ঢাকা ০৬:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
‘শেখ হাসিনা কালই আসুন, হাতকড়া দিয়ে রিসিভ করব’ ‘পরির মতো মেয়েটা কথা বলতে বলতেই চলে গেল’ দেব-শুভশ্রীর প্রত্যাবর্তনেই কি পরিচালনায় দেব? নিজেই জানালেন নেপথ্যের গল্প চাঁদ ঘিরে শুরু হবে পরবর্তী যুদ্ধ? মহাকাশে মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি সান্তাহারে ভুয়া লাইসেন্স প্লেটে টোল আদায়, পৌর কর্মচারীসহ গ্রেপ্তার ২ ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে নারীসহ সাবেক ওসি আটক, একাধিক বিয়ের অভিযোগ থিম্পু যাওয়ার পথে ঢাকায় ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং টোবগে ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী কমাতে কঠোর হচ্ছে ইসি, পাঁচ গুণ বাড়ছে জামানত ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে নতুন উদ্যোগ, নভেম্বরে তারেক রহমানের দিল্লি সফরের প্রস্তুতি জামায়াতের লংমার্চ আওয়ামী লীগকে মাঠে ফেরার সুযোগ দিচ্ছে: রাশেদ খান

‘পরির মতো মেয়েটা কথা বলতে বলতেই চলে গেল’

চট্টগ্রাম ব্যুরো
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:৩৮:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তখন তার সঙ্গে জন্ম নেয় অসংখ্য স্বপ্ন। বাবা-মায়ের স্বপ্ন, পরিবারের স্বপ্ন, কখনো পুরো একটি ঘরের হাসির স্বপ্ন। তার ছোট্ট পায়ে ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ, তার কথায় জমে ওঠে দিন, তার আবদারে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন বাবা-মা।

সিরাজুম মুনিরাও তেমনই একটি শিশু ছিল। পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ে। সেজেগুজে থাকতে ভালোবাসত, বেড়াতে যেতে চাইত, বাবাকে দুপুরে ফোন করে বাড়িতে ভাত খেতে আসতে বলত। তার পৃথিবীটা ছিল ছোট, কিন্তু সেই ছোট পৃথিবীজুড়ে ছিল ভালোবাসার অফুরন্ত বিস্তার।

আজ সেই ঘরে তার কণ্ঠ নেই।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের আমিরাবাদে মুনিরার বাড়িতে এখন স্বজনদের ভিড়। কিন্তু যে শিশুটিকে ঘিরে এত আয়োজন, সে নেই। খাটের ওপর পড়ে থাকা হলুদ স্কুলব্যাগ, হাতের লেখা, আঁকা ছবি—সব আছে। নেই শুধু সেই ছোট্ট মানুষটি, যে এসবের ভেতর প্রাণ এনে দিত।

মা হাসান বানুর কান্না থামছে না। তিনি বলছেন, ‘আমার এমন পরির মতো মেয়েটা কথা বলতে বলতেই মারা গেল। এই কষ্ট ভুলে আমি কীভাবে বাঁচব।’

একজন মায়ের এই প্রশ্নের উত্তর কি আমাদের জানা আছে?

সন্তান হারানোর শোক কোনো ভাষায় মাপা যায় না। বিশেষ করে যখন সন্তানটি মাত্র পাঁচ বছরের, যখন তার সামনে পড়ে থাকে স্কুলজীবনের দীর্ঘ পথ, যখন তার হাতে থাকার কথা ছিল পেন্সিল, খাতায় আঁকার কথা ছিল রঙিন ছবি, আর সন্ধ্যায় মায়ের কাছে আবদার করার কথা ছিল নতুন জামার।

সেই শিশুটিই ডেঙ্গুর কাছে হার মানল।

মুনিরার অসুস্থতার বিবরণ আমাদের আরও একবার সতর্ক করে। জ্বরের পর পরীক্ষা, পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া, চিকিৎসকের কাছে যাওয়া—এই পুরো প্রক্রিয়ায় সময়ের গুরুত্ব কতটা, তা নতুন করে সামনে আসে। পরিবারটি চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু শিশুটির অবস্থার অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত আইসিইউতে তার মৃত্যু হয়।

এখানে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার আগে চিকিৎসা-সংক্রান্ত সব তথ্য, সময়ক্রম এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। তবে এই মৃত্যু আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—একটি শিশুর অবস্থা দ্রুত খারাপ হলে পরিবার কতটা দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাবে?

