ঢাকা ০৮:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
হবিগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রায় হামলার অভিযোগ, আহত সারজিস-নাসীরউদ্দীন ৩৩ বছর বয়সে প্রথম বার টেস্ট দলে ডাক পেলেন সারাংশ জৈন জাপানে ৭.১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প, জারি সুনামি সতর্কতা চাকরিতে মেধা নয়, বিএনপির পদ থাকলেই যোগ্যতা: গোলাম পরওয়ার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিচয়ে প্রতারণা, জনসাধারণকে সতর্ক থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ফোনালাপ শিক্ষককে মারধর, প্রতিবাদে এমপি গোলাম রসুলের বাড়িতে হামলা-ভাংচুর ডেঙ্গুতে আরও ৩ জনের মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি ৫১২ মিরপুর কলেজের দেয়াল ধসে ২ জনের মৃত্যু, আহত অন্তত ৭ বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত: তথ্য উপদেষ্টা

মুখ থুবড়ে বিকল্প সড়ক প্রকল্প, চরম ভোগান্তিতে লাখো মানুষ

ছয় বছরে মাত্র তিনটি পিলার, ১০ কোটি টাকা বিল তুলে উধাও ঠিকাদার

মোঃ মশিউর রহমান, টাঙ্গাইল
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৪:৫৫:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬ ৩৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার জোকারচরে নিউ ধলেশ্বরী নদীর ওপর নির্মাণাধীন একটি সেতু ছয় বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। ২৬৪ মিটার দীর্ঘ সেতুটির কাজ এখনো মাত্র তিনটি পিলারে আটকে আছে। অভিযোগ উঠেছে, সামান্য কাজ করেই প্রায় ১০ কোটি টাকা বিল উত্তোলনের পর মূল ঠিকাদার আত্মগোপনে চলে গেছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে নির্মাণকাজ, আর ভোগান্তিতে পড়েছেন টাঙ্গাইল সদর ও কালিহাতী উপজেলার লাখো মানুষ।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, যমুনা সেতু-ঢাকা মহাসড়কের বিকল্প সড়ক তৈরি এবং চরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ করতে জোকারচরে নিউ ধলেশ্বরী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ৩৪ কোটি ১৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ২৬৪ মিটার দীর্ঘ পিএসসি গার্ডার সেতুর জন্য দরপত্র আহ্বান করে এলজিইডি। যৌথভাবে কাজ পায় হায়দার কনস্ট্রাকশন প্রাইভেট লিমিটেড, অবনী এন্টারপ্রাইজ ও সৈয়দ মজিবুর রহমান। ২০২০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার শর্ত ছিল।

তিনটি পিলার, তারপরই থেমে যায় কাজ

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর দুই তীরে মাত্র তিনটি পিলার নির্মাণের পরই থেমে গেছে পুরো প্রকল্প। অভিযোগ রয়েছে, মূল ঠিকাদার মো. হেকমত আলী এই সামান্য কাজ দেখিয়ে এলজিইডি থেকে ৯ কোটি ৮১ লাখ ৪২ হাজার ৭৪৩ টাকা বিল তুলে নিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি নির্মাণস্থলে এসে মাপজোক করেন, কিছু নির্মাণসামগ্রী এনে আবার চলে যান। কিন্তু প্রকল্পের প্রকৃত দায়িত্বে কে রয়েছেন, সে বিষয়ে কেউই নিশ্চিত নন।

অংশীদারদের দ্বন্দ্বে থমকে যায় প্রকল্প

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কার্যাদেশ পাওয়ার পর দীর্ঘ সময় প্রকল্পের কাজই শুরু হয়নি। পরে ২০২১ সালের এপ্রিলে যৌথ উদ্যোগের এক অংশীদার সৈয়দ মজিবুর রহমান প্রায় তিন কোটি টাকা বিনিয়োগ করে নির্মাণকাজ শুরু করেন।

তার অভিযোগ, অপর অংশীদার অবনী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. হেকমত আলী সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে এসে কাজ বন্ধ করে দেন এবং নিজেই কাজ করবেন বলে দাবি করেন। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব, পাল্টাপাল্টি মামলা এবং প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়ার ঘটনাও ঘটে।

