বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
নিয়ম ভেঙে ৫ বোনাস, ১১৬ কোটি টাকা ফেরতের নির্দেশেও নীরবতা

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৫৮:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে
সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বছরে সর্বোচ্চ তিনটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার নীতিমালা ছিল। কিন্তু সেই সীমা উপেক্ষা করে ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য দেওয়া হয়েছে পাঁচটি বোনাস। অর্থাৎ অনুমোদিত সীমার বাইরে বাড়তি দুটি।
এই সিদ্ধান্তের আর্থিক দায় এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৬ কোটি টাকা।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই অর্থ দেওয়ার পর সেটি ফেরত নেওয়ার নির্দেশও এসেছে। কিন্তু নির্দেশ জারির প্রায় দেড় বছর পরও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে সেই টাকা আদায় করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি।
বরং ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এখন সরকারকে দেওয়া অর্থ ‘মেনে নেওয়ার’ অনুরোধ করছে।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে—নীতিমালায় যেখানে তিনটির বেশি বোনাসের সুযোগই ছিল না, সেখানে পাঁচটি বোনাস অনুমোদন হলো কীভাবে? আপত্তি ওঠার পরও কেন অর্থ বিতরণ করা হলো? আর ফেরতের নির্দেশের পরও কেন ১১৬ কোটি টাকা উদ্ধার করা গেল না?
ঘটনার নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এখনো মেলেনি।
তিনটির সীমা, বোনাস দেওয়া হলো পাঁচটি
রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস দেওয়ার নিজস্ব নীতিমালায় সর্বোচ্চ তিনটি বোনাসের সুযোগ ছিল।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নীতিমালাতেও একই সীমা ছিল।
অর্থাৎ ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালা এবং সরকারি নির্দেশনা—দুই জায়গাতেই তিনটির বেশি বোনাস দেওয়ার সুযোগ ছিল না।
তারপরও ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য ব্যাংকের প্রায় ২১ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পাঁচটি বোনাস দেওয়া হয়।
একটি বোনাসের পরিমাণ সাধারণত এক মাসের মূল বেতনের সমান। ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একটি বোনাসের আকার প্রায় ৬০ কোটি টাকা।
সে হিসাবে বাড়তি দুটি বোনাসের আর্থিক মূল্য প্রায় ১১৬ কোটি টাকা।
চাপের মুখে পর্ষদের সিদ্ধান্ত
ঘটনার পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের আগস্টের অস্থির সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই দিন পর, ৭ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আফজাল করিমকে একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী অবরুদ্ধ করেন বলে ব্যাংক সূত্রে জানা যায়।
তাঁদের দাবি ছিল—বছরে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দিতে হবে।
এরপর বোনাসের দাবিতে আন্দোলন চলতে থাকে।
এই চাপের মধ্যেই ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ পাঁচটি বোনাস অনুমোদন করে। ২০ আগস্ট চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেন।
কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি বিষয়টি।
বোনাস দেওয়ার পরই শুরু হয় সরকারি নীতিমালা, ব্যাংকের নিজস্ব বিধি এবং নিরীক্ষা আপত্তির প্রশ্ন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিতে কী আছে?
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরি করে বিষয়টি পর্যালোচনা করে।
এরপর ২০২৫ সালের ১১ মার্চ সোনালী ব্যাংকের এমডিকে পাঠানো চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, ২০২৩ সালের জন্য পাঁচ উৎসাহ বোনাস বাবদ ব্যাংক প্রায় ২৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে।
একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জন্য আরও প্রায় ৪০০ কোটি টাকা সংস্থান রাখা হয়েছিল বলে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে আসে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়—সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালাতেও তিনটির বেশি বোনাসের সুযোগ ছিল না।
অর্থাৎ বাড়তি দুটি বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু সরকারি নীতিমালাই নয়, ব্যাংকের নিজস্ব বিধিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
‘আপত্তি উঠলে টাকা ফেরত দিতে হবে’—তারপরও কেন দেওয়া হলো?
