‘সিন্ডিকেট’ ভেঙে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলছে, ১০ হাজার কর্মী যাবেন বিনা খরচে

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:০১:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ১৪ বার পড়া হয়েছে
দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে অবশেষে নতুন কাঠামোয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। আগের আমলের দুর্নীতি, অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ পেছনে ফেলে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা এবং প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়া একটি বড় সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে।
তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে গতি
মন্ত্রণালয় জানায়, শ্রমবাজার পুনরায় চালুকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইস্কান্দারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেন।
সরকারের দাবি, ধারাবাহিক উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতার ফলেই বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ফের উন্মুক্ত করার পথ তৈরি হয়েছে।
২৫ এজেন্সির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরও ৩১২টি
২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বরের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ের একক ক্ষমতা মালয়েশিয়া সরকারের হাতে। দেশটির বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার মধ্যেই বাংলাদেশের স্বার্থ নিশ্চিত করতে আলোচনা চালিয়েছে বর্তমান সরকার।
মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও নেপালের জন্য ২৫টি করে এবং পাকিস্তান, ভারত ও মিয়ানমারের জন্য ১০টি করে রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত ২৫টি এজেন্সি অন্তর্বর্তী সরকারের করা ৪২৩টি এজেন্সির তালিকায় ছিল। তবে সরকারের অনুরোধে আগের আমলে সুবিধাভোগী ও সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের বাদ দিয়ে বাকি এজেন্সিগুলোকে সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
দীর্ঘ ছয় মাসের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর সরাসরি নির্বাচিত ২৫টি এজেন্সির পাশাপাশি আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি’ হিসেবে কাজের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলসহ মোট ৩৩৮টি এজেন্সি এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছে।
এই যাচাই-বাছাই করেছে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি।
১০ হাজার কর্মী যাবেন ‘জিরো কস্টে’
নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চমক—প্রথম ধাপে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
বিমানভাড়াসহ অভিবাসনসংক্রান্ত সব ব্যয়মুক্ত এই কর্মীদের প্রথম বহর সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-এর মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হবে।
অর্থাৎ নতুন করে শ্রমবাজার চালুর প্রথম ধাপেই দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ বন্ধ করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
মেডিকেলেও বদল, বাদ বিতর্কিত সেন্টার
শ্রমবাজার দ্রুত চালুর জন্য বিদ্যমান তালিকা থেকে বিতর্কিত ও আগের আমলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেডিকেল সেন্টারগুলো বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে অবশিষ্ট ১৬টি অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার দিয়ে কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এরপর মালয়েশিয়ার তিন মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে নতুন নীতিমালার আলোকে মেডিকেল সেন্টারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা চূড়ান্ত করবে।
কর্মীদের জন্য ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল
শুধু বিদেশে পাঠানো নয়, কর্মীরা সেখানে গিয়ে যাতে হয়রানি বা প্রতারণার শিকার না হন, সেদিকেও নজর দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ, সরাসরি নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানে যোগদান, নিয়মিত বেতন-ভাতা, আবাসন ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল ও হেল্পডেস্ক চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এখনই টাকা দেবেন না
তবে শ্রমবাজার খোলার খবরে দালাল বা প্রতারকচক্রের ফাঁদে না পড়তে দেশবাসীকে সতর্ক করেছে মন্ত্রণালয়।
সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি না হওয়া পর্যন্ত কোনো আর্থিক লেনদেন, মেডিকেল পরীক্ষা বা পাসপোর্ট জমা দেওয়া যাবে না। কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হলে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হবে।
দীর্ঘদিনের বিতর্কিত সিন্ডিকেট-নির্ভর ব্যবস্থার বদলে ৩৩৮ এজেন্সিকে যুক্ত করা, প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে জিরো কস্টে পাঠানো এবং ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে এবার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে স্বচ্ছ ও কম খরচের নতুন মডেল দাঁড় করানোর লক্ষ্য সরকারের।























