দ্বিতীয় বিয়ে বিতর্কে এমপি পদ হারানোর শঙ্কায় গাজী নজরুল, বলছেন আইন বিশেষজ্ঞরা

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৪:২৮:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তরুণীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সেটিকে নিজের ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ বলে দাবি করেছেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলাম। তবে তার এ দাবি ঘিরে নতুন আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুসরণ না করা হলে তা গুরুতর আইনি জটিলতার জন্ম দিতে পারে, এমনকি পরিস্থিতিভেদে তার সংসদ সদস্য পদও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বিদ্যমান স্ত্রী থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে হলে ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১’ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সালিসি পরিষদের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক। এ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয় এবং নিবন্ধনও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
তাদের মতে, আইন লঙ্ঘন, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে গাজী নজরুলকে ফৌজদারি ও সাংবিধানিক—উভয় ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
ভিডিও ভাইরাল থেকে বিয়ের দাবি
হোটেলের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রথমদিকে নীরব ছিলেন গাজী নজরুল। পরে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ভিডিওতে থাকা তরুণীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন। পরবর্তীতে তার প্রথম স্ত্রী, ওই তরুণী এবং তরুণীর বাবাও বিয়ের দাবির পক্ষে বক্তব্য দেন।
এর আগে জামায়াত-সমর্থকদের একটি অংশ ভিডিওটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করলেও পরে গাজী নজরুল জানান, গত ১৭ জুন তিনি ওই তরুণীকে বিয়ে করেছেন।
এদিকে ভাইরাল আরেকটি ভিডিওতে তাকে ক্ষমা চাইতে দেখা যায়। সেখানে তিনি বলেন, কক্ষটি অন্য একজন ভাড়া করেছিলেন এবং তিনি ওই তরুণীকে নিয়ে সেখানে মাত্র একবার গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “আমার ভুল হয়ে গেছে, আমাকে দয়া করে ছেড়ে দিন।”
অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে?
গাজী নজরুল দাবি করেছেন, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামে তরুণীর বাবার বাড়িতে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। তবে গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলম জানিয়েছেন, দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির জন্য এমপির পক্ষ থেকে সালিসি পরিষদে কোনো আবেদন করা হয়নি।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আব্দুল আজিজ বলেন, তিনি বিষয়টি পরে জানতে পেরেছেন। তার দাবি, বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রথম স্ত্রী ও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
কাবিননামা নিয়েও বিতর্ক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কথিত কাবিননামায় কাজী বদরুল আলম মো. বাকী বিল্লাহর সিল ও স্বাক্ষর রয়েছে। তিনি দাবি করেন, তিনি বিয়ে পড়াননি; কেবল বিয়ের নিবন্ধন করেছেন।
সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া নিবন্ধন কেন করা হলো—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রথম স্ত্রী উপস্থিত থাকায় তিনি নিবন্ধন করেন।
তবে আইনজীবীদের বক্তব্য, প্রথম স্ত্রীর উপস্থিতি বা সম্মতি কোনোভাবেই সালিসি পরিষদের আইনগত অনুমতির বিকল্প হতে পারে না।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদা খানম বলেন, দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির জন্য আইনে নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। গাজী নজরুলের নির্বাচনী হলফনামায় সন্তানের তথ্যও উল্লেখ আছে। ফলে তিনি আইনের শর্ত পূরণ করেছেন কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
জিম্মি করার অভিযোগ, থানায় হয়নি মামলা
গাজী নজরুল অভিযোগ করেছেন, ঢাকার মগবাজারে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তাকে ও তার দুই স্ত্রীকে জিম্মি করে এক লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে।
তবে হাতিরঝিল ও রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তার পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ করা হয়নি।
অন্যদিকে, কয়েক সপ্তাহ আগে তার ভাইয়ের গাড়ির যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনায় তিনি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে পল্লবী থানার ওসি জানিয়েছেন।
জীবনবৃত্তান্ত ও স্বাক্ষরে অসংগতি
ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরও কিছু অসংগতি সামনে এসেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২২ জুন ২০২৬ তারিখের একটি জীবনবৃত্তান্তে গাজী নজরুলের সুপারিশ থাকলেও সেখানে তরুণীর বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সুপারিশপত্রে ব্যবহৃত গাজী নজরুলের স্বাক্ষর এবং কথিত কাবিননামায় থাকা স্বাক্ষরের মধ্যে অমিল থাকার অভিযোগও উঠেছে।
নৈতিকতার প্রশ্ন
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিয়ে ব্যক্তিগত বিষয় হলেও আইন মেনে তা সম্পন্ন করতে হবে। একজন জনপ্রতিনিধির ক্ষেত্রে আইনের প্রতি দায়বদ্ধতা আরও বেশি।
তার মতে, তদন্তে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনি পরিণতি ভোগ করতে হবে। একই সঙ্গে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে।




















