ঢাকা ০৯:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
মশার ওষুধে কেরোসিন, বর্জ্য সংগ্রহে বাড়তি ফি: ডিএসসিসিতে দুদকের অভিযান প্রধান ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা ১ অক্টোবর থেকে চলচ্চিত্রে ফিরুক সমাজ বদলের বার্তা, নির্মাতাদের আহ্বান তথ্যমন্ত্রীর একাদশে ভর্তির প্রথম ধাপের ফল প্রকাশ, ২৪ সেপ্টেম্বর শুরু ক্লাস মেলান্দহে অবৈধ ইটভাটা গুঁড়িয়ে দিল পরিবেশ অধিদপ্তর সাত মাসে ৬৪১ ধর্ষণ, ৩৭ হত্যা: মামলা হলেও ন্যায়বিচারে ঘাটতি কেন? কংগ্রেস নেতাদের গণহত্যা! ১৩ বছর পর ১০ মাওবাদী নেতার মৃত্যুদণ্ড গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল: প্রত্যাহার ওসি দাউদ হোসেন ‘চেয়ারম্যান হলে গাঁজা-ইয়াবা ফ্রি দেবো’, যুবদল নেতার নামে পোস্টারিং হামের প্রকোপ অব্যাহত, ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু

৫ হাজার ২৮৪ মামলা বিচারাধীন বা তদন্তাধীন, সমন্বয়হীনতায় ভোগান্তিতে ভুক্তভোগীরা

সাত মাসে ৬৪১ ধর্ষণ, ৩৭ হত্যা: মামলা হলেও ন্যায়বিচারে ঘাটতি কেন?

বিশেষ প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:৩২:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশে নারী ও শিশু সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান, আইনগত সহায়তা ও সেবা কাঠামো থাকলেও সহিংসতার ঘটনা থামছে না। বরং চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে নারী ও শিশু ধর্ষণের ৬৪১টি ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। একই সময়ে ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষণচেষ্টা, শিশু হত্যা ও যৌন হয়রানির ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান বলছে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নারী ধর্ষণের ঘটনা ৪০০টি এবং শিশু ধর্ষণের ঘটনা ২৪১টি। ধর্ষণের পর হত্যা হয়েছে ৩৭টি, আর ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ১৫২টি।

তবে এসব সংখ্যা শুধু নথিভুক্ত ঘটনার হিসাব। ফলে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি কি না, তা এই পরিসংখ্যান থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

একই সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ৬০৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণ ২৪১টি এবং শিশু হত্যা ২১৩টি।

এই তথ্যের পাশাপাশি সংলাপে উঠে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জন্য সেবা থাকলেও সেই সেবা পাওয়ার পথ এখনো জটিল, বিচ্ছিন্ন ও অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ।

সাত মাসে ৬৪১ ধর্ষণ, ৩৭ হত্যার ঘটনা

বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিয়ে আয়োজিত সংলাপে আসক এসব তথ্য তুলে ধরে।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান জানান, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে নারী ধর্ষণের ৪০০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা হয়েছে ৩৭টি এবং ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ১৫২টি।

শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগজনক। ৬০৬টি ঘটনার মধ্যে ২৪১টি ধর্ষণ এবং ২১৩টি শিশু হত্যার ঘটনা রয়েছে।

এছাড়া নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তের ১৯১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

এই পরিসংখ্যানের প্রতিটি ঘটনা আলাদা ভুক্তভোগী, পরিবার ও বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব ঘটনার পর ভুক্তভোগীরা কতটা দ্রুত চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও নিরাপত্তা পাচ্ছেন?

মামলা হচ্ছে, কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া কতটা এগোচ্ছে?

সংলাপে মানব পাচারসংক্রান্ত মামলার তথ্যও তুলে ধরা হয়। ২০২৫ সালে এ বিষয়ে ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। আর ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বিচারাধীন বা তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ২৮৪টি।

তবে এসব মামলার কতটি তদন্তাধীন, কতটি বিচারাধীন এবং কোন পর্যায়ে কত সময় ধরে আটকে আছে—প্রকাশিত তথ্য থেকে তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না।

এই তথ্য বিচারব্যবস্থার সামগ্রিক অকার্যকারিতা প্রমাণ করে—এমন সিদ্ধান্তও সরাসরি টানা যায় না। তবে মামলার সংখ্যা, নিষ্পত্তির হার ও দীর্ঘসূত্রতার কারণ আলাদা করে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

কারণ মামলা নথিভুক্ত হওয়া এবং ভুক্তভোগীর কার্যকর ন্যায়বিচার পাওয়া এক বিষয় নয়।

আইনগত সহায়তা আছে, কিন্তু পৌঁছানো কঠিন

নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য দেশে আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা, আশ্রয় ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রয়েছে।

কিন্তু আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব সেবা অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়। ফলে ভুক্তভোগীদের এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়।

এর ফলে সময় ও অর্থ—দুটিই ব্যয় হয়।

বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ আইনগত সহায়তা ও সুরক্ষা সেবা সম্পর্কে কম জানেন বলে সংলাপে উল্লেখ করা হয়।

এখানে একটি বাস্তব প্রশ্ন সামনে আসে—যে ব্যক্তি সহিংসতার শিকার হয়ে নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও বিচার চান, তাঁকে কেন একাধিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে যেতে হবে?