ডেঙ্গু এখন শুধু একটি মৌসুমি অসুখের নাম নয়। এটি বহু পরিবারের জন্য আতঙ্কের কারণ। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বরকে অবহেলা না করা, বিপদের লক্ষণগুলো চেনা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু জনস্বাস্থ্য শুধু পরিবারের সচেতনতার ওপর নির্ভর করতে পারে না। প্রয়োজন কার্যকর রোগ প্রতিরোধ, মশা নিয়ন্ত্রণ, সহজলভ্য চিকিৎসা এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। একটি শিশুর পরিবার যেন অসুস্থতার প্রতিটি ধাপে একা লড়াই করতে বাধ্য না হয়, সেটিও রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।

মুনিরার নানি তাঁর হাতের লেখা ও আঁকা ছবি দেখাচ্ছেন। মা দেখাচ্ছেন দুই মেয়ের কক্সবাজার ভ্রমণের ছবি। ছবিগুলো এখন শুধু স্মৃতি নয়; এগুলো একটি পরিবারের হারিয়ে যাওয়া আনন্দের সাক্ষ্য।

বাবা নুরুন্নবী বলছেন, ‘এখন আর কেউ ফোন দেবে না।’

এই একটি বাক্যের ভেতরে কত বড় শূন্যতা লুকিয়ে আছে, তা হয়তো শুধু একজন বাবা বুঝতে পারেন। দুপুরে ফোন করে যে মেয়েটি বাবাকে বাড়িতে আসতে বলত, সেই ফোন আর আসবে না। নতুন জামার আবদার আর শোনা যাবে না। ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা আর হবে না।

একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের কত ছোট ছোট মুহূর্ত যে একটি শিশুর উপস্থিতিতে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাকে হারানোর পরই তা স্পষ্ট হয়ে যায়।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন, মুনিরা যে শ্রেণিতে পড়ত, তাঁর মেয়েও একই শ্রেণিতে পড়ে। নিজের মেয়ের সহপাঠীর মৃত্যুসংবাদ শুনে তাঁরও নিজেকে ধরে রাখতে কষ্ট হয়েছে।

এই অনুভূতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশুরা শুধু পরিবারের নয়; তারা আমাদের সামগ্রিক সমাজেরও অংশ। তাদের নিরাপত্তা, সুস্থতা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার।

মুনিরার মৃত্যুতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। শোকাহত মা-বাবা ও স্বজনদের প্রতি সহমর্মিতা জানানো। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো নিয়ে দায়িত্বশীলভাবে প্রশ্ন তোলা।

কোনো শিশুর স্কুলব্যাগ যেন এভাবে অকালেই স্মৃতির বাক্সে পরিণত না হয়। কোনো মায়ের হাতে সন্তানের আঁকা ছবি তুলে দিয়ে বলতে না হয়—‘আমার মেয়েটা আর নেই।’

মুনিরা ফিরে আসবে না। কিন্তু তার চলে যাওয়া যেন আমাদের আরও সতর্ক করে, আরও মানবিক করে। যেন প্রতিটি শিশুর জ্বরকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়, প্রতিটি পরিবারের উদ্বেগকে সম্মান করা হয় এবং প্রতিটি শিশুর বেঁচে থাকার অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

‘পরির মতো মেয়েটা কথা বলতে বলতেই চলে গেল’

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:৩৮:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তখন তার সঙ্গে জন্ম নেয় অসংখ্য স্বপ্ন। বাবা-মায়ের স্বপ্ন, পরিবারের স্বপ্ন, কখনো পুরো একটি ঘরের হাসির স্বপ্ন। তার ছোট্ট পায়ে ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ, তার কথায় জমে ওঠে দিন, তার আবদারে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন বাবা-মা।

সিরাজুম মুনিরাও তেমনই একটি শিশু ছিল। পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ে। সেজেগুজে থাকতে ভালোবাসত, বেড়াতে যেতে চাইত, বাবাকে দুপুরে ফোন করে বাড়িতে ভাত খেতে আসতে বলত। তার পৃথিবীটা ছিল ছোট, কিন্তু সেই ছোট পৃথিবীজুড়ে ছিল ভালোবাসার অফুরন্ত বিস্তার।

আজ সেই ঘরে তার কণ্ঠ নেই।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের আমিরাবাদে মুনিরার বাড়িতে এখন স্বজনদের ভিড়। কিন্তু যে শিশুটিকে ঘিরে এত আয়োজন, সে নেই। খাটের ওপর পড়ে থাকা হলুদ স্কুলব্যাগ, হাতের লেখা, আঁকা ছবি—সব আছে। নেই শুধু সেই ছোট্ট মানুষটি, যে এসবের ভেতর প্রাণ এনে দিত।

মা হাসান বানুর কান্না থামছে না। তিনি বলছেন, ‘আমার এমন পরির মতো মেয়েটা কথা বলতে বলতেই মারা গেল। এই কষ্ট ভুলে আমি কীভাবে বাঁচব।’

একজন মায়ের এই প্রশ্নের উত্তর কি আমাদের জানা আছে?

