ঢাকা ০২:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

হু হু করে বাড়ছে পদ্মার পানি, বন্ধ ১৮ স্কুলের পাঠদান

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:২৪:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে হু হু করে বাড়ছে পদ্মার পানি। উজানের ঢলে নদীর পানি বেড়ে সীমান্তবর্তী চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি। যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন দুই ইউনিয়নের ৫০ হাজারের বেশি মানুষ।

পানি বাড়ায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। এ কারণে চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ১৬টি প্রাথমিক ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি।

এক সপ্তাহে পানি বেড়েছে ৮৮ সেন্টিমিটার

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, ফারাক্কা হয়ে নেমে আসা উজানের ঢলে গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে পদ্মার পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে। গত এক সপ্তাহে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে নদীর পানি বেড়েছে প্রায় ৮৮ সেন্টিমিটার।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেল পর্যন্ত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি ১২ দশমিক ৮৮ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল। সেখানে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ৯২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নদীর পানি।

পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় দৌলতপুরের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পানির নিচে রাস্তাঘাট, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন দুই ইউনিয়নের বাসিন্দারা।

বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর এলাকার ফসলি জমিতেও। এতে রোপা আমন ধান, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, উজানের ঢলে হঠাৎ করে পদ্মার পানি বেড়ে যাওয়ায় ইউনিয়নের সবকটি গ্রাম ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষও পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

তিনি বলেন, পানি এভাবে বাড়তে থাকলে এবং বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও গো-খাদ্যের সংকট দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত জানানো হচ্ছে।

ঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা, স্থগিত পাঠদান

পানি বাড়ায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষার্থীদের যাতায়াত। দৌলতপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহম্মেদ জানান, পানির কারণে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তবে বন্যাকবলিত ১৮টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাসে আসতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে এবং শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে।

তবে বিদ্যালয়গুলোর ভবন খোলা থাকবে। বন্যায় ঘরবাড়ি হারানো মানুষ যাতে সেখানে নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন, সে জন্যই এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত

পানির তোড়ে কৃষিতেও পড়েছে বড় ধাক্কা। উপজেলা কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর জমির ফসল ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কৃষি পরামর্শ দেওয়া হবে।

ত্রাণ কার্যক্রমের প্রস্তুতি

দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ জানান, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে এবং সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

তিনি বলেন, পানিবন্দি মানুষের সহযোগিতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

পদ্মার পানি বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকায় দৌলতপুরের নিম্নাঞ্চলে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, এখন সেদিকেই নজর স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দাদের।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

হু হু করে বাড়ছে পদ্মার পানি, বন্ধ ১৮ স্কুলের পাঠদান

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:২৪:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে হু হু করে বাড়ছে পদ্মার পানি। উজানের ঢলে নদীর পানি বেড়ে সীমান্তবর্তী চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি। যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন দুই ইউনিয়নের ৫০ হাজারের বেশি মানুষ।

পানি বাড়ায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। এ কারণে চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ১৬টি প্রাথমিক ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি।

এক সপ্তাহে পানি বেড়েছে ৮৮ সেন্টিমিটার

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, ফারাক্কা হয়ে নেমে আসা উজানের ঢলে গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে পদ্মার পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে। গত এক সপ্তাহে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে নদীর পানি বেড়েছে প্রায় ৮৮ সেন্টিমিটার।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেল পর্যন্ত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি ১২ দশমিক ৮৮ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল। সেখানে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ৯২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নদীর পানি।

পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় দৌলতপুরের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পানির নিচে রাস্তাঘাট, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন দুই ইউনিয়নের বাসিন্দারা।

বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর এলাকার ফসলি জমিতেও। এতে রোপা আমন ধান, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, উজানের ঢলে হঠাৎ করে পদ্মার পানি বেড়ে যাওয়ায় ইউনিয়নের সবকটি গ্রাম ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষও পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

তিনি বলেন, পানি এভাবে বাড়তে থাকলে এবং বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও গো-খাদ্যের সংকট দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত জানানো হচ্ছে।

ঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা, স্থগিত পাঠদান

পানি বাড়ায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষার্থীদের যাতায়াত। দৌলতপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহম্মেদ জানান, পানির কারণে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তবে বন্যাকবলিত ১৮টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাসে আসতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে এবং শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে।

তবে বিদ্যালয়গুলোর ভবন খোলা থাকবে। বন্যায় ঘরবাড়ি হারানো মানুষ যাতে সেখানে নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন, সে জন্যই এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত

পানির তোড়ে কৃষিতেও পড়েছে বড় ধাক্কা। উপজেলা কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর জমির ফসল ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কৃষি পরামর্শ দেওয়া হবে।

ত্রাণ কার্যক্রমের প্রস্তুতি

দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ জানান, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে এবং সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

তিনি বলেন, পানিবন্দি মানুষের সহযোগিতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

পদ্মার পানি বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকায় দৌলতপুরের নিম্নাঞ্চলে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, এখন সেদিকেই নজর স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দাদের।