প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ান। পরে তাঁদের নামে অতিরিক্ত এজেন্ট নিয়োগ করে ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করা হয়। জামানতের পরিমাণ বাড়লে এ ধরনের প্রবণতা কমতে পারে।
নির্বাচনি ব্যয়সীমা বাড়ানোর উদ্যোগকে সমর্থন করলেও নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে তদারকির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
যোগ্য প্রার্থী কমার আশঙ্কা নাকচ
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জামানত বাড়ানোর কারণে যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা নাকচ করেছেন।
তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। তাই ২৫ হাজার টাকা জামানত একজন প্রার্থীর জন্য অতিরিক্ত হওয়ার কথা নয়। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানত আগে থেকেই ২৫ হাজার টাকা নির্ধারিত রয়েছে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই ইউপি নির্বাচনে জামানত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্বাচনি ব্যয়সীমাও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ইউপি নির্বাচন বিধিমালার সংশোধনী ভেটিং শেষে ইসিতে এসেছে। স্থানীয় সরকারের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বিধিমালাও দ্রুত ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
নির্বাচনি অপরাধে বাড়ছে শাস্তি
সংশোধিত বিধিমালায় নির্বাচনি হলফনামায় প্রার্থীদের আরও কিছু তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হচ্ছে। হলফনামায় মিথ্যা বা অসত্য তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কোনো পদে মাত্র একজন প্রার্থী থাকলে তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণার বর্তমান বিধান বহাল থাকছে।
এ ছাড়া নির্বাচনের দায়িত্ব পালনরত কোনো ব্যক্তিকে হুমকি, ভয় দেখানো বা আঘাত করা এবং ভোটারকে ভোটদানে বাধা দেওয়ার ঘটনায় সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় রিটার্নিং কর্মকর্তা বা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে জরিমানা করার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছে। নির্বাচনি অপরাধে সর্বনিম্ন ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে।
ভোট বাতিলের ক্ষমতা ইসির হাতে
প্রস্তাবিত বিধিমালায় নির্বাচনে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে ভোট বাতিল বা বন্ধ করার ক্ষমতা ইসির হাতে রাখার কথা বলা হয়েছে।
পাশাপাশি কোনো প্রার্থীর এজেন্ট না থাকলেও সংশ্লিষ্ট নির্বাচন বৈধ হিসেবে গণ্য হবে—এমন বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। নির্বাচনে ব্যবহৃত প্রতীকে পরিবর্তন আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
নতুন বিধিমালার মাধ্যমে একদিকে প্রার্থী সংখ্যা ও নির্বাচনি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে নির্বাচনি অনিয়ম মোকাবিলা ও আচরণবিধি বাস্তবায়নে কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।