সন্তান হারানোর শোক কোনো ভাষায় মাপা যায় না। বিশেষ করে যখন সন্তানটি মাত্র পাঁচ বছরের, যখন তার সামনে পড়ে থাকে স্কুলজীবনের দীর্ঘ পথ, যখন তার হাতে থাকার কথা ছিল পেন্সিল, খাতায় আঁকার কথা ছিল রঙিন ছবি, আর সন্ধ্যায় মায়ের কাছে আবদার করার কথা ছিল নতুন জামার।

সেই শিশুটিই ডেঙ্গুর কাছে হার মানল।

মুনিরার অসুস্থতার বিবরণ আমাদের আরও একবার সতর্ক করে। জ্বরের পর পরীক্ষা, পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া, চিকিৎসকের কাছে যাওয়া—এই পুরো প্রক্রিয়ায় সময়ের গুরুত্ব কতটা, তা নতুন করে সামনে আসে। পরিবারটি চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু শিশুটির অবস্থার অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত আইসিইউতে তার মৃত্যু হয়।

এখানে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার আগে চিকিৎসা-সংক্রান্ত সব তথ্য, সময়ক্রম এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। তবে এই মৃত্যু আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—একটি শিশুর অবস্থা দ্রুত খারাপ হলে পরিবার কতটা দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাবে?

ডেঙ্গু এখন শুধু একটি মৌসুমি অসুখের নাম নয়। এটি বহু পরিবারের জন্য আতঙ্কের কারণ। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বরকে অবহেলা না করা, বিপদের লক্ষণগুলো চেনা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু জনস্বাস্থ্য শুধু পরিবারের সচেতনতার ওপর নির্ভর করতে পারে না। প্রয়োজন কার্যকর রোগ প্রতিরোধ, মশা নিয়ন্ত্রণ, সহজলভ্য চিকিৎসা এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। একটি শিশুর পরিবার যেন অসুস্থতার প্রতিটি ধাপে একা লড়াই করতে বাধ্য না হয়, সেটিও রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।

মুনিরার নানি তাঁর হাতের লেখা ও আঁকা ছবি দেখাচ্ছেন। মা দেখাচ্ছেন দুই মেয়ের কক্সবাজার ভ্রমণের ছবি। ছবিগুলো এখন শুধু স্মৃতি নয়; এগুলো একটি পরিবারের হারিয়ে যাওয়া আনন্দের সাক্ষ্য।

বাবা নুরুন্নবী বলছেন, ‘এখন আর কেউ ফোন দেবে না।’

এই একটি বাক্যের ভেতরে কত বড় শূন্যতা লুকিয়ে আছে, তা হয়তো শুধু একজন বাবা বুঝতে পারেন। দুপুরে ফোন করে যে মেয়েটি বাবাকে বাড়িতে আসতে বলত, সেই ফোন আর আসবে না। নতুন জামার আবদার আর শোনা যাবে না। ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা আর হবে না।

একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের কত ছোট ছোট মুহূর্ত যে একটি শিশুর উপস্থিতিতে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাকে হারানোর পরই তা স্পষ্ট হয়ে যায়।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন, মুনিরা যে শ্রেণিতে পড়ত, তাঁর মেয়েও একই শ্রেণিতে পড়ে। নিজের মেয়ের সহপাঠীর মৃত্যুসংবাদ শুনে তাঁরও নিজেকে ধরে রাখতে কষ্ট হয়েছে।

এই অনুভূতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশুরা শুধু পরিবারের নয়; তারা আমাদের সামগ্রিক সমাজেরও অংশ। তাদের নিরাপত্তা, সুস্থতা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার।

মুনিরার মৃত্যুতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। শোকাহত মা-বাবা ও স্বজনদের প্রতি সহমর্মিতা জানানো। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো নিয়ে দায়িত্বশীলভাবে প্রশ্ন তোলা।

কোনো শিশুর স্কুলব্যাগ যেন এভাবে অকালেই স্মৃতির বাক্সে পরিণত না হয়। কোনো মায়ের হাতে সন্তানের আঁকা ছবি তুলে দিয়ে বলতে না হয়—‘আমার মেয়েটা আর নেই।’

মুনিরা ফিরে আসবে না। কিন্তু তার চলে যাওয়া যেন আমাদের আরও সতর্ক করে, আরও মানবিক করে। যেন প্রতিটি শিশুর জ্বরকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়, প্রতিটি পরিবারের উদ্বেগকে সম্মান করা হয় এবং প্রতিটি শিশুর বেঁচে থাকার অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।