জাল স্বাক্ষরে কাজ বিক্রির অভিযোগ

সৈয়দ মজিবুর রহমানের অভিযোগ, হেকমত আলী অপর দুই অংশীদারের স্বাক্ষর জাল করে গাজীপুরের ঠিকাদার রফিকুল ইসলামের কাছে প্রকল্পের কাজ বিক্রি করেন।

রফিকুল ইসলামের দাবি, তিনি পাইলিংসহ সেতুর কাজের জন্য হেকমত আলীকে ২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা দিয়েছেন। পরে জাল স্বাক্ষরের বিষয়টি জানতে পেরে প্রতিবাদ করলে তাকে এলেঙ্গার একটি রিসোর্টে আটকে রেখে সব চুক্তিপত্র ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত তিনি কোনো অর্থ ফেরত পাননি বলেও অভিযোগ করেন।

সরকার পরিবর্তনের পর আত্মগোপনে ঠিকাদার

অভিযোগ রয়েছে, তিনটি পিলার নির্মাণের পর প্রায় ১০ কোটি টাকা বিল উত্তোলন করেন হেকমত আলী। এরপর গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। সেই থেকে পুরো প্রকল্প কার্যত বন্ধ রয়েছে।

নতুন দরপত্র, নতুন আশা

দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটাতে চলতি বছরের ৯ মার্চ নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে এলজিইডি। এবার ৩৪ কোটি ৪৪ লাখ ৫৩ হাজার ৩৭৯ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে কাজ পায় চৌধুরী-এলহোজ জয়েন্ট ভেঞ্চার (জেভি)। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ২২ মাসের মধ্যে সেতুর নির্মাণ শেষ করার কথা রয়েছে।

বিকল্প মহাসড়কের স্বপ্ন এখনো অধরা

স্থানীয় বাসিন্দা ইউনুস শেখ, বিদ্যুৎ মিয়া, জাহাঙ্গীর হোসেন ও মাসুদ রানা জানান, এই সেতু নির্মিত হলে যমুনা সেতু-ঢাকা মহাসড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ চালু হবে। এতে টাঙ্গাইল শহরসহ পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ সহজেই উত্তরাঞ্চলে যাতায়াত করতে পারবেন। বিশেষ করে ঈদের সময় মহাসড়কের তীব্র যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে সেতুটি।

তাদের দাবি, বছরের পর বছর অবহেলা ও অনিয়মের কারণে জনগণ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। দ্রুত সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করে জনদুর্ভোগ লাঘবের দাবি জানান তারা।

এলজিইডির বক্তব্য

টাঙ্গাইল এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানার পারভীন বলেন, “যৌথ ঠিকাদারদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ও দ্বন্দ্বের কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। তারা যতটুকু কাজ করেছেন, সে অনুযায়ী বিল পরিশোধ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, এবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে।”

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

মুখ থুবড়ে বিকল্প সড়ক প্রকল্প, চরম ভোগান্তিতে লাখো মানুষ

ছয় বছরে মাত্র তিনটি পিলার, ১০ কোটি টাকা বিল তুলে উধাও ঠিকাদার

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৪:৫৫:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার জোকারচরে নিউ ধলেশ্বরী নদীর ওপর নির্মাণাধীন একটি সেতু ছয় বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। ২৬৪ মিটার দীর্ঘ সেতুটির কাজ এখনো মাত্র তিনটি পিলারে আটকে আছে। অভিযোগ উঠেছে, সামান্য কাজ করেই প্রায় ১০ কোটি টাকা বিল উত্তোলনের পর মূল ঠিকাদার আত্মগোপনে চলে গেছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে নির্মাণকাজ, আর ভোগান্তিতে পড়েছেন টাঙ্গাইল সদর ও কালিহাতী উপজেলার লাখো মানুষ।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, যমুনা সেতু-ঢাকা মহাসড়কের বিকল্প সড়ক তৈরি এবং চরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ করতে জোকারচরে নিউ ধলেশ্বরী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ৩৪ কোটি ১৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ২৬৪ মিটার দীর্ঘ পিএসসি গার্ডার সেতুর জন্য দরপত্র আহ্বান করে এলজিইডি। যৌথভাবে কাজ পায় হায়দার কনস্ট্রাকশন প্রাইভেট লিমিটেড, অবনী এন্টারপ্রাইজ ও সৈয়দ মজিবুর রহমান। ২০২০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার শর্ত ছিল।

