সিলেটে একই বাসায় স্বামী-স্ত্রী ও গৃহপরিচারিকা খুন
লোডশেডিংয়ের নীরবতায় তিনটি চিৎকার, তারপর নিস্তব্ধতা

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৪:১২:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার মিতালি আবাসিক এলাকায় তখন বিদ্যুতের লোডশেডিং। অনেকেই ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হঠাৎ পাশের একটি বাসা থেকে ভেসে আসে চিৎকার।
চিৎকার শুনেও প্রথমে কেউ ভাবতে পারেননি, এর পেছনে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ কোনো ঘটনা। এলাকার মানুষ জানতেন, ৮২ বছর বয়সী আব্দুস সাত্তার দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তাই তাঁর বাসা থেকে চিৎকার শুনে অনেকে হয়তো অসুস্থ হয়ে পড়ে যাওয়ার ঘটনাই ভেবেছিলেন।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর সেই ধারণা বদলে যায়। বাসার বারান্দায় দেখা যায় রক্ত। খবর ছড়িয়ে পড়তেই আশপাশের মানুষ ছুটে আসেন। পরে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখতে পায়—একটি বাসার ভেতর পড়ে আছে তিনটি রক্তাক্ত মরদেহ।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে সিলেট মহানগরীর রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার মিতালি ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় ঘটে এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড।
নিহতরা হলেন বাসার মালিক মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (২৫)।
পরিচিত মুখ সাত্তার, ঘরেই ছিল শেষ আশ্রয়
আব্দুস সাত্তার শুধু ওই বাসার মালিক ছিলেন না, রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকার একজন পরিচিত প্রবীণ মানুষও ছিলেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি সজ্জন ও ভদ্র ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। একসময় ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্বেও ছিলেন তিনি।
বিয়ানীবাজারের আখাখাজনা এলাকায় তাঁর গ্রামের বাড়ি। মিতালি আবাসিক এলাকায় তাঁর একাধিক বাড়ি রয়েছে। ১১১ নম্বর তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনাকে নিয়ে থাকতেন তিনি। ভবনের অন্য তলা ও পাশের ভবনের ফ্ল্যাটগুলোতে ভাড়াটিয়ারা বসবাস করতেন।
সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির তিন মেয়ে ও এক ছেলে। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এবং দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে থাকেন। সন্তানরা দূরদেশে থাকলেও বৃদ্ধ বয়সে স্বামী-স্ত্রীর সংসার চলছিল নিজেদের মতো করে। তাঁদের দেখাশোনায় ছিলেন ২৫ বছরের গৃহপরিচারিকা তাহমিনা।
সেই ঘরই বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে পরিণত হলো নির্মম হত্যাকাণ্ডের স্থান হিসেবে।
চিৎকার শুনেছিলেন প্রতিবেশীরা
প্রতিবেশী টিপু মিয়া জানান, সকাল ৯টার দিকে এলাকায় ব্যাপক লোডশেডিং চলছিল। অনেকেই তখন ঘরে ছিলেন। হঠাৎ সাত্তার মিয়ার বাসা থেকে চিৎকারের শব্দ শোনা যায়।
কিন্তু অসুস্থ বৃদ্ধের বাসা থেকে এমন শব্দ আসায় অনেকে সেটিকে গুরুতর কিছু মনে করেননি। ধারণা করেছিলেন, হয়তো অসুস্থ হয়ে তিনি পড়ে গেছেন।
কিছুক্ষণ পর বাসার বারান্দায় রক্ত দেখতে পান পাশের বাসার লোকজন। তখনই সন্দেহ তৈরি হয়। চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হলে আশপাশের মানুষ জড়ো হন এবং পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বেলাল জানান, সকাল ৯টার দিকে চিৎকার শোনা গেলেও তখন কেউ ভেতরে কী ঘটছে বুঝতে পারেননি। প্রায় এক ঘণ্টা পর বাসার রঙের কাজের জন্য একজন মিস্ত্রি এসে ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া পাননি।
এরপর পাশের ভবনের দ্বিতীয় তলার এক ভাড়াটে দেখতে পান, সাত্তার মিয়ার বাসার দরজার নিচ দিয়ে বারান্দার দিকে রক্ত গড়িয়ে আসছে। তখনই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়।
ঘরের ভেতরে পড়ে ছিল তিনজনের মরদেহ
পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাসার প্রধান দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে ঘরের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় তিনটি মরদেহ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি কক্ষে আব্দুস সাত্তারের মরদেহ পড়ে ছিল। অন্য একটি কক্ষে পাওয়া যায় তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনার রক্তাক্ত মরদেহ।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, হামলাকারীরা বাসার দক্ষিণ পাশের একটি দরজা দিয়ে পালিয়ে গেছে। ওই দরজা দিয়ে দোতলা থেকে নিচে নামার পথেও রক্তের দাগ পাওয়া গেছে।
বাসার ভেতরে আলমারি ও ওয়ারড্রব তছনছ অবস্থায় পাওয়া গেছে। ফলে ঘটনাটি ডাকাতির উদ্দেশ্যে ঘটানো হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। একই সঙ্গে পারিবারিক কোনো পূর্ববিরোধ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে।
দূরদেশে থাকা সন্তানদের কাছে পৌঁছেছে নির্মম খবর
বৃদ্ধ দম্পতির সন্তানরা দেশের বাইরে। প্রতিদিনের মতো হয়তো তাঁরাও দূরদেশে নিজেদের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু বুধবার সকালে তাঁদের কাছে পৌঁছেছে এমন এক খবর, যা কোনো সন্তানই শুনতে চান না—বাবা-মা আর নেই।
একটি বাসার ভেতর একই সঙ্গে তিনটি প্রাণের এমন পরিণতি পুরো এলাকার মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। প্রতিবেশীদের কাছে পরিচিত, শান্ত স্বভাবের একজন প্রবীণ মানুষ, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের সঙ্গে থাকা এক তরুণী গৃহপরিচারিকা—তিনজনের জীবনই কয়েক মিনিটের নির্মমতায় থেমে গেল।
রহস্য উদ্ঘাটনে মাঠে একাধিক তদন্তকারী দল
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ডাকাতি কিংবা পারিবারিক পূর্ববিরোধ—দুই সম্ভাবনাই সামনে রেখে তদন্ত চলছে। বাসার ভেতর থেকে একটি দলিলও পাওয়া গেছে। স্বর্ণালঙ্কার বা মূল্যবান কোনো সামগ্রী খোয়া গেছে কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।
ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে সিআইডি, পিবিআই ও পুলিশের বিশেষায়িত দল একযোগে কাজ করছে। ক্রাইম সিন সংরক্ষণ করে আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে পুলিশ।
তবে তদন্তের প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি—কেন এই তিনজনকে হত্যা করা হলো, কারা এসেছিল সেই বাসায়, আর কী এমন ঘটেছিল যে সকালবেলার চিৎকারের পর একটি পরিবার ও একটি তরুণীর জীবন চিরতরে থেমে গেল?
রায়নগরের সেই বাসায় এখন নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। অথচ কয়েক ঘণ্টা আগেও সেখানে ছিল তিনটি মানুষের জীবন, পরিচিত একটি সংসার এবং প্রতিদিনের স্বাভাবিক ব্যস্ততা।




