১৮ লাখের বেশি মানুষ সেবা পেয়েছেন, তবু ঘাটতি কোথায়?

জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত ১৮ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯ জন আইনগত সহায়তা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন।

এর মধ্যে—

সুপ্রিম কোর্ট আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে ৩১ হাজার ২২২ জন। দেশের ৬৪টি জেলা আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন।

এই পরিসংখ্যান আইনগত সহায়তা ব্যবস্থার আওতায় বিপুলসংখ্যক মানুষের পৌঁছানোর তথ্য দেয়। তবে মোট কতজন আবেদন করেছিলেন, কতজনের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে কিংবা কতজন আবেদন করেও সেবা পাননি—এসব তথ্য ছাড়া ব্যবস্থাটির সামগ্রিক কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা কঠিন।

সংলাপে বলা হয়, আইনগত সহায়তা পাওয়ার আবেদনপ্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে জটিল ও সময়সাপেক্ষ। একাধিক অনুমোদনের ধাপ এবং নিয়মিত সভা না হওয়ায় কিছু আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হয়।

আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের ব্যবস্থাও অনেকের জন্য জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।

ডিজিটাল সেবা চালু, ব্যবহার কম কেন?

আইনগত সহায়তার জন্য অনলাইন আবেদন ও হেল্পলাইন চালু থাকলেও গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেটের সীমিত সুযোগ, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে ডিজিটাল সেবার ব্যবহার কম বলে সংলাপে উল্লেখ করা হয়।

বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ বিনা মূল্যে আইনগত পরামর্শ, আইনজীবী নিয়োগ ও মামলা পরিচালনার সুযোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পান না।

এখানে শুধু অনলাইন ব্যবস্থা চালু করাই যথেষ্ট নয়। মানুষ সেই সেবা সম্পর্কে জানেন কি না, আবেদন করতে পারেন কি না এবং আবেদন করার পর সহায়তা পান কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

৯৫টি ওয়ান-স্টপ সেন্টার, সমন্বিত সেবা কোথায়?

জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য দেশে ৯৫টি ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) ও সেল রয়েছে।

কিন্তু প্রতিটি কেন্দ্রে চিকিৎসা, ফরেনসিক পরীক্ষা, আইনগত সহায়তা, মনোসামাজিক সহায়তা ও পুনর্বাসনসহ সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করা যায়নি বলে সংলাপে উঠে এসেছে।

অনেক কেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা সেবা, নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক ল্যাব ও পৃথক কাউন্সেলিংয়ের স্থানও পর্যাপ্ত নয়।

ফলে একটি ভুক্তভোগী একই প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সব সেবা না পেলে তাকে অন্যত্র যেতে হতে পারে।

এই ঘাটতি শুধু প্রশাসনিক নয়; চিকিৎসা, নিরাপত্তা, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

রাষ্ট্র কি একা পারবে?

বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রেজমিন সুলতানা বলেন, অধিকার লঙ্ঘিত না হওয়াই প্রকৃত সুরক্ষা। তবে অধিকার লঙ্ঘিত হলে দ্রুত প্রতিকার দিতে রাষ্ট্রের কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একা কাজ করা সম্ভব নয়।

তার মতে, সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সংলাপে পুলিশ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর, হাসপাতাল, আইনগত সহায়তা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

এতে বোঝা যায়, সুরক্ষা ব্যবস্থায় একাধিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকলেও তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরি

সংলাপে উত্থাপিত তথ্য ও সমস্যাগুলো বিবেচনায় কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে—

১. ধর্ষণ ও সহিংসতার অভিযোগ নথিভুক্ত হওয়ার পর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় কতটা সময় লাগছে?

২. গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে আইনগত সহায়তার তথ্য পৌঁছানোর দায়িত্ব কার?

৩. ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ফরেনসিক সুবিধা কতটা নিশ্চিত?

৪. ভুক্তভোগীদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য কী ব্যবস্থা রয়েছে?

