ডেঙ্গু: সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ৩২২ জনের প্রাণহানি

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৫:২১:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই। বরং নভেম্বরের শুরুতেও প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৯৬ জন। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ দিনেই এ রোগে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৩ জন। সব মিলিয়ে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫২ জনে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত নিয়মিত বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে—৫৫০ জন। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ২৯৫, খুলনায় ২২১, বরিশালে ২১৩, রাজশাহীতে ১৪৮, ময়মনসিংহে ৮৩, রংপুরে ৬৭ এবং সিলেটে ১৯ জন ভর্তি হয়েছেন।
আক্রান্তের এই বিস্তৃতি দেখাচ্ছে, ডেঙ্গু এখন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা নয়; দেশের বিভিন্ন বিভাগেই রোগীর চাপ রয়েছে। ফলে হাসপাতালের প্রস্তুতির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ ও রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
মৃত্যুর বড় অংশ সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৭১ জন। তাঁদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮০ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫ হাজার ৮৩৯ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ৪৫২ জন।
মৃত্যুর মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নভেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনেই ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে অক্টোবর মাসে ১৭৪ জন এবং সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। অর্থাৎ শুধু সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেই মারা গেছেন ৩২২ জন, যা চলতি বছরের মোট মৃত্যুর বড় অংশ।
এই পরিসংখ্যান ডেঙ্গুর মৌসুমি প্রকোপের পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকতার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরে। বর্ষা শেষ হওয়ার পরও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি থাকায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি এবং আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করার কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা পর্যালোচনা জরুরি।
হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেলেও চাপ কমেনি
চলতি বছরে আক্রান্তদের মধ্যে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮০ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। তবে বর্তমানে ৫ হাজার ৮৩৯ জন চিকিৎসাধীন। প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষ করে ঢাকা বিভাগে এক দিনে ৫৫০ জনের ভর্তি হওয়া রাজধানী ও আশপাশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপের ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী ভর্তি হয়েছেন। ফলে রোগী ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ এবং চিকিৎসক-নার্সের প্রস্তুতি সব বিভাগেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৩ সালের রেকর্ডের পরও উদ্বেগ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০০০ সাল থেকে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য সংরক্ষণ করছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। একই বছর এ রোগে মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন, যা দেশের ডেঙ্গুর ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সে বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজারের বেশি। চলতি বছরের ৫ নভেম্বরেই মৃত্যুর সংখ্যা ৪৫২ হওয়ায় গত বছরের মোট মৃত্যুর তুলনায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
নিয়ন্ত্রণে শুধু মৌসুমি অভিযান যথেষ্ট নয়
ডেঙ্গুর এই ধারাবাহিক প্রকোপ দেখাচ্ছে, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পর হাসপাতালকেন্দ্রিক ব্যবস্থা জোরদার করাই যথেষ্ট নয়। সংক্রমণ কমাতে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোন এলাকায় রোগী বেশি শনাক্ত হচ্ছে, সেই তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগে রোগী ভর্তির সংখ্যাও স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। শুধু নগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়েও নিয়মিত কার্যক্রম চালাতে হবে।
এ ছাড়া আক্রান্ত রোগীর দ্রুত শনাক্তকরণ ও জটিলতা দেখা দিলে সময়মতো চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাও মৃত্যুহার কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে চলতি বছরের মৃত্যুর সংখ্যা ও মাসভিত্তিক প্রবণতা বিবেচনায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান কার্যক্রমের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
নভেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনেও ৩৩ জনের মৃত্যু প্রমাণ করছে, বর্ষা শেষ হলেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না। তাই সাময়িক অভিযান নয়, বছরজুড়ে মশা নিয়ন্ত্রণ, রোগ নজরদারি এবং হাসপাতালের প্রস্তুতি বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।