তিনটি পিলার, তারপরই থেমে যায় কাজ

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর দুই তীরে মাত্র তিনটি পিলার নির্মাণের পরই থেমে গেছে পুরো প্রকল্প। অভিযোগ রয়েছে, মূল ঠিকাদার মো. হেকমত আলী এই সামান্য কাজ দেখিয়ে এলজিইডি থেকে ৯ কোটি ৮১ লাখ ৪২ হাজার ৭৪৩ টাকা বিল তুলে নিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি নির্মাণস্থলে এসে মাপজোক করেন, কিছু নির্মাণসামগ্রী এনে আবার চলে যান। কিন্তু প্রকল্পের প্রকৃত দায়িত্বে কে রয়েছেন, সে বিষয়ে কেউই নিশ্চিত নন।

অংশীদারদের দ্বন্দ্বে থমকে যায় প্রকল্প

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কার্যাদেশ পাওয়ার পর দীর্ঘ সময় প্রকল্পের কাজই শুরু হয়নি। পরে ২০২১ সালের এপ্রিলে যৌথ উদ্যোগের এক অংশীদার সৈয়দ মজিবুর রহমান প্রায় তিন কোটি টাকা বিনিয়োগ করে নির্মাণকাজ শুরু করেন।

তার অভিযোগ, অপর অংশীদার অবনী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. হেকমত আলী সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে এসে কাজ বন্ধ করে দেন এবং নিজেই কাজ করবেন বলে দাবি করেন। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব, পাল্টাপাল্টি মামলা এবং প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়ার ঘটনাও ঘটে।

জাল স্বাক্ষরে কাজ বিক্রির অভিযোগ

সৈয়দ মজিবুর রহমানের অভিযোগ, হেকমত আলী অপর দুই অংশীদারের স্বাক্ষর জাল করে গাজীপুরের ঠিকাদার রফিকুল ইসলামের কাছে প্রকল্পের কাজ বিক্রি করেন।

রফিকুল ইসলামের দাবি, তিনি পাইলিংসহ সেতুর কাজের জন্য হেকমত আলীকে ২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা দিয়েছেন। পরে জাল স্বাক্ষরের বিষয়টি জানতে পেরে প্রতিবাদ করলে তাকে এলেঙ্গার একটি রিসোর্টে আটকে রেখে সব চুক্তিপত্র ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত তিনি কোনো অর্থ ফেরত পাননি বলেও অভিযোগ করেন।

সরকার পরিবর্তনের পর আত্মগোপনে ঠিকাদার

অভিযোগ রয়েছে, তিনটি পিলার নির্মাণের পর প্রায় ১০ কোটি টাকা বিল উত্তোলন করেন হেকমত আলী। এরপর গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। সেই থেকে পুরো প্রকল্প কার্যত বন্ধ রয়েছে।

নতুন দরপত্র, নতুন আশা

দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটাতে চলতি বছরের ৯ মার্চ নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে এলজিইডি। এবার ৩৪ কোটি ৪৪ লাখ ৫৩ হাজার ৩৭৯ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে কাজ পায় চৌধুরী-এলহোজ জয়েন্ট ভেঞ্চার (জেভি)। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ২২ মাসের মধ্যে সেতুর নির্মাণ শেষ করার কথা রয়েছে।

বিকল্প মহাসড়কের স্বপ্ন এখনো অধরা

স্থানীয় বাসিন্দা ইউনুস শেখ, বিদ্যুৎ মিয়া, জাহাঙ্গীর হোসেন ও মাসুদ রানা জানান, এই সেতু নির্মিত হলে যমুনা সেতু-ঢাকা মহাসড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ চালু হবে। এতে টাঙ্গাইল শহরসহ পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ সহজেই উত্তরাঞ্চলে যাতায়াত করতে পারবেন। বিশেষ করে ঈদের সময় মহাসড়কের তীব্র যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে সেতুটি।

তাদের দাবি, বছরের পর বছর অবহেলা ও অনিয়মের কারণে জনগণ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। দ্রুত সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করে জনদুর্ভোগ লাঘবের দাবি জানান তারা।

এলজিইডির বক্তব্য

টাঙ্গাইল এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানার পারভীন বলেন, “যৌথ ঠিকাদারদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ও দ্বন্দ্বের কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। তারা যতটুকু কাজ করেছেন, সে অনুযায়ী বিল পরিশোধ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, এবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে।”