ডিম-মুরগি থেকে মাছ-সবজি—ছয় মাসে ঢাকার বাজারে যতটা বদল

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৪৯:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
বাজারে গেলেই এখন হিসাব মেলানো কঠিন। ছয় মাস আগে যে টাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কেনা যেত, একই পরিমাণ পণ্য কিনতে এখন গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। ডিম, মুরগি, মাছ ও মৌসুমি বেশ কিছু সবজির দাম বেড়েছে। সঙ্গে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে তেল ও চিনির বাজারও।
যদিও কিছু পণ্যের দাম কমেছে বা প্রায় একই আছে, তবু সামগ্রিক বাজার ব্যয়ের ওপর তার বড় কোনো প্রভাব পড়েনি। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের সংসার খরচে স্বস্তি ফেরেনি।
শুক্রবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল ও কাঁঠালবাগান বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
থামছে না ডিম-মুরগির দাম
এক মাসের বেশি সময় ধরে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে ডিম ও মুরগি। আগে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। ফার্মের ডিমের ডজন পাওয়া যেত ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায়।
আগস্টের শুরুতে দাম বাড়ার পর আর কমেনি। বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা কেজি এবং ফার্মের ডিম ১৫০ টাকা ডজন।
সোনালি মুরগির বাজারেও এসেছে নতুন চাপ। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে প্রায় ৩০ টাকা বেড়ে বৃহস্পতিবার এর দাম দাঁড়ায় ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা। তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে হাইব্রিড সোনালি বা কালারবার্ড—৩০০ থেকে ৩৩০ টাকা কেজি।
বিক্রেতাদের মতে, বন্যা, অতিবৃষ্টি ও অতিরিক্ত গরমে গত কয়েক মাসে অনেক খামারে মুরগি মারা গেছে। ক্ষতির পর অনেক খামারি নতুন করে উৎপাদনে ফেরেননি। এর সঙ্গে লোডশেডিংয়ের প্রভাবেও কোথাও কোথাও উৎপাদন কমেছে। সব মিলিয়ে ডিম ও মুরগির সরবরাহে টান পড়েছে বলে তাঁদের দাবি।
মৌসুম বদল, সবজিতে নতুন হিসাব
শীতের মৌসুমে সবজির সরবরাহ বেশি থাকায় ছয় মাস আগে বাজার ছিল তুলনামূলক স্বস্তির। এখন মৌসুম পাল্টেছে, আর তার সঙ্গে পাল্টেছে সবজির দামও।
লম্বা বেগুন এখন ৭০ টাকা এবং গোল বেগুন ১০০ টাকা কেজি। মার্চের শুরুতে বেগুনের দাম ছিল ৬০ থেকে ৮০ টাকা।
তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা টমেটোতে। ছয় মাস আগে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজির টমেটো এখন বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকায়। আগাম শিমের দামও কম নয়—১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি।
হাইব্রিড শসা ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং দেশি শসা ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি। পটোল, ঢ্যাঁড়স ও কাঁকরোলের দাম ৬০ থেকে ৮০ টাকা।
অবশ্য কিছু সবজিতে মিলেছে সামান্য স্বস্তি। মার্চে প্রায় ১০০ টাকা কেজির করলা এখন ৮০ টাকা। বরবটি ৮০ টাকা এবং পেঁপে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
কাঁচা মরিচের বাজারও ক্রেতাদের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। এক সপ্তাহে কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে বর্তমানে দাম দাঁড়িয়েছে ১৬০ টাকা। মার্চের শেষ দিকে এই মরিচের দাম ছিল ৮০ থেকে ১০০ টাকা।
শাকের বাজারে লাল শাক ও কলমি শাক ২০ টাকা আঁটি, ডাঁটা শাক ৩০ থেকে ৪০ টাকা, পুঁই শাক ৩০ থেকে ৫০ টাকা, লাউ শাক ৪০ থেকে ৬০ টাকা এবং কচু শাক ২৫ থেকে ৩০ টাকা আঁটি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, মৌসুম পরিবর্তনের কারণে সবজির দামে এমন ওঠানামা স্বাভাবিক।
মাছের বাজারেও বাড়তি খরচ
সবজি ও মুরগির সঙ্গে মাছের বাজারেও গত ছয় মাসে বেড়েছে বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম।
তেলাপিয়া এখন ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি, যেখানে মার্চে ছিল ২০০ থেকে ২৩০ টাকা। পাঙাশের দাম বেড়ে হয়েছে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা; ছয় মাস আগে ছিল ১৮০ থেকে ২২০ টাকা।
রুই-কাতলার দাম আকারভেদে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি। বড় রুই বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায়। তবে মাঝারি আকারের রুই এখনো ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।
চিংড়ির দাম মান ও আকারভেদে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং টেংরা প্রায় ৭০০ টাকা কেজি। ছয় মাস আগের তুলনায় পাবদার দামে বড় পরিবর্তন হয়নি।
তেল-চিনিতেও বাড়তি চাপ
শুধু কাঁচাবাজার নয়, নিত্যপণ্যের তালিকায় তেল-চিনির দামও বাড়তি।
গত ২ সেপ্টেম্বর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়েছে কোম্পানিগুলো। ফলে এক লিটার বোতলজাত তেলের দাম ১৯৯ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০৪ টাকা।
খোলা চিনির দামও মাসখানেকের ব্যবধানে বেড়েছে। আগে ১০৫ থেকে ১১০ টাকা কেজি থাকলেও এখন তা ১১৫ টাকা। মোড়কজাত চিনির দাম ১২০ টাকা।
সুগন্ধি বা পোলাও চালের দামও কেজিতে ২০০ টাকার আশপাশে রয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রপ্তানির সুযোগ থাকায় দেশের বাজারে সরবরাহ কমে এ চালের দাম বেড়েছে। এরপর গত মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদিত কোটা ৫০ শতাংশ কমানোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
৫০০ টাকায় আগের মতো বাজার হচ্ছে না
দাম বাড়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি টের পাচ্ছেন সীমিত আয়ের ক্রেতারা।
টাউন হল বাজারের ক্রেতা আবির হাকিমের ভাষায়, ছয় মাসে বাজারের চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। কিছু পণ্যের দাম কমলেও ডিম, মাছ ও অধিকাংশ সবজির দাম এখনো বেশি। তাঁর দাবি, ছয় মাস আগে ৫০০ টাকায় যে পরিমাণ প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা যেত, এখন একই টাকায় তা পাওয়া যায় না। চাল-ডালসহ অন্যান্য খরচও বেড়েছে।
তাজমহল রোডের বাসিন্দা তাজুল ইসলামের কথাতেও একই আক্ষেপ। তাঁর আয় কম হওয়ায় মাংসের মধ্যে মূলত মুরগিই কেনেন। কিন্তু সেই মুরগির দামও এখন নাগালের মধ্যে থাকছে না।
সব মিলিয়ে গত ছয় মাসে ঢাকার বাজারে সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হয়েছে ডিম, মুরগি, মৌসুমি সবজি ও কয়েক ধরনের মাছে। গরুর মাংসের দাম প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও তাতে সামগ্রিক বাজার ব্যয় কমেনি। ফলে বাজারের পণ্যের তালিকা যেমন বদলেছে, তেমনি বাড়তি দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের সংসার খরচও।
























