অভিযোগের পাহাড়, তদন্তের প্রশ্ন: আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানে যা জানা যাচ্ছে

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৩৮:০৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
একদিকে হাজার কোটি টাকা পাচার, নিয়োগ-বদলি, টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ; অন্যদিকে এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে এখন সামনে এসেছে একটি বড় প্রশ্ন—দুদকের হাতে থাকা অভিযোগগুলোর ভিত্তি কতটা শক্ত, আর তদন্ত কোন পথে এগোচ্ছে?
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বলছে, এটি কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে পরিচালিত তদন্ত নয়। তবে অভিযোগের বিস্তারিত কিংবা তদন্তের প্রাথমিক অগ্রগতি নিয়ে এখনই মুখ খুলতে নারাজ সংস্থাটি।
দুদকের সচিব সাইদুর রহমান খান সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত ‘টার্গেটেড’ নয়। কমিশন দীর্ঘদিন মুলতবি থাকা অভিযোগগুলো পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করছে।
তবে অভিযোগের ধরন, প্রমাণের উৎস কিংবা তদন্তের নির্দিষ্ট বিষয় জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য এড়িয়ে যান।
অভিযোগের শুরু কোথা থেকে?
দুদকের তথ্যমতে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, সরকারি নিয়োগে আর্থিক লেনদেন, উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম এবং টেন্ডার থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ এসেছে।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ।
৩৬ জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে বিভিন্ন টেন্ডারে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ।
গ্রামীণ অবকাঠামো ও সেতু প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ।
শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বাড়ানোর অভিযোগ।
ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
দুদকের নথিতে উল্লেখ করা অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগ সংক্রান্ত চারটি অভিযোগেই মোট অর্থের পরিমাণ ১৮৭ কোটি টাকার বেশি।
তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি দুদক।
১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: প্রমাণ কোথায়?
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো বিদেশে অর্থ পাচার।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে— দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি টাকা,সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মোট অর্থ পাচারের পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।
এছাড়া পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখার অভিযোগও আনা হয়েছে।
তবে এসব সম্পদের অস্তিত্ব, মালিকানা বা অর্থের উৎস সম্পর্কে এখনো প্রকাশ্যে কোনো যাচাই করা তথ্য দেয়নি দুদক।
পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
দুদকের অভিযোগে আসিফ মাহমুদের পরিবারের কয়েকজন সদস্য ও ঘনিষ্ঠদের নামও এসেছে।
অভিযোগ করা হয়েছে, তার দুই বোনজামাই ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার হয়েছে। এছাড়া তার বাবা বিল্লাল হোসেন এবং ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় প্রশাসনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
তার পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা প্রমাণ প্রকাশ করেনি দুদক।
দুদকের অবস্থান: ‘কাউকে টার্গেট করা হচ্ছে না’
দুদকের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনভাবে কাজ করছে।
সচিব সাইদুর রহমান খান বলেন, কোনো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব দুদকের কার্যক্রমে নেই।
তার ভাষ্য, অভিযোগ থাকলে সাবেক উপদেষ্টা কিংবা অন্য যে কারও বিরুদ্ধেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, কমিশন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেছে এবং পর্যায়ক্রমে সব অভিযোগ পরীক্ষা করা হচ্ছে।
আসিফের পাল্টা যুক্তি: ‘প্রমাণ দিলে রাজনীতি ছাড়ব’
অভিযোগের পর সোমবার সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন আসিফ মাহমুদ।
তিনি বলেন, বিদেশে তার এক টাকাও বিনিয়োগের প্রমাণ কেউ দিতে পারলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন।
তার দাবি, এসব অভিযোগ তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে ছড়ানো হচ্ছে।
বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযোগে উল্লেখ করা অর্থের পরিমাণ একটি ফেসবুক পেজের পুরোনো পোস্টের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। তিনি ওই পেজকে আওয়ামী লীগের ‘প্রচারপেজ’ বলেও দাবি করেন।
আসিফ প্রশ্ন তোলেন, “দুদক ওই উৎস থেকে তথ্য নিয়েছে, নাকি ওই উৎস দুদকের তথ্য ব্যবহার করেছে—তা পরিষ্কার নয়।”
মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্প নিয়ে ব্যাখ্যা
শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির অভিযোগও অস্বীকার করেছেন আসিফ মাহমুদ।
তার দাবি, প্রকল্পের পরিধি বাড়ার কারণেই ব্যয় বেড়েছে।
তিনি বলেন, শুরুতে সীমিত সংখ্যক স্টেডিয়ামের পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা প্রায় সব উপজেলায় সম্প্রসারণ করা হয়। জমি অধিগ্রহণ ও অবকাঠামোগত সুবিধা যুক্ত হওয়ায় ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
তার প্রশ্ন, প্রকল্পে দুর্নীতির প্রমাণ থাকলে তা বন্ধ করে তদন্ত করা হোক।
তদন্তের সামনে এখন যেসব প্রশ্ন
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—
১. অভিযোগগুলোর উৎস কী?
দুদক কি নিজস্ব অনুসন্ধানে তথ্য পেয়েছে, নাকি অন্য কোনো উৎস থেকে অভিযোগ এসেছে?
২. অর্থ পাচারের প্রমাণ কী?
অভিযোগে বিশাল অঙ্কের অর্থের কথা বলা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বা লেনদেনের তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
৩. তদন্ত কতদূর এগিয়েছে?
দুদক তদন্ত দল গঠনের কথা জানিয়েছে, তবে প্রমাণ সংগ্রহ বা জিজ্ঞাসাবাদের অগ্রগতি জানা যায়নি।
৪. রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ কতটা সত্য?
আসিফ মাহমুদ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুললেও তার পক্ষেও এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুতর। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এসব অভিযোগকে অপরাধ হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
এখন মূল বিষয় হলো—দুদক কতটা নিরপেক্ষভাবে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে এবং তদন্ত শেষে কী সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বাইরে, প্রমাণই নির্ধারণ করবে এই অনুসন্ধানের প্রকৃত ফল।


























