মাদক কারবারে নেতাদের সম্পৃক্ততা থাকলেও হাত কাঁপানো যাবে না: আইনমন্ত্রী

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:৫৮:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
মাদক কারবারি ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন বিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মাদক কারবারের সঙ্গে বা মাদকের গডফাদার হিসেবে সরকারদলীয় কিংবা বিরোধী কোনো নেতার সম্পৃক্ততা থাকলে, তাকে ধরতেও যেন আপনাদের হাত না কাঁপে।’
‘অভিযোগ থাকলে আইনের আওতায় আনবেন’
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তাকে আইনের আওতায় আনবেন। তিনি যত শক্তিশালীই হোন না কেন, এমনকি আমি যে রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য, সেই বিএনপির কোনো শক্তিশালী নেতাও যদি তাকে পৃষ্ঠপোষকতা করার চেষ্টা করেন, তার ব্যাপারেও আপনারা জিরো টলারেন্স দেখাবেন। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। এখানে কোনো পক্ষপাত নেই।’
তিনি আরও বলেন, অভিযোগ থাকার পরও তা উপেক্ষা করা যাবে না। কাউকে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। আদালত থেকে কেউ জামিন পেলে সেটি তার অধিকার; তবে জামিন পাওয়ার পর সে বাইরে ঘুরে বেড়াবে, খুন করবে আর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সাহস পাবে না—এমন পরিস্থিতি মেনে নেওয়া হবে না।
নিজের এলাকার নেতার গ্রেপ্তারের উদাহরণ
নিজ এলাকার একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, গত সপ্তাহে তার একটি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও কারবারে সম্পৃক্ততার অভিযোগ পায় পুলিশ।
তিনি বলেন, পুলিশ বিষয়টি তাকে জানানোর পর তিনি গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। তার ভাষায়, ওই ব্যক্তি বিএনপি না করে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল করলেও একই ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে পুলিশ যে ব্যবস্থা নিত, এখানেও সেটিই করা উচিত।
আইনমন্ত্রী জানান, ওই নেতাকে গ্রেপ্তারের পর মাদক সেবনের পরীক্ষায় তার ফল পজিটিভ আসে। পরে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ায় তাকে এক বছরের সাজা দেওয়া হয়।
‘রাজনৈতিক কর্মী হতে হলে নৈতিকভাবে স্বচ্ছ হতে হবে’
ওই নেতার সঙ্গে তার রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, তিনি তার নির্বাচনী কাজে সবচেয়ে বেশি নিবেদিত ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। তবে একজন সত্যিকারের রাজনৈতিক কর্মীর প্রথম শর্ত নৈতিকভাবে স্বচ্ছ থাকা।
তিনি বলেন, জনগণের কাছে কোনো রাজনৈতিক কর্মীকে পাঠানোর সময় মানুষ যেন বিশ্বাস করতে পারে, তিনি মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলতে এসেছেন। অথচ তিনি নিজেই মাদকমুক্ত নন—এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে মাদকের সঙ্গে জড়িত বা সম্পৃক্ত যে বা যারাই থাকুক, সবার ক্ষেত্রেই জিরো টলারেন্স। যত বড় নেতাই হোক, সেটা আমরা দেখব।’
‘মাদক কারবারিদের কারণে কোনো দলের প্রতি বিরূপ ধারণা নয়’
বাগেরহাটের মানুষের মধ্যে মাদক কারবারিদের কারণে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি বিরূপ ধারণা তৈরি হোক, তা চান না বলে জানান আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘বাগেরহাট জেলায় ১০ জন লোক মাদক বিক্রি করে। আমি যদি এভাবে ধরি যে, এই ১০ জনই বিএনপি করে, তাহলে এই ১০ জনের কারণে বাগেরহাট জেলার ১০ হাজার মানুষ আমাকে ঘৃণা করবে। এই ১০ জনের কারণে বাগেরহাট জেলার ১০ হাজার মানুষ বিএনপিকে অপছন্দ করবে। আমরা রাজনৈতিক দল হিসেবে, সরকার হিসেবে এই ঝুঁকি নেব না।’
মাদকের কারবারের পেছনে কোনো রাজনৈতিক নেতা থাকলে তাদেরও সতর্ক করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জামিনে হস্তক্ষেপ হলে কঠোর ব্যবস্থা
আদালতে জামিনের বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, জামিন দেওয়া বা না দেওয়া আদালতের বিষয়। তবে ন্যায়বিচারকে প্রভাবিত করে জামিন নেওয়া, দেওয়ার চেষ্টা কিংবা জামিন ঠেকানোর চেষ্টা করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
গত ১৭ বছরের নির্যাতনের অভিযোগ
সভায় গত ১৭ বছরে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, ওই সময়ে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে মানুষকে ধরে নিয়ে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে, যাকে ‘ক্রসফায়ার’ বলা হয়েছে।
তার দাবি, ওই সময়ে চার হাজারের বেশি বিএনপি নেতাকর্মীকে গুম ও ক্রসফায়ার দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া ১৬-১৭ বছরে প্রায় ৭০০ বিএনপি নেতাকর্মী গুম হয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন আইনমন্ত্রী।
সভায় বাগেরহাটের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদের প্রশাসক, বাগেরহাট মেডিকেল ফাউন্ডেশনের নেতা, জেলা প্রশাসক, পুলিশ প্রশাসন, আইনজীবী সমিতির নেতা, জেলা বিএনপির নেতাসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।





















