বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার প্রধান বাধা আইনশৃঙ্খলা

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:৪১:৩৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
আধুনিক মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠাতা মাহাথির মোহাম্মদ দেশটির উন্নয়ন পরিকল্পনায় সবার আগে স্থান দিয়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর বলেছিলেন, ‘আমরা যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে না পারি, তাহলে আমাদের কোনো স্বপ্ন পূরণ হবে না।’ আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করতে মাহাথির কঠোর হয়েছিলেন। এজন্য তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে সমালোচিতও হন। কিন্তু সব চাপ উপেক্ষা করে তিনি অপরাধ দমন করতে পেরেছিলেন বলেই মালয়েশিয়া আজ বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। শুধু মালয়েশিয়া কেন, বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সব দেশের ইতিহাস একই। তারা দেশের অপরাধ দমন করেছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করেছে। ফলে দেশিবিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। মানুষ ভয়হীন পরিবেশে কাজ করতে পেরেছে। তাই আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা একটি রাষ্ট্রের এগিয়ে যাওয়ার চাবিকাঠি। বাংলাদেশের জন্য এ উদাহরণ এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর এ দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল এগিয়ে যাওয়ার। বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর। মানুষ প্রত্যাশা করেছিল তারা শান্তিতে ও নিরাপদে বসবাস করবে। শিক্ষার্থীরা স্বপ্ন দেখেছিল শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের, ব্যবসায়ীরা ভয়হীন নিরাপদে ব্যবসা করার আশা করেছিলেন। সাধারণ মানুষ ভেবেছিল এখন তারা নিরাপদে সবকিছু উপভোগ করতে পারবে। কিন্তু ইউনূস সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বপ্নভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগেনি। ’২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকেই বাংলাদেশ যেন এক নৈরাজ্যের যুগে প্রবেশ করে। মুষ্টিমেয় কিছু লোক ইউনূস সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। সর্বত্র শুরু হয় মব সন্ত্রাস। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিচারালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে সচিবালয়, ধর্মীয় উপাসনালয় থেকে সাংস্কৃতিক অঙ্গন সব জায়গায় শুরু হয় মবের রাজত্ব। বাংলাদেশ যেন ফিরে যায় জোর যার মুলুক তার নীতিতে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটে। সাধারণ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়িতেও অনিরাপদ বোধ করতে শুরু করে। একটা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে দেশটা কোন অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইউনূস আমলের বাংলাদেশ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে দেশের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। সামাজিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। দেশিবিদেশি বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দেশে চরম অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। বেকারত্ব বাড়ে, বাড়ে দারিদ্র্য। ইউনূস আমলে দেশের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে নিরাপদে চলাফেরা করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এ রকম একটা পরিস্থিতিতে জনগণের চাপে ইউনূস সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের মানুষ শুধু বিএনপিকে ভোট দেয়নি, তারা ভোট দিয়েছে শান্তির আশায়, নিরাপত্তার পক্ষে। বিএনপির অন্যতম প্রধান নির্বাচনি অঙ্গীকার ছিল দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি। নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপি সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, এ নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। তবে এটা ঠিক, ইউনূস আমলের চেয়ে গত তিন মাসে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে অপরাধের গ্রাফ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মার্চ ও এপ্রিল এ দুই মাসে দেশে ৬০৫টি খুন, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি এবং চুরি ঘটেছে ২ হাজার ২১৪টি।
আলোচিত সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৪৯৬টি। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে ১০২ জন, দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশুর সংখ্যা ৪৯ থেকে ৭১। এ পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দেয় যে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা এখনো নাজুক।
চলতি বছরের গত পাঁচ মাসে দেশে খুন, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি ও নারী-শিশু নির্যাতন বাড়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটি (বিসিআরএস)। সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ১৪২টি খুন হয়েছে। একই সময়ে ৩৪৭টি অপহরণ, ১৮৪টি ছিনতাই ও ৫৯১টি ডাকাতির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ছিল ৫ হাজার ৯৯৮টি।
এসব পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে আমরা এখনো প্রত্যাশিত জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি।
