ঢাকা ০৮:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সেতু আছে, ওঠার রাস্তা নেই—তিন বছর ধরে ভোগান্তি

মোঃ মশিউর রহমান, টাঙ্গাইল
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:১৪:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬ ২৮ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

টাঙ্গাইলের নাগরপুরে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতু তিন বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেতুর দুই পাশে নেই প্রয়োজনীয় অ্যাপ্রোচ সড়ক ও গাইডওয়াল। ফলে সেতু নির্মাণ হলেও সেটি পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছেন না স্থানীয়রা। বর্ষা এলেই কাদা-পানি আর ঝুঁকিপূর্ণ পথ পেরিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে অন্তত ২০ গ্রামের মানুষকে।

নাগরপুর উপজেলার সলিমাবাদ ইউনিয়নের ঘুনিপাড়া পশ্চিমপাড়া এলাকায় তেবাড়িয়া-দপ্তিয়র সড়কের ওপর ২০২৩ সালে এলজিইডির একটি প্রকল্পের আওতায় সেতুটি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এলাকাবাসীর আশা ছিল, সেতুটি চালু হলে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ কমবে। কিন্তু নির্মাণ শেষ হলেও দুই পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় সেই সুফল পাচ্ছেন না তারা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি গ্রামের মানুষ চলাচল করেন। কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াত, রোগী আনা-নেওয়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে সেতুটির গুরুত্ব অনেক। অথচ সেতুর দুই পাশে নিরাপদ ওঠানামার ব্যবস্থা না থাকায় মানুষকে বিকল্প কাঁচা ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রশিদ বলেন, সেতুটি নির্মাণের পর মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু অ্যাপ্রোচ সড়ক না থাকায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বিশেষ করে কৃষিপণ্য পরিবহন ও রোগী নিয়ে যাতায়াতে মানুষকে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

লুৎফর রহমান নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কাদা ও পানির কারণে মোটরসাইকেল, ভ্যান ও কৃষিপণ্যবাহী যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্করা।

ঘুনিপাড়া গ্রামের আমিনুর রহমান মিন্টুর ভাষ্য, সেতুটি নির্মাণের সময় এলাকাবাসী ভেবেছিলেন দীর্ঘদিনের যাতায়াত সমস্যা এবার শেষ হবে। কিন্তু প্রায় তিন বছর পরও সেতুর ওপর দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা যাচ্ছে না। সেতুটি এখন যেন মানুষের দুর্ভোগেরই প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সলিমাবাদ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মনোয়ারা বেগম পনু বলেন, তিন বছর ধরে সেতুটি দাঁড়িয়ে আছে। মূল নির্মাণকাজ শেষ হলেও দুই পাশে অ্যাপ্রোচ সড়ক না থাকায় মানুষের কোনো কাজে আসছে না। দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

স্থানীয় আরেক জনপ্রতিনিধি জাহিদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যকর তদারকি দেখা যায়নি। ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গাফিলতি এবং অনিয়মের কারণে কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রংপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স খাইরুল কবির রানার পক্ষে প্রকল্পের কাজ করেন উপঠিকাদার রিপন। অভিযোগ রয়েছে, কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই তিনি দীর্ঘদিন আগে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রকল্পের অর্থ উত্তোলনের পরও বাকি কাজ শেষ করা হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে উপঠিকাদার রিপনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্তারিত তথ্য না দিয়ে বাড়িতে গিয়ে কথা বলার কথা বলেন। দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

সলিমাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন ভূঁইয়া বলেন, সেতুর কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছে। সেতুর কাছেই হাট-বাজার, স্কুল ও মাদ্রাসা থাকায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষকে এ পথ ব্যবহার করতে হয়। সিএনজি ও অটোরিকশা চলাচলেও সমস্যা হচ্ছে। বর্ষাকালে অনেক সময় কোমরপানি পেরিয়ে চলাচল করতে হয়। দ্রুত প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

রি-টেন্ডার করে বাকি কাজ করা হবে

তবে সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ না হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেননি উপজেলা এলজিইডির নির্বাহী কর্মকর্তা ইফতেখার সারোয়ার ধ্রুব। তিনি বলেন, সেতুর অ্যাপ্রোচের কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। মাটি ভরাট ও রাস্তা সংস্কারের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পে কিছু সংশোধন আনা হবে। এরপর পুনরায় টেন্ডার দিয়ে সেতুর বাকি কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি যদি আরও দীর্ঘ সময় সংযোগ সড়কবিহীন অবস্থায় পড়ে থাকে, তাহলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে—এ প্রশ্নই এখন স্থানীয়দের। এলাকাবাসীর দাবি, নতুন করে টেন্ডার ও কাগজপত্রের প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত অ্যাপ্রোচ সড়ক ও গাইডওয়ালের কাজ শেষ করে সেতুটি পুরোপুরি চলাচলের উপযোগী করা হোক।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

