দাঁত মাজার পেস্টেই বিষ! জানুন শরীরে কী ক্ষতি হতে পারে

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৪৩:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
প্রতিদিন সকালে দাঁত মাজা আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস। তবে এই অভ্যাসের মধ্য দিয়েই অজান্তে শরীরে প্রবেশ করতে পারে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে বিক্রি হওয়া প্রতি চারটি টুথপেস্টের মধ্যে প্রায় তিনটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার উপস্থিতি রয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুদের জন্য তৈরি কয়েকটি টুথপেস্টেও এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, দাঁত ব্রাশ করার সময় অল্প পরিমাণ টুথপেস্ট অনিচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলা অস্বাভাবিক নয়। নিয়মিত এমনটি ঘটতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়েই মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, যকৃত, কিডনি এবং এমনকি গর্ভফুল (প্লাসেন্টা) পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।
যদিও মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি, তবুও বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন। এ কারণে দৈনন্দিন ব্যবহারের পণ্য, বিশেষ করে টুথপেস্টের উপাদান সম্পর্কে সচেতন থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন গবেষকরা।
মাইক্রোপ্লাস্টিক কী
মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা। এগুলো বড় প্লাস্টিক ভেঙে তৈরি হতে পারে, আবার প্রসাধনী, ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য, পোশাকের সিনথেটিক তন্তু বা শিল্পকারখানার বিভিন্ন উপাদান থেকেও পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
খাবার, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে প্রতিদিনই অজান্তে কিছু মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। এখন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কিছু ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য থেকেও এর সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি রয়েছে।
শরীরে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের ঝুঁকি
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, শরীরে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিককে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিদেশি বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ আবার বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
শরীরে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের ঝুঁকি
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, শরীরে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিককে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিদেশি বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ আবার বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
হৃদ্রোগের ঝুঁকি
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের রক্তনালিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ছিল, তাদের হৃদ্রোগ, স্ট্রোক বা অন্যান্য হৃদ্সংক্রান্ত জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি কারণ নাকি কেবল একটি সম্পর্ক, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা দরকার।
মস্তিষ্কের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
সাম্প্রতিক গবেষণায় মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। গবেষকরা মনে করছেন, খুব ছোট আকারের কিছু প্লাস্টিক কণা রক্ত ও মস্তিষ্কের সুরক্ষাব্যবস্থা অতিক্রম করতে পারে। তবে এগুলো স্মৃতিশক্তি বা স্নায়ুতন্ত্রে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব
অনেক প্লাস্টিকে এমন কিছু রাসায়নিক উপাদান থাকে, যেগুলো হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। গবেষকদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন এসব উপাদানের সংস্পর্শে থাকলে বিপাকক্রিয়া, প্রজননস্বাস্থ্য এবং শরীরের হরমোন নিয়ন্ত্রণে প্রভাব পড়তে পারে।
কোষের ক্ষতি
গবেষণাগারে করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে কোষ ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে। তবে মানুষের শরীরে বাস্তবে এর প্রভাব কতটা, তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
ফুসফুসের সমস্যা
বাতাসের মাধ্যমে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিক ফুসফুসে জমতে পারে। গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের কণার সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসতন্ত্রে প্রদাহ বা অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে এই সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আরও তথ্য প্রয়োজন।
আমদানি করা ও দেশে তৈরি ৩৪টি টুথপেস্ট পরীক্ষা করে ২৬টিতেই এই বিষাক্ত উপাদান পেয়েছে বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো)। এমনকি শিশুদের জন্য তৈরি টুথপেস্টেও মিলেছে এই মাইক্রোপ্লাস্টিক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও স্নায়ুরোগসহ নানা জটিল রোগের কারণ এই কণা। অথচ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ এই উপাদানের কথা পণ্যের মোড়কে উলেখই থাকছে না।
এমন ভয়াবহ তথ্য সামনে আসার পর টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মানদণ্ড যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বিএসটিআই।
গবেষকরা জানিয়েছেন, ল্যাব পরীক্ষায় বাংলাদেশের ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে, ভারতের ৫টির মধ্যে ১টিতে, থাইল্যান্ডের ২টির মধ্যে ১টিতে এবং ভিয়েতনামের ২টির মধ্যে দুটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।
একটি টুথপেস্টে প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৩২০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। শিশুদের জন্য বিক্রি হওয়া ৬টি টুথপেস্টের মধ্যে ৪টিতেই (৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ) মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এসব টুথপেস্টে প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে ১৪০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।
টুথপেস্ট ব্যবহারের অভ্যাস এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা জানতে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ জুন পর্যন্ত গবেষণাটি করা হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকার ২ হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর জরিপ চালানো হয়।
পাশাপাশি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি (ইএইচই)’ ল্যাবরেটরিতে ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষায় আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি স্টিরিওমাইক্রোস্কোপি ও ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি (এফটিআইআর) ব্যবহার করা হয়। পরীক্ষা করা ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে (৭৬.৫ শতাংশ) মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, আর ৮টিতে (২৩.৫ শতাংশ) কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক ফুসফুসের প্রদাহ, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়া এবং অ্যাজমা ও সিওপিডি রোগের জন্য দায়ী। অন্ত্রের প্রদাহ, অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং আইবিএস ও ইনফ্লেমেটরি বাওয়েল ডিজিজ (দীর্ঘমেয়াদি আময়াশয়)-এর ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
এছাড়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করা, রক্তনালীর ক্ষতি, অস্বাভাবিক রক্তজমাট বাঁধা এবং হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। মাইক্রোপ্লাস্টিক মস্তিষ্কের ওপরও প্রভাব ফেলে। যার মধ্যে রয়েছে নিউরো-ইনফ্লেমেশন (স্নায়ু প্রদাহ) এবং চিন্তাশক্তির সক্ষমতা হ্রাস করা।
এছাড়াও হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, প্রজনন ক্ষমতা বা উর্বরতা হ্রাস পাওয়া এবং ভ্রুণের বিকাশে প্রভাব বিস্তার করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পরীক্ষা করা কোনো টুথপেস্টের মোড়ক বা লেবেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা কৃত্রিম পলিমার ব্যবহারের তথ্য উলেখ ছিল না। ফলে ভোক্তারা যেমন জানতে পারছেন না তারা কী ব্যবহার করছেন, তেমনি নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্যও এসব পণ্য কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
গবেষণায় শুধু টুথপেস্টেই নয়, ভোক্তার সচেতনতাতেও বড় ঘাটতি উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় সবাই নিয়মিত টুথপেস্ট ব্যবহার করলেও ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ জানতেনই না যে এতে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে। মাত্র ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা এ বিষয়ে সচেতন বলে জানিয়েছেন।




