তবে এ কথা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই যে সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে। কিন্তু ইউনূস সরকারের ১৮ মাসের ভয়াবহতা থেকে এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি। কেন পারেনি? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির পথনকশা খুঁজে পাওয়া যাবে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে পারেনি। ইউনূস সরকারের আমলে পুলিশ ও র্যাবের ভিতরে বিএনপিবিরোধী যেসব কর্মকর্তাকে বসানো হয়েছিল তারা অনেকেই এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। এসব কর্মকর্তা ও লোকজন দিয়ে বিএনপি আইনশৃঙ্খলার উন্নতি খুব একটা করতে পারবে না। কারণ এরা সব সময় বিএনপিকে ব্যর্থ করতে চাইবে। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নয়, প্রশাসনের ভিতরেও ঘাপটি মেরে আছে বিএনপিবিরোধী অনেক লোক। এরা এখন বিএনপির মুখোশ পরে আছে। কিন্তু এদের লক্ষ্য বিএনপিকে ব্যর্থ করা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি অনেকখানি নির্ভর করে বিচার বিভাগের ওপর। পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে পারে, কিন্তু তার সঠিক ও যথাযথ বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। ইউনূস সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিচার বিভাগ প্রায় ধ্বংস করে গেছেন। বিশেষ করে সরকারি আইনজীবী নিয়োগের ক্ষেত্রে হয়েছে চরম অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা। আসিফ নজরুলের নিয়োগকৃত এসব সরকারি কৌঁসুলির একটি বড় অংশ প্রচণ্ড বিএনপিবিরোধী। সাড়ে তিন মাসের সরকার এসব সরকারি আইনজীবীকে পরিবর্তন করতে পারেনি। এরা যেকোনো সময় যে সরকারকে বিব্রত করতে পারে তার প্রমাণ পাওয়া গেল ২৩ জুন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের ১৮ জন আইন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন। সুপ্রিম কোর্টে (আপিল ও হাই কোর্ট বিভাগ) রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য তাঁরা নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে সাতজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, বাকি ১১ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল। পদত্যাগকারীরা জামায়াতপন্থি আইনজীবী হিসেবে পরিচিত। পদত্যাগপত্রে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করা, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিলকে পদত্যাগের কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এ পদত্যাগের ঘটনা কি সরকারের জন্য ভালো খবর? সরকার কেন এতদিনেও আসিফ নজরুল আমলের আইন কর্মকর্তাদের যাচাইবাছাই করতে পারেনি? শুধু অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে নয়, সারা দেশে জিপি, পিপিদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা হয়েছে। এঁরাও সরকারকে যেকোনো সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে পারেন। সরকার একদিকে যেমন ইউনূস সরকারের পাতানো ফাঁদে পা দিচ্ছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চালাচ্ছে। দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে দরকার আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত অপরাধের যেমন বিচার করতে হবে, তেমন বিচার করতে হবে ইউনূস আমলে সংঘটিত মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নারী নির্যাতন ও সব হত্যাকাণ্ডের। ইউনূস সরকারের ছায়ায় থেকে যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লুটপাট করেছে, যারা বিভিন্ন সংবাদপত্র অফিসে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকার কেন দ্বিধান্বিত? ইউনূসের ঘনিষ্ঠরা যারা প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করেছে, মব করেছে কিংবা মবের পক্ষে সাফাই গেয়েছে, সরকার তাদের বিরুদ্ধে এখনো কঠোর হতে পারেনি।
সরকার অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কিন্তু ইউনূস আমলে বিনিয়োগবিনাশী তৎপরতার বিচার করছে না। কারা বিভিন্ন শিল্পকারখানায় আগুন দিয়েছিল, কারা চাঁদাবাজির জন্য ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে বিনিয়োগ পরিবেশ ধ্বংস করেছিল সবাই জানে। বিগত সাড়ে তিন মাসেও কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? দেশের অর্থনীতি সচল করতে হলে ব্যবসা পরিবেশ নষ্টকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে। ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা এখনো আতঙ্কে। এ আতঙ্ক দূর করতে না পারলে যতই প্রণোদনা দেওয়া হোক, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে না।
আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করতে হলে অবশ্যই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে নির্মোহভাবে কাজ করতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, যত ক্ষমতাবান হোক তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। জনগণের চেয়ে অপরাধীরা ক্ষমতাবান হতে পারে না। বিএনপি সরকার যদি ইউনূস আমলে সংবাদপত্র অফিসে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিত, তাহলে ২৩ জুন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে সাংবাদিক পেটানোর অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটত না। এ ঘটনার পরও সরকার এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেন?
এ সরকার জনগণের বিপুল সমর্থনে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। কাজেই কাউকে সরকারের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। অপরাধীদের একটাই পরিচয়, তারা অপরাধী। সরকার যদি কার লোক দেখে আইন প্রয়োগ করে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাক্সিক্ষত উন্নতি হবে না। আর আইনশৃঙ্খলার উন্নতি না হলে সরকারের সব স্বপ্ন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।




