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত সোনালী ব্যাংকের ৮৭০তম পর্ষদ সভায় পাঁচটি বোনাস দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
তবে এই অনুমোদন ছিল শর্তসাপেক্ষ।
পর্ষদের সিদ্ধান্তে বলা হয়, ভবিষ্যতে নিরীক্ষা বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে আপত্তি উঠলে বাড়তি অর্থ ফেরত দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত অঙ্গীকারনামাও নেওয়ার কথা ছিল।
এখানেই তৈরি হয়েছে আরেকটি প্রশ্ন—
যখন পর্ষদ নিজেই জানত যে ভবিষ্যতে আপত্তি উঠতে পারে এবং বাড়তি অর্থ ফেরত দিতে হতে পারে, তখন নীতিমালার বাইরে থাকা বোনাস কেন বিতরণ করা হলো?
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকারি অনুমোদন পাওয়ার আগেই কেন অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হলো?
সরকারের ‘না’, ব্যাংকের ক্ষমা প্রার্থনা
বোনাস দেওয়ার পর সোনালী ব্যাংক বিষয়টি অনুমোদনের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আবেদন করে।
একই সঙ্গে নীতিমালা লঙ্ঘনের জন্য ক্ষমাও চায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ নিজের নীতিমালা অতিক্রম করে পাঁচটি বোনাস অনুমোদন করেনি।
বরং ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ সোনালী ব্যাংকের এমডিকে চিঠি দিয়ে বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সেই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও করতে বলা হয়।
কিন্তু নির্দেশের পরও টাকা ফেরত নেওয়া হয়নি।
দেড় বছর পর আবার চিঠি
বিষয়টি এখানেই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি করছে।
২০২৫ সালের মার্চে ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তারপরও প্রায় দেড় বছর কেটে গেছে।
এরপর গত ১১ সেপ্টেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আবার সোনালী ব্যাংকের এমডিকে চিঠি দিয়েছে।
চিঠিতে ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিষয়ে অসম্মতি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে নীতিমালার বাইরে দেওয়া বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করে সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ প্রথম নির্দেশের পরও অর্থ আদায় না হওয়ায় বিষয়টি আবারও সামনে আনতে হয়েছে মন্ত্রণালয়কে।
১১৬ কোটি টাকা কি এখন ফেরত আসবে?
সোনালী ব্যাংকের বর্তমান এমডি ও সিইও শওকত আলী খান বলেছেন, পাঁচ বোনাসের সিদ্ধান্ত তিনি ব্যাংকে যোগ দেওয়ার আগেই নেওয়া হয়েছিল।
তার ভাষ্য, যেহেতু অর্থ ইতিমধ্যে পরিশোধ হয়ে গেছে, তাই সরকারকে তা মেনে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে ব্যাংক। নতুন করেও একই অনুরোধ জানানো হবে।
এই অবস্থানই ফের একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—
একবার কর্মীদের হাতে চলে যাওয়া অর্থ কি শুধু পরিশোধ হয়ে যাওয়ার কারণেই বৈধ হয়ে যাবে?
নীতিমালা লঙ্ঘনের বিষয়টি যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে অর্থ ফেরতের সরকারি নির্দেশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার?
আর প্রায় ২১ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছ থেকে ১১৬ কোটি টাকা কীভাবে আদায় হবে—তারও কোনো স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
‘মব’ করে বোনাস আদায়ের অভিযোগ
ব্যাংকের একজন পরিচালক বিষয়টিকে আরও কঠিনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তার ভাষ্য, একশ্রেণির কর্মচারী ‘মব’ করে বোনাস আদায় করায় পুরো ব্যাংক জটিলতায় পড়েছে।
তার মতে, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এর সহজ সমাধান নেই। আবার কর্মীদের পকেটে চলে যাওয়া অর্থ বাস্তবে ফেরত আনার সম্ভাবনাও কম।
এই বক্তব্য অবশ্য পরিচালকের ব্যক্তিগত মতামত। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব প্রশ্ন সামনে আনে—নীতিমালার বাইরে সুবিধা আদায়ের জন্য কর্মীদের চাপ এবং সেই চাপের কাছে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা ভবিষ্যতে কী নজির তৈরি করবে?
