চাঁদ ঘিরে শুরু হবে পরবর্তী যুদ্ধ? মহাকাশে মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:২৫:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো। সমুদ্রের গভীর তলদেশ থেকে চাঁদের কক্ষপথ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্র—এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ঘোষণার পর মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং ভারতের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
চাঁদের কক্ষপথেও যুদ্ধের প্রস্তুতি
ওয়াশিংটনে আয়োজিত অ্যারোস্পেস, স্পেস অ্যান্ড সাইবার কনফারেন্সে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র এখন আর শুধু পৃথিবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সমুদ্রের গভীর তলদেশ থেকে চাঁদের কক্ষপথ পর্যন্ত সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যবর্তী মহাকাশ অঞ্চলকে বলা হয় ‘সিসলুনার স্পেস’। ভবিষ্যতে এই বিস্তৃত এলাকাও সামরিক প্রতিযোগিতা ও সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা, সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া এখন তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন-রাশিয়ার প্রতিযোগিতা
মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চীন ও রাশিয়া চ্যালেঞ্জ করছে বলে মনে করছেন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা। সম্ভাব্য প্রতিপক্ষরা ভবিষ্যতের যুদ্ধে মহাকাশকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই ওয়াশিংটন সামরিক প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে।
মার্কিন মহাকাশ বাহিনীর কমব্যাট ফোর্সেস কমান্ডের প্রধান জেনারেল গ্রেগরি গ্যাগনন জানিয়েছেন, পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির জন্য সামরিক বাহিনী প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। তাঁর মতে, মানবসভ্যতা পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে মহাকাশের আরও গভীরে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় মহাকাশ বাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
মহাকাশ বাহিনী গঠন ট্রাম্পের আমলে
মহাকাশে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালে ‘স্পেস ফোর্স’ গঠন করে। এটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বশেষ ও কনিষ্ঠতম শাখা।
এই বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে—
সামরিক উপগ্রহ ও মহাকাশ ব্যবস্থার সুরক্ষা;
মহাকাশে সামরিক অভিযান পরিচালনা;
উপগ্রহের ওপর নজরদারি;
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহাকাশ কার্যক্রম বজায় রাখা।
প্রথম দফায় ক্ষমতায় থাকার সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই মহাকাশকে সামরিক কার্যক্রমের পৃথক ক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে কেন আগ্রহ?
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয় দেশই চাঁদে নিজেদের মহাকাশ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করছে। বিশেষ করে চাঁদের দক্ষিণ মেরু নিয়ে তাদের আগ্রহ বেশি।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, দক্ষিণ মেরুর এমন কিছু এলাকায় জলীয় বরফ থাকতে পারে, যেখানে সূর্যের আলো প্রায় পৌঁছায় না। ভবিষ্যতে এই বরফ থেকে পানীয় জল, অক্সিজেন এবং রকেটের জ্বালানি তৈরির উপকরণ সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে।
এই কারণে চাঁদের দক্ষিণ মেরু বৈজ্ঞানিক গবেষণার পাশাপাশি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক চুক্তি ঘিরে উদ্বেগ
মহাকাশে সামরিক কার্যক্রম বাড়ানোর ঘোষণায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ১৯৬৭ সালের ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ অনুযায়ী, চাঁদ ও অন্যান্য মহাকাশীয় বস্তু শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মহাকাশে গণবিধ্বংসী অস্ত্র স্থাপনের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
তবে মহাকাশে সামরিক উপগ্রহ, নজরদারি ব্যবস্থা বা প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও ব্যাখ্যার প্রশ্ন রয়েছে। ফলে চাঁদে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন কিংবা মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এ ছাড়া মহাকাশে সংঘর্ষ হলে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ তৈরি হতে পারে। এসব ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীর কক্ষপথে ছড়িয়ে পড়লে উপগ্রহ, মহাকাশযান এবং ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
চীনের প্রতিক্রিয়া
চীন ২০২৪ সালে নিজেদের সামরিক মহাকাশ বাহিনী গঠন করে। তবে মহাকাশকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার বা অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে—এমন অভিযোগ বেইজিং অস্বীকার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ঘোষণার পর চীন মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমরা চাই আমেরিকা তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং মহাকাশযুদ্ধের প্রস্তুতি বন্ধ করুক।’
মহাকাশযুদ্ধে কতটা প্রস্তুত ভারত?
মহাকাশে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আলোচনায় ভারতের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শত্রুপক্ষের উপগ্রহ ধ্বংস করার মতো অ্যান্টি-স্যাটেলাইট বা এএসএটি প্রযুক্তি ভারতের রয়েছে।
২০১৯ সালে ‘মিশন শক্তি’ অভিযানের মাধ্যমে ভারত এই সক্ষমতা প্রদর্শন করে। ওই পরীক্ষায় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে থাকা ভারতের একটি নিষ্ক্রিয় উপগ্রহ ধ্বংস করা হয়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের পর ভারত বিশ্বের চতুর্থ দেশ হিসেবে এ ধরনের সক্ষমতা প্রদর্শন করে।
পরীক্ষায় ‘হিট-টু-কিল’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। এই প্রযুক্তিতে ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি উপগ্রহে আঘাত করে সেটিকে ধ্বংস করে। অভিযানের মাধ্যমে দ্রুতগতিতে চলা মহাকাশবস্তু শনাক্ত করা, তার গতিপথ অনুসরণ করা এবং নির্ভুলভাবে আঘাত করার সক্ষমতা দেখায় ভারত।
ধ্বংসাবশেষের ঝুঁকিতে পরীক্ষায় বিরতি
মিশন শক্তির পর মহাকাশে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এ ধরনের ধ্বংসাবশেষ অন্য উপগ্রহ ও মহাকাশযানের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
এই ঝুঁকির কারণে ভারত এরপর আর একই ধরনের কোনো অ্যান্টি-স্যাটেলাইট পরীক্ষা চালায়নি। তবে মিশন শক্তি প্রমাণ করেছে, মহাকাশে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের উপগ্রহকে লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনার জন্য ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র, ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে।
মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আইন এবং মহাকাশের পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন। ভবিষ্যতের সংঘাত পৃথিবীর বাইরে ছড়িয়ে পড়বে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত; তবে পরাশক্তিগুলোর সামরিক প্রস্তুতি সেই সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।





















