খেলাপির চাপে নড়বড়ে ১৫ ব্যাংক, প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৫৭:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় এখন শুধু আদায় সংকট তৈরি করছে না, একসঙ্গে দুর্বল করে দিচ্ছে ব্যাংকের আয়, মূলধন, আর্থিক সুরক্ষা ও নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা। আয় কমে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারা কয়েকটি ব্যাংকের পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন প্রান্তিকের হিসাব বলছে, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১৫টি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। ঘাটতি পূরণে সক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি এসব ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ ও নতুন ঋণ বিতরণেও চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের অভিঘাত এখন আর শুধু ব্যাংকের হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ নেই; তা ছড়িয়ে পড়ছে ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রমেও।
খেলাপি ঋণ ছাড়িয়েছে ৬ লাখ কোটি টাকা
চলতি বছরের জুন প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই এখন খেলাপি।
খেলাপি ঋণের এই বিপুল পরিমাণই সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আয় ও প্রভিশন ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। নিয়ম অনুযায়ী খেলাপি ঋণ বাড়লে তার বিপরীতে ব্যাংককে বাড়তি প্রভিশন রাখতে হয়। কিন্তু আয় কমে যাওয়ায় অনেক ব্যাংকই সেই প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সঞ্চিতি গড়ে তুলতে পারছে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গত দেড় দশকে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের বড় একটি অংশ এখন আর ফেরত আসছে না। এর প্রভাব পড়েছে সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব ব্যাংকের খেলাপি ঋণে।
সরকারি পাঁচ ব্যাংকের ঘাটতিই ৭৮ হাজার কোটি টাকা
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। পাঁচ সরকারি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘাটতি জনতা ব্যাংকের—৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৫ হাজার ৪৭ কোটি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রায় ৩৩ কোটি টাকা।
বেসরকারি ১০ ব্যাংকেও বড় ঘাটতি
বেসরকারি খাতের ১০ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এ তালিকায় সবচেয়ে বড় ঘাটতি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের—৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকের ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১১ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংকের ৫ হাজার ৫ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২ হাজার ৫৯৫ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ২ হাজার ৯৫ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৬৪৫ কোটি, এনআরবিসি ব্যাংকের ৮২০ কোটি এবং এনআরবি ব্যাংকের ১৩০ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।
প্রভিশন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ঋণের মান বিবেচনায় ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। নিয়মিত ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ থেকে ৫ শতাংশ, সাব-স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কুঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন রাখতে হয়।
এর উদ্দেশ্য হলো—কোনো ঋণ শেষ পর্যন্ত আদায় না হলে ব্যাংক যাতে একবারে বড় আর্থিক ধাক্কায় না পড়ে। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় ১৫টি ব্যাংকের আর্থিক সুরক্ষা এখন বড় প্রশ্নের মুখে।
‘আয় না থাকায় প্রভিশন রাখতে পারেনি’
জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, বিগত সরকারের সময়ে নামে-বেনামে ঋণ বিতরণের কারণে কয়েকটি ব্যাংকের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়েছে। এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রভিশন ঘাটতিও বেড়েছে।
তাঁর মতে, আয় না থাকায় ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারেনি। নিয়ম অনুযায়ী, এমন অবস্থায় এসব ব্যাংক মুনাফাও ঘোষণা করতে পারবে না।
সার্বিক খাতেও ঘাটতি বিশাল
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, পুরো ব্যাংকিং খাতে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে সংরক্ষণ করা হয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা।
শুধু সমস্যাগ্রস্ত ১৫ ব্যাংকের হিসাবেই প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। তবে কিছু ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পেরেছে। ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতের হিসাবে মোট প্রভিশন ঘাটতি কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণের রেকর্ড উচ্চতা এবং তার বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংকিং খাতের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। খেলাপি ঋণ আদায় না হলে এবং আয় বাড়াতে না পারলে দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধন ও আর্থিক সুরক্ষার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।





