৫. বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দূর করতে কার্যকর জবাবদিহির কাঠামো আছে কি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শুধু নতুন সেবা চালু বা নতুন নির্দেশনা জারি করে সমস্যার সমাধান কতটা সম্ভব, তা বোঝা কঠিন।

নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার নথিভুক্ত ঘটনা এবং আইনগত সহায়তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরছে।

একদিকে সহিংসতার অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে ভুক্তভোগীদের সেবা পাওয়ার পথে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা।

আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন—এসবকে আলাদা আলাদা সেবা হিসেবে না দেখে সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা সংলাপে উঠে এসেছে।

এখন মূল বিষয় হলো, সুপারিশগুলো বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে এবং ভুক্তভোগীরা দ্রুত ও সহজে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবেন কি না।

কারণ ন্যায়বিচারের সুযোগ থাকা এবং সেই সুযোগ বাস্তবে কাজে লাগাতে পারা—দুটির মধ্যে ব্যবধান যতদিন থাকবে, সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নও ততদিন থেকে যাবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

৫ হাজার ২৮৪ মামলা বিচারাধীন বা তদন্তাধীন, সমন্বয়হীনতায় ভোগান্তিতে ভুক্তভোগীরা

সাত মাসে ৬৪১ ধর্ষণ, ৩৭ হত্যা: মামলা হলেও ন্যায়বিচারে ঘাটতি কেন?

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:৩২:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশে নারী ও শিশু সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান, আইনগত সহায়তা ও সেবা কাঠামো থাকলেও সহিংসতার ঘটনা থামছে না। বরং চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে নারী ও শিশু ধর্ষণের ৬৪১টি ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। একই সময়ে ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষণচেষ্টা, শিশু হত্যা ও যৌন হয়রানির ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান বলছে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নারী ধর্ষণের ঘটনা ৪০০টি এবং শিশু ধর্ষণের ঘটনা ২৪১টি। ধর্ষণের পর হত্যা হয়েছে ৩৭টি, আর ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ১৫২টি।

তবে এসব সংখ্যা শুধু নথিভুক্ত ঘটনার হিসাব। ফলে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি কি না, তা এই পরিসংখ্যান থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

একই সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ৬০৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণ ২৪১টি এবং শিশু হত্যা ২১৩টি।

এই তথ্যের পাশাপাশি সংলাপে উঠে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জন্য সেবা থাকলেও সেই সেবা পাওয়ার পথ এখনো জটিল, বিচ্ছিন্ন ও অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ।

সাত মাসে ৬৪১ ধর্ষণ, ৩৭ হত্যার ঘটনা

বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিয়ে আয়োজিত সংলাপে আসক এসব তথ্য তুলে ধরে।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান জানান, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে নারী ধর্ষণের ৪০০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা হয়েছে ৩৭টি এবং ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ১৫২টি।

শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগজনক। ৬০৬টি ঘটনার মধ্যে ২৪১টি ধর্ষণ এবং ২১৩টি শিশু হত্যার ঘটনা রয়েছে।

এছাড়া নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তের ১৯১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

এই পরিসংখ্যানের প্রতিটি ঘটনা আলাদা ভুক্তভোগী, পরিবার ও বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব ঘটনার পর ভুক্তভোগীরা কতটা দ্রুত চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও নিরাপত্তা পাচ্ছেন?

মামলা হচ্ছে, কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া কতটা এগোচ্ছে?

সংলাপে মানব পাচারসংক্রান্ত মামলার তথ্যও তুলে ধরা হয়। ২০২৫ সালে এ বিষয়ে ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। আর ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বিচারাধীন বা তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ২৮৪টি।

তবে এসব মামলার কতটি তদন্তাধীন, কতটি বিচারাধীন এবং কোন পর্যায়ে কত সময় ধরে আটকে আছে—প্রকাশিত তথ্য থেকে তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না।

এই তথ্য বিচারব্যবস্থার সামগ্রিক অকার্যকারিতা প্রমাণ করে—এমন সিদ্ধান্তও সরাসরি টানা যায় না। তবে মামলার সংখ্যা, নিষ্পত্তির হার ও দীর্ঘসূত্রতার কারণ আলাদা করে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

কারণ মামলা নথিভুক্ত হওয়া এবং ভুক্তভোগীর কার্যকর ন্যায়বিচার পাওয়া এক বিষয় নয়।

আইনগত সহায়তা আছে, কিন্তু পৌঁছানো কঠিন

নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য দেশে আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা, আশ্রয় ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রয়েছে।

কিন্তু আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব সেবা অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়। ফলে ভুক্তভোগীদের এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়।

এর ফলে সময় ও অর্থ—দুটিই ব্যয় হয়।

বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ আইনগত সহায়তা ও সুরক্ষা সেবা সম্পর্কে কম জানেন বলে সংলাপে উল্লেখ করা হয়।

এখানে একটি বাস্তব প্রশ্ন সামনে আসে—যে ব্যক্তি সহিংসতার শিকার হয়ে নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও বিচার চান, তাঁকে কেন একাধিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে যেতে হবে?

১৮ লাখের বেশি মানুষ সেবা পেয়েছেন, তবু ঘাটতি কোথায়?

জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত ১৮ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯ জন আইনগত সহায়তা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন।

এর মধ্যে—

সুপ্রিম কোর্ট আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে ৩১ হাজার ২২২ জন। দেশের ৬৪টি জেলা আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন।

এই পরিসংখ্যান আইনগত সহায়তা ব্যবস্থার আওতায় বিপুলসংখ্যক মানুষের পৌঁছানোর তথ্য দেয়। তবে মোট কতজন আবেদন করেছিলেন, কতজনের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে কিংবা কতজন আবেদন করেও সেবা পাননি—এসব তথ্য ছাড়া ব্যবস্থাটির সামগ্রিক কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা কঠিন।

সংলাপে বলা হয়, আইনগত সহায়তা পাওয়ার আবেদনপ্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে জটিল ও সময়সাপেক্ষ। একাধিক অনুমোদনের ধাপ এবং নিয়মিত সভা না হওয়ায় কিছু আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হয়।

আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের ব্যবস্থাও অনেকের জন্য জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।

ডিজিটাল সেবা চালু, ব্যবহার কম কেন?

আইনগত সহায়তার জন্য অনলাইন আবেদন ও হেল্পলাইন চালু থাকলেও গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেটের সীমিত সুযোগ, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে ডিজিটাল সেবার ব্যবহার কম বলে সংলাপে উল্লেখ করা হয়।

বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ বিনা মূল্যে আইনগত পরামর্শ, আইনজীবী নিয়োগ ও মামলা পরিচালনার সুযোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পান না।

এখানে শুধু অনলাইন ব্যবস্থা চালু করাই যথেষ্ট নয়। মানুষ সেই সেবা সম্পর্কে জানেন কি না, আবেদন করতে পারেন কি না এবং আবেদন করার পর সহায়তা পান কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

৯৫টি ওয়ান-স্টপ সেন্টার, সমন্বিত সেবা কোথায়?

জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য দেশে ৯৫টি ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) ও সেল রয়েছে।

কিন্তু প্রতিটি কেন্দ্রে চিকিৎসা, ফরেনসিক পরীক্ষা, আইনগত সহায়তা, মনোসামাজিক সহায়তা ও পুনর্বাসনসহ সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করা যায়নি বলে সংলাপে উঠে এসেছে।

অনেক কেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা সেবা, নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক ল্যাব ও পৃথক কাউন্সেলিংয়ের স্থানও পর্যাপ্ত নয়।

ফলে একটি ভুক্তভোগী একই প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সব সেবা না পেলে তাকে অন্যত্র যেতে হতে পারে।

এই ঘাটতি শুধু প্রশাসনিক নয়; চিকিৎসা, নিরাপত্তা, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

রাষ্ট্র কি একা পারবে?

বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রেজমিন সুলতানা বলেন, অধিকার লঙ্ঘিত না হওয়াই প্রকৃত সুরক্ষা। তবে অধিকার লঙ্ঘিত হলে দ্রুত প্রতিকার দিতে রাষ্ট্রের কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একা কাজ করা সম্ভব নয়।

তার মতে, সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সংলাপে পুলিশ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর, হাসপাতাল, আইনগত সহায়তা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

এতে বোঝা যায়, সুরক্ষা ব্যবস্থায় একাধিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকলেও তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরি

সংলাপে উত্থাপিত তথ্য ও সমস্যাগুলো বিবেচনায় কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে—

১. ধর্ষণ ও সহিংসতার অভিযোগ নথিভুক্ত হওয়ার পর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় কতটা সময় লাগছে?

২. গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে আইনগত সহায়তার তথ্য পৌঁছানোর দায়িত্ব কার?

৩. ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ফরেনসিক সুবিধা কতটা নিশ্চিত?

৪. ভুক্তভোগীদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য কী ব্যবস্থা রয়েছে?

৫. বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দূর করতে কার্যকর জবাবদিহির কাঠামো আছে কি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শুধু নতুন সেবা চালু বা নতুন নির্দেশনা জারি করে সমস্যার সমাধান কতটা সম্ভব, তা বোঝা কঠিন।

নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার নথিভুক্ত ঘটনা এবং আইনগত সহায়তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরছে।

একদিকে সহিংসতার অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে ভুক্তভোগীদের সেবা পাওয়ার পথে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা।

আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন—এসবকে আলাদা আলাদা সেবা হিসেবে না দেখে সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা সংলাপে উঠে এসেছে।

এখন মূল বিষয় হলো, সুপারিশগুলো বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে এবং ভুক্তভোগীরা দ্রুত ও সহজে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবেন কি না।

কারণ ন্যায়বিচারের সুযোগ থাকা এবং সেই সুযোগ বাস্তবে কাজে লাগাতে পারা—দুটির মধ্যে ব্যবধান যতদিন থাকবে, সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নও ততদিন থেকে যাবে।