৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ১৯৯১-এর বিতর্ক কি ফিরছে?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৬:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
৩৫ বছর পর আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মুখোমুখি বাংলাদেশ। আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচন ঘিরে এরই মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ভোটের পদ্ধতি, দলীয় সিদ্ধান্ত এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে এবারের বিতর্ক নতুন নয়। সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসার পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও প্রকাশ্যে ভোট দেওয়া নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছিল তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচনের পোলিং কর্মকর্তা মিহির সারওয়ার মোর্শেদের স্মৃতিতে এখনো স্পষ্ট সেই দিনের দৃশ্য।
তিনি জানান, ভোটগ্রহণ শুরুর পর আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা—মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম ও সাজেদা চৌধুরীসহ প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন সংসদ সদস্য সংসদ কক্ষে প্রবেশ করে প্রকাশ্যে ভোটগ্রহণের প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ ‘শেইম, শেইম’ বলে প্রতিবাদ জানান।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে দেশে আবার সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই বছরের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং আওয়ামী লীগ প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে যায়। এরপর ৮ অক্টোবর সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
সেবার বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। নির্বাচনে মোট ৩৩০ জন ভোটারের মধ্যে ২৬৪ জন ভোট দেন। আবদুর রহমান বিশ্বাস পান ১৭২ ভোট, আর বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।
এরপর দীর্ঘ ৩৫ বছরে আটবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও কোনোবারই ভোটের প্রয়োজন হয়নি। প্রতিবারই একক প্রার্থী থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। দীর্ঘ বিরতির পর বিরোধী দলও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। দলটির পক্ষ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। ১৬ আগস্ট হবে মনোনয়নপত্র বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়। এরপর ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ আসনে বসে ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেবেন। ভোট শেষে সংসদ কক্ষেই ব্যালট গণনা করা হবে এবং সেখান থেকেই প্রাথমিক ফল ঘোষণা করা হবে।
তবে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে ভোটের গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্নটি। দেশের অন্যান্য নির্বাচনে গোপন ব্যালটে ভোট হলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হয় প্রকাশ্যে। ব্যালটে প্রার্থীর নামের পাশে ভোটারের স্বাক্ষর ও বিভক্তি নম্বর দেওয়ার বিধান রয়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—কোনো সংসদ সদস্য যদি নিজের দলের মনোনীত প্রার্থীর বাইরে অন্য প্রার্থীকে ভোট দেন, তাহলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না?
এখানেই সামনে এসেছে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ওই দল থেকে পদত্যাগ করলে কিংবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি ইতোমধ্যে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের সদস্যপদ বাতিল হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
তবে এ বিষয়ে আইন ও সংসদবিষয়ক গবেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
সংসদ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিনের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদের আইন প্রণয়ন বা স্বাভাবিক সংসদীয় কার্যক্রমের অংশ নয়। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দেওয়াকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় ফেলা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
একই ধরনের মত দিয়েছেন অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ। তাঁর মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন একটি সাংবিধানিক নির্বাচন হলেও এটি সংসদের সাধারণ কার্যপ্রণালীর অংশ নয়। তাই এখানে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে—এমন ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর। কোনো সংসদ সদস্য দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ হারানোর বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের সামনে আসতে পারে।
এই বিতর্কের শিকড় অবশ্য ১৯৯১ সালেই।
তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা এবং ওই নির্বাচনের পোলিং কর্মকর্তা মিহির সারওয়ার মোর্শেদ জানান, সংসদ কক্ষে সেদিন চারটি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল। তিনি নিজে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের পোলিং কর্মকর্তা ছিলেন। বিএনপির ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা এবং আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদ পোলিং এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সংসদ সদস্যরা একে একে ভোট দিতে আসতেন এবং পোলিং কর্মকর্তা ও এজেন্টদের সামনেই ভোট দিতেন। এমনকি তৎকালীন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও নূরুল ইসলাম মণিও প্রকাশ্য ভোটের এই ব্যবস্থার মধ্যেই তাঁদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছিলেন বলে জানান মিহির সারওয়ার মোর্শেদ।
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবরের সেই নির্বাচন শেষ পর্যন্ত বিএনপি প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাসের জয় দিয়ে শেষ হয়। তবে ভোটের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কও সেদিনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৩৫ বছর পর এবার আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সংসদে বিএনপির ২৪৭ জন সদস্য থাকায় দলটির প্রার্থীই জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু বিরোধী দল প্রার্থী দেওয়ায় এবার অন্তত ভোটের আনুষ্ঠানিকতা আর একক প্রার্থীর নির্বাচনে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
ফলে ২০ আগস্ট শুধু নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিন নয়; একই সঙ্গে প্রকাশ্য ভোট, দলীয় সিদ্ধান্ত এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নজির তৈরির দিনও হতে পারে।
১৯৯১ সালে যে প্রশ্নের জন্ম হয়েছিল, ৩৫ বছর পর সেই প্রশ্নই যেন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ফিরে এসেছে—রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্যের ভোট কি তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত, নাকি দলীয় সিদ্ধান্তেরই প্রতিফলন?


















