ঢাকা ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজধানীতে বাড়ছে সংঘবদ্ধ ছিনতাই, আতঙ্কে নগরবাসী

শতাব্দী বিশ্বাস
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৮:৫৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬ ৩৬ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রাজধানী ঢাকায় দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে ছিনতাই পরিস্থিতি। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত, এমনকি ভোরবেলাতেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের তৎপরতা বাড়ছে। পথচারী, শিক্ষার্থী, নারী, সাংবাদিক কিংবা শ্রমজীবী মানুষ—কেউই যেন নিরাপদ নন।

সম্প্রতি একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ও অনিরাপত্তাবোধ আরও বেড়েছে।

গত ১৩ মে দুপুরে শেরেবাংলা নগরের শিশুমেলার সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন একটি অনলাইন পোর্টালের ঢাকা মেডিকেল প্রতিবেদক কাজী আল-আমিন। বিআরটিসি বাসে ওঠার সময় সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীরা তার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়। ব্যাগে ছিল নগদ টাকা, একাধিক স্মার্টফোন, ব্যাংক কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র।

ভুক্তভোগীর ধারণা, ব্যাংক থেকে টাকা তোলার পর থেকেই তাকে অনুসরণ করা হচ্ছিল। ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হলেও তিনি পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।

এর মাত্র দুই দিন আগে মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকায় দিনের আলোতেই এক কলেজ শিক্ষার্থীকে চাপাতি ঠেকিয়ে ছিনতাই করা হয়। চলন্ত রিকশা থামিয়ে তার কাছ থেকে আইফোন, ইয়ারবাড ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয় কয়েকজন যুবক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে মুহূর্তের মধ্যে সংঘটিত ওই ঘটনার ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ভোরে বাড়ছে ঝুঁকি

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ভোরবেলাকে এখন বেশি টার্গেট করছে ছিনতাইকারীরা।

আগারগাঁও, মালিবাগ, শাহবাগ, রেলগেট ও বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় ভোরের দিকে ধারালো অস্ত্রের মুখে ছিনতাইয়ের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। হাসপাতালে যাওয়ার পথে গৃহবধূকে কুপিয়ে টাকা ছিনিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে পোশাকশ্রমিকদের ওপর হামলার মতো ঘটনাও ঘটছে প্রকাশ্যে।

যেসব এলাকায় ঝুঁকি বেশি

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর, আদাবর, যাত্রাবাড়ী, আগারগাঁও, মালিবাগ, শাহবাগ ও বিভিন্ন রেলগেট এলাকা বর্তমানে ছিনতাইয়ের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ছিনতাইয়ের ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। আগে একক বা ছোটখাটো ছিনতাই বেশি দেখা গেলেও এখন সংঘবদ্ধ চক্রের আধিপত্য বেড়েছে। সাধারণত চার থেকে পাঁচ সদস্যের দল নির্জন সড়ক, বাসস্ট্যান্ড বা অলিগলিতে অবস্থান নেয়। সুযোগ বুঝে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মুহূর্তেই ছিনিয়ে নেয় টাকা, মোবাইল ও মূল্যবান সামগ্রী।

পরিসংখ্যান যা বলছে

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৩০৮টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এছাড়া দেশজুড়ে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দস্যুতা ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় তিন শতাধিক মামলা হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। কারণ অনেক ভুক্তভোগী থানায় যান না, কেউ শুধু জিডি করেন, আবার অনেকে ঝামেলা এড়াতে অভিযোগই করেন না।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৬৫ শতাংশ ছিনতাই মোটরসাইকেল ব্যবহার করে সংঘটিত হচ্ছে।

জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে

পুলিশের দাবি, গত ছয় মাসে রাজধানী থেকে অন্তত ১২০০ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু তাদের একটি বড় অংশ জামিনে বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

ডিএমপির কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে বর্তমানে পেশাদার সংঘবদ্ধ চক্র, মাদকাসক্ত ভাসমান অপরাধী এবং বখে যাওয়া তরুণ—এই তিন ধরনের ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ছিনতাই এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি সংঘবদ্ধ ও পেশাভিত্তিক অপরাধে পরিণত হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে, রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে টহল কার্যক্রমে বড় ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে গভীর রাত ও ভোরের সময়ে পর্যাপ্ত পুলিশি উপস্থিতি দেখা যায় না।

তার ভাষায়, “ছিনতাই এখন নাগরিক নিরাপত্তাবোধকে সরাসরি আঘাত করছে। শুধু গ্রেপ্তার নয়, কার্যকর নজরদারি, দ্রুত বিচার ও মাঠপর্যায়ে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ জরুরি।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বেকারত্ব, মাদকসংযোগ, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিস্তার এবং দুর্বল নজরদারির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। তাই নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