সেতু আছে, ওঠার রাস্তা নেই—তিন বছর ধরে ভোগান্তি

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:১৪:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

টাঙ্গাইলের নাগরপুরে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতু তিন বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেতুর দুই পাশে নেই প্রয়োজনীয় অ্যাপ্রোচ সড়ক ও গাইডওয়াল। ফলে সেতু নির্মাণ হলেও সেটি পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছেন না স্থানীয়রা। বর্ষা এলেই কাদা-পানি আর ঝুঁকিপূর্ণ পথ পেরিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে অন্তত ২০ গ্রামের মানুষকে।

নাগরপুর উপজেলার সলিমাবাদ ইউনিয়নের ঘুনিপাড়া পশ্চিমপাড়া এলাকায় তেবাড়িয়া-দপ্তিয়র সড়কের ওপর ২০২৩ সালে এলজিইডির একটি প্রকল্পের আওতায় সেতুটি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এলাকাবাসীর আশা ছিল, সেতুটি চালু হলে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ কমবে। কিন্তু নির্মাণ শেষ হলেও দুই পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় সেই সুফল পাচ্ছেন না তারা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি গ্রামের মানুষ চলাচল করেন। কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াত, রোগী আনা-নেওয়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে সেতুটির গুরুত্ব অনেক। অথচ সেতুর দুই পাশে নিরাপদ ওঠানামার ব্যবস্থা না থাকায় মানুষকে বিকল্প কাঁচা ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রশিদ বলেন, সেতুটি নির্মাণের পর মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু অ্যাপ্রোচ সড়ক না থাকায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বিশেষ করে কৃষিপণ্য পরিবহন ও রোগী নিয়ে যাতায়াতে মানুষকে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

লুৎফর রহমান নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কাদা ও পানির কারণে মোটরসাইকেল, ভ্যান ও কৃষিপণ্যবাহী যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্করা।

ঘুনিপাড়া গ্রামের আমিনুর রহমান মিন্টুর ভাষ্য, সেতুটি নির্মাণের সময় এলাকাবাসী ভেবেছিলেন দীর্ঘদিনের যাতায়াত সমস্যা এবার শেষ হবে। কিন্তু প্রায় তিন বছর পরও সেতুর ওপর দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা যাচ্ছে না। সেতুটি এখন যেন মানুষের দুর্ভোগেরই প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সলিমাবাদ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মনোয়ারা বেগম পনু বলেন, তিন বছর ধরে সেতুটি দাঁড়িয়ে আছে। মূল নির্মাণকাজ শেষ হলেও দুই পাশে অ্যাপ্রোচ সড়ক না থাকায় মানুষের কোনো কাজে আসছে না। দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

স্থানীয় আরেক জনপ্রতিনিধি জাহিদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যকর তদারকি দেখা যায়নি। ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গাফিলতি এবং অনিয়মের কারণে কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রংপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স খাইরুল কবির রানার পক্ষে প্রকল্পের কাজ করেন উপঠিকাদার রিপন। অভিযোগ রয়েছে, কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই তিনি দীর্ঘদিন আগে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রকল্পের অর্থ উত্তোলনের পরও বাকি কাজ শেষ করা হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে উপঠিকাদার রিপনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্তারিত তথ্য না দিয়ে বাড়িতে গিয়ে কথা বলার কথা বলেন। দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

সলিমাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন ভূঁইয়া বলেন, সেতুর কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছে। সেতুর কাছেই হাট-বাজার, স্কুল ও মাদ্রাসা থাকায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষকে এ পথ ব্যবহার করতে হয়। সিএনজি ও অটোরিকশা চলাচলেও সমস্যা হচ্ছে। বর্ষাকালে অনেক সময় কোমরপানি পেরিয়ে চলাচল করতে হয়। দ্রুত প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

রি-টেন্ডার করে বাকি কাজ করা হবে

তবে সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ না হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেননি উপজেলা এলজিইডির নির্বাহী কর্মকর্তা ইফতেখার সারোয়ার ধ্রুব। তিনি বলেন, সেতুর অ্যাপ্রোচের কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। মাটি ভরাট ও রাস্তা সংস্কারের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পে কিছু সংশোধন আনা হবে। এরপর পুনরায় টেন্ডার দিয়ে সেতুর বাকি কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি যদি আরও দীর্ঘ সময় সংযোগ সড়কবিহীন অবস্থায় পড়ে থাকে, তাহলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে—এ প্রশ্নই এখন স্থানীয়দের। এলাকাবাসীর দাবি, নতুন করে টেন্ডার ও কাগজপত্রের প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত অ্যাপ্রোচ সড়ক ও গাইডওয়ালের কাজ শেষ করে সেতুটি পুরোপুরি চলাচলের উপযোগী করা হোক।