রাডার অচল, তবু চলছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস; গভীর সমুদ্রের তথ্য নিয়ে শঙ্কা

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:৩৩:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
বৃষ্টি, ঝড়, ঘূর্ণিঝড় কিংবা তাপপ্রবাহ—প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম বার্তা পেতে আধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা এখন অনেক বেশি। কিন্তু দেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আবহাওয়া রাডার দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর। ফলে গভীর সমুদ্রের আবহাওয়ার তথ্য সরাসরি পাওয়ার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে ঘাটতি।
বর্তমানে কক্সবাজার ও খেপুপাড়ার রাডার অচল থাকায় সাগরের ওই অংশের আবহাওয়ার তথ্য সরাসরি সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের দাবি, গাণিতিক মডেল, স্যাটেলাইট এবং দেশের বিভিন্ন স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করেই পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে।
আবহাওয়া গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও গভীর সমুদ্রের আবহাওয়া আরও নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য নতুন রাডার স্টেশন স্থাপন জরুরি।
খনার বচন থেকে স্যাটেলাইটে
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরুর বহু আগে থেকেই বাংলায় আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার নিজস্ব পদ্ধতি ছিল। বাতাসের গতিপ্রকৃতি, পাখির আচরণ, পিঁপড়ার চলাচল, ব্যাঙের ডাক, চাঁদ, সূর্য ও নক্ষত্রের অবস্থান দেখে কৃষকেরা বৃষ্টি কিংবা খরার সম্ভাবনা আঁচ করতেন।
এই প্রাচীন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সবচেয়ে পরিচিত রূপ পাওয়া যায় খনার বচনে।
সময় বদলেছে, বদলেছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার পদ্ধতিও। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, ভূমিধস ও তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ায় পূর্বাভাস ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে স্যাটেলাইট, রাডার ও আধুনিক গাণিতিক মডেল।
আন্তর্জাতিক তথ্যের ওপরও নির্ভরতা
বর্তমানে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, সুইডেন ও নরওয়েসহ আটটি আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে কাজ করছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
দেশের রাডার, ৬১টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্যকে গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হচ্ছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস।
জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বর্তমানে পাঁচ দিনের পূর্বাভাস ও আউটলুক দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গাণিতিক মডেলের পূর্বাভাসও রয়েছে। পূর্বাভাসে কিছুটা ত্রুটি থাকা স্বাভাবিক হলেও সেটি কীভাবে আরও কমিয়ে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে আনা যায়, সেটিই এখন লক্ষ্য।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মমিনুল ইসলাম বলেন, জাপান, কোরিয়া ও চীনের স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন দেশের আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মান অনেক ভালো।
অচল তিন রাডার, চালু মাত্র দুই
তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনো বড় বাধা। কক্সবাজার, খেপুপাড়া ও মৌলভীবাজারের রাডার দীর্ঘদিন ধরে অচল। বর্তমানে গাজীপুর ও রংপুরের রাডারই কার্যকর রয়েছে।
বিশেষ করে কক্সবাজার ও খেপুপাড়ার রাডার অচল থাকায় বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ অংশের আবহাওয়ার তথ্য সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ কমেছে।
আবহাওয়া গবেষকদের মতে, স্যাটেলাইট ও গাণিতিক মডেল গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাডারের বিকল্প পুরোপুরি নয়। গভীর সমুদ্র থেকে দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহ এবং ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণে রাডারের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও আবহাওয়া গবেষক ড. আব্দুল মান্নান চৌধুরী বলেন, দেশে আরও বেশি রাডার থাকলে পূর্বাভাস ব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে। তাঁর মতে, বর্তমানে এমন প্রযুক্তিও রয়েছে, যার মাধ্যমে বড় একটি অঞ্চলের আবহাওয়ার পূর্বাভাস একসঙ্গে পাওয়া সম্ভব।
২৭৫ স্বয়ংক্রিয় স্টেশনের তথ্য এক জায়গায়
দেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে ২৭৫টি স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব কেন্দ্রের তথ্য নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি ডেটা সেন্টার।
স্যাটেলাইটসহ বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া আবহাওয়ার তথ্যও সেখানে জমা হচ্ছে। এরপর এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হচ্ছে পূর্বাভাস।
অর্থাৎ রাডারের সীমাবদ্ধতা থাকলেও দেশের আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা পুরোপুরি থেমে নেই। তবে আরও নির্ভুল ও দ্রুত পূর্বাভাস নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞদের জোর দাবি—অচল রাডারগুলো দ্রুত সচল করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন রাডার স্টেশন স্থাপন করতে হবে।





