রাজধানীতে বাড়ছে সংঘবদ্ধ ছিনতাই, আতঙ্কে নগরবাসী

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৮:৫৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

রাজধানী ঢাকায় দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে ছিনতাই পরিস্থিতি। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত, এমনকি ভোরবেলাতেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের তৎপরতা বাড়ছে। পথচারী, শিক্ষার্থী, নারী, সাংবাদিক কিংবা শ্রমজীবী মানুষ—কেউই যেন নিরাপদ নন।

সম্প্রতি একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ও অনিরাপত্তাবোধ আরও বেড়েছে।

গত ১৩ মে দুপুরে শেরেবাংলা নগরের শিশুমেলার সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন একটি অনলাইন পোর্টালের ঢাকা মেডিকেল প্রতিবেদক কাজী আল-আমিন। বিআরটিসি বাসে ওঠার সময় সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীরা তার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়। ব্যাগে ছিল নগদ টাকা, একাধিক স্মার্টফোন, ব্যাংক কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র।

ভুক্তভোগীর ধারণা, ব্যাংক থেকে টাকা তোলার পর থেকেই তাকে অনুসরণ করা হচ্ছিল। ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হলেও তিনি পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।

এর মাত্র দুই দিন আগে মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকায় দিনের আলোতেই এক কলেজ শিক্ষার্থীকে চাপাতি ঠেকিয়ে ছিনতাই করা হয়। চলন্ত রিকশা থামিয়ে তার কাছ থেকে আইফোন, ইয়ারবাড ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয় কয়েকজন যুবক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে মুহূর্তের মধ্যে সংঘটিত ওই ঘটনার ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ভোরে বাড়ছে ঝুঁকি

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ভোরবেলাকে এখন বেশি টার্গেট করছে ছিনতাইকারীরা।

আগারগাঁও, মালিবাগ, শাহবাগ, রেলগেট ও বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় ভোরের দিকে ধারালো অস্ত্রের মুখে ছিনতাইয়ের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। হাসপাতালে যাওয়ার পথে গৃহবধূকে কুপিয়ে টাকা ছিনিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে পোশাকশ্রমিকদের ওপর হামলার মতো ঘটনাও ঘটছে প্রকাশ্যে।

যেসব এলাকায় ঝুঁকি বেশি

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর, আদাবর, যাত্রাবাড়ী, আগারগাঁও, মালিবাগ, শাহবাগ ও বিভিন্ন রেলগেট এলাকা বর্তমানে ছিনতাইয়ের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ছিনতাইয়ের ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। আগে একক বা ছোটখাটো ছিনতাই বেশি দেখা গেলেও এখন সংঘবদ্ধ চক্রের আধিপত্য বেড়েছে। সাধারণত চার থেকে পাঁচ সদস্যের দল নির্জন সড়ক, বাসস্ট্যান্ড বা অলিগলিতে অবস্থান নেয়। সুযোগ বুঝে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মুহূর্তেই ছিনিয়ে নেয় টাকা, মোবাইল ও মূল্যবান সামগ্রী।

পরিসংখ্যান যা বলছে

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৩০৮টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এছাড়া দেশজুড়ে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দস্যুতা ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় তিন শতাধিক মামলা হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। কারণ অনেক ভুক্তভোগী থানায় যান না, কেউ শুধু জিডি করেন, আবার অনেকে ঝামেলা এড়াতে অভিযোগই করেন না।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৬৫ শতাংশ ছিনতাই মোটরসাইকেল ব্যবহার করে সংঘটিত হচ্ছে।

জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে

পুলিশের দাবি, গত ছয় মাসে রাজধানী থেকে অন্তত ১২০০ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু তাদের একটি বড় অংশ জামিনে বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

ডিএমপির কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে বর্তমানে পেশাদার সংঘবদ্ধ চক্র, মাদকাসক্ত ভাসমান অপরাধী এবং বখে যাওয়া তরুণ—এই তিন ধরনের ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ছিনতাই এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি সংঘবদ্ধ ও পেশাভিত্তিক অপরাধে পরিণত হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে, রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে টহল কার্যক্রমে বড় ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে গভীর রাত ও ভোরের সময়ে পর্যাপ্ত পুলিশি উপস্থিতি দেখা যায় না।

তার ভাষায়, “ছিনতাই এখন নাগরিক নিরাপত্তাবোধকে সরাসরি আঘাত করছে। শুধু গ্রেপ্তার নয়, কার্যকর নজরদারি, দ্রুত বিচার ও মাঠপর্যায়ে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ জরুরি।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বেকারত্ব, মাদকসংযোগ, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিস্তার এবং দুর্বল নজরদারির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। তাই নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।