বোনাসের সঙ্গে পারফরম্যান্সের সম্পর্ক কোথায়?
উৎসাহ বোনাসের মূল উদ্দেশ্য কর্মীদের ভালো পারফরম্যান্সে উৎসাহ দেওয়া। কিন্তু নতুন সরকারি নির্দেশনা সেই ধারণাকে আরও নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এনেছে।
২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ নতুন নির্দেশিকা জারি করে।
এতে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বোনাস নির্ধারণে নির্দিষ্ট আর্থিক সূচক ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়।
সোনালী ব্যাংকসহ ছয়টি রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে পাঁচটি সূচক বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে—
১. চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হার
২. আমানত বৃদ্ধির হার
৩. ঋণ ও অগ্রিম বৃদ্ধির হার
৪. শ্রেণিকৃত ঋণ থেকে নগদ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে আদায়ের হার
৫. অবলোপনকৃত ঋণ থেকে নগদ আদায়ের হার
এর মধ্যে চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মোট নম্বরের ওপর নির্ভর করবে বোনাসের সংখ্যা। সর্বোচ্চ তিনটি বোনাস পাওয়ার সুযোগ থাকবে, আর পারফরম্যান্স কম হলে বোনাসের সংখ্যাও কমবে।
অর্থাৎ নতুন কাঠামোয় বোনাসের সঙ্গে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণ আদায়ের ফলাফলকে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে।
পুরোনো সিদ্ধান্তের দায় কে নেবে?
সোনালী ব্যাংকের ১১৬ কোটি টাকার ঘটনাটি তাই শুধু একটি বোনাস বিতরণের ঘটনা নয়।
এখানে অন্তত চারটি স্তরের প্রশ্ন রয়েছে।
প্রথমত, নীতিমালায় তিনটির বেশি বোনাসের সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও পাঁচটি অনুমোদন হলো কীভাবে?
দ্বিতীয়ত, সরকারি অনুমোদন ছাড়াই কেন অর্থ বিতরণ করা হলো?
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের আপত্তির পরও কেন অর্থ ফেরত নেওয়া হয়নি?
চতুর্থত, যাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাঁদের জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত হয়েছে?
এখন পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু মূলত টাকা ফেরত নেওয়া হবে কি না—সেখানে আটকে আছে। কিন্তু নীতিমালা ভেঙে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় কার কী ভূমিকা ছিল, সেই প্রশ্নটির নিষ্পত্তি স্পষ্ট নয়।
একটি বোনাসের নজির, নাকি বড় ব্যবস্থাপনা সংকেত?
সোনালী ব্যাংকের ঘটনা রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোতে বেতন-ভাতার বাইরে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার সংস্কৃতি নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
যদি ব্যাংকের আর্থিক ফলাফল, ঋণ আদায় কিংবা মুনাফার সঙ্গে বোনাসের সরাসরি সম্পর্ক থাকে, তাহলে কর্মীদের উৎসাহ দেওয়ার যুক্তি তৈরি হয়।
কিন্তু নীতিমালায় সীমা নির্ধারিত থাকার পরও চাপের মুখে সেই সীমা অতিক্রম করা হলে প্রশ্নটি আর শুধু বোনাসের থাকে না।
তখন বিষয়টি দাঁড়ায় প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে।
সোনালী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এখন দেখার বিষয়—আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের দ্বিতীয় দফা নির্দেশের পর প্রায় ১১৬ কোটি টাকা আদায় করা হয় কি না, এবং নীতিমালার বাইরে পাঁচটি বোনাস দেওয়ার সিদ্ধান্তের দায় নির্ধারণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না।
কারণ টাকা বিতরণের সিদ্ধান্ত একবার হয়ে গেছে। এখন পরীক্ষাটি অন্য জায়গায়—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়ম ভাঙার পর সেই নিয়ম বাস্তবে ফিরিয়ে আনা যায় কি না।


























