আসিফ মাহমুদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চায় দুদক, অনুসন্ধানে অভিযোগের বিস্তার

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:৪৬:৫০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করতে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চলমান অনুসন্ধান বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
দুদক সূত্র বলছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার, সরকারি পদে নিয়োগ ও পদায়নে অর্থ লেনদেন, টেন্ডার-বাণিজ্য এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। অভিযোগের তথ্য-উপাত্ত যাচাইয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নথিপত্র পর্যালোচনা করছেন অনুসন্ধান কর্মকর্তারা।
তবে এসব অভিযোগ এখনো অনুসন্ধানাধীন। অভিযোগের সত্যতা আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
দুদকের তথ্যে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে অর্থ পাচার করে বিলাসবহুল সম্পদ কেনা এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে।
অভিযোগে দেশভিত্তিক অর্থের পরিমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—দুবাই: ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুর: ৩ হাজার কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়া: ২ হাজার কোটি টাকা, সুইজারল্যান্ড: ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
এ ছাড়া পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে অর্থ রাখার অভিযোগও অনুসন্ধানে রয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক।
নিয়োগ-পদায়ন ও টেন্ডার ঘিরে অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধানে সরকারি পদে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও এসেছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং ৩৬ জন জেলা প্রশাসক পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের টেন্ডার-বাণিজ্য এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডারেও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগ
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
দুদকের তথ্যে বলা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগে ১০ কোটি টাকা, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগে ৬৫ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমও অনুসন্ধানে
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও পেয়েছে দুদক।
অভিযোগ অনুযায়ী, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদায়নে ৭৬ লাখ টাকা, ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতিতে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের স্থানে পদায়নের জন্য আরও প্রায় ২ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে।
আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন ও তাঁর এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধেও ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। তাঁর পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে।
নতুন অভিযোগ যুক্ত হচ্ছে
দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তানজির আহমেদ ১৩ সেপ্টেম্বর আজকের পত্রিকাকে জানান, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে পাওয়া নতুন অভিযোগগুলো আগে থেকে চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
এর আগে ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
‘মিডিয়া ট্রায়ালের’ অভিযোগ আসিফের
দুদকের বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন আসিফ মাহমুদ। ৯ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বিষয়ে দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
পরে তাঁর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জনি দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের কাছে আইনি নোটিশ পাঠান।
১১ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ মাহমুদ দাবি করেন, তদন্তের ফলাফল বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশের আগেই দুদকের বক্তব্যের কারণে তাঁকে নিয়ে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ শুরু হয়েছে। এতে তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এখন দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আবেদনের মাধ্যমে অনুসন্ধান কার্যক্রমকে কীভাবে এগিয়ে নেয় দুদক, সেটিই দেখার বিষয়।

























