ব্যাংক খাতের লুটপাট: আলোচনায় ৬ ব্যক্তি ও শিল্পগোষ্ঠী
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:১০:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬ ৮৮ বার পড়া হয়েছে
দেশের ব্যাংকিং খাতে গত এক দশকে যে বিপুল পরিমাণ অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ উঠে এসেছে—তার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন কয়েকটি প্রভাবশালী ব্যক্তি ও শিল্পগোষ্ঠীর নাম। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি অভ্যন্তরীণ ও শ্বেতপত্র-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, মোট ২৮টি ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় অন্তত ৬ ব্যক্তি ও শিল্পগোষ্ঠীর প্রভাবকে দায়ী করা হয়েছে।
প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে যাদের নাম উঠে এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছে S Alam Group, Beximco Group, Orion Group, Nassa Group এবং Sikder Group। পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে সাবেক ভূমিমন্ত্রী Saifuzzaman Chowdhury-এর নামও আলোচনায় এসেছে।
কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো ব্যাংক খাত
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি—দুই ধরনের ব্যাংকই ব্যাপক চাপের মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে Bangladesh Bank–এর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার দুর্বলতা ও নীতিগত শিথিলতার সুযোগ নিয়ে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর তালিকায় রয়েছে: রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক। এছাড়া ইসলামী ধারার ব্যাংক যেমন ইসলামী ব্যাংক, এসআইবিএল, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক।বেসরকারি খাতের ইউসিবি, আইএফআইসি ও ন্যাশনাল ব্যাংক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় নীতিমালা উপেক্ষা, পুনঃতফসিল সুবিধার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।
অর্থ পাচার ও দুর্বল নজরদারি
প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হিসেবে উঠে এসেছে অর্থ পাচারের বিষয়টি। শ্বেতপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঋণের বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এখন সেই অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দাবি করছে।
তবে অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়—দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে একই চক্র আবার সক্রিয় হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান
Bangladesh Bank বলছে, পূর্ববর্তী সময়ে বিভিন্ন “চাপ ও প্রভাবের কারণে” কিছু সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিল তারা। প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে বহিরাগত প্রভাব এবং উচ্চপর্যায়ের চাপ কাজ করেছে, যার ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া
অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ব্যাংকিং খাতের এ সংকট শুধুই আর্থিক নয়—এটি একটি শাসন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থতার প্রতিফলন।
তাদের মতে— ঋণ নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন জরুরি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার প্রয়োজন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, “অর্থ পাচার ও ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি” নিশ্চিত করতে হবে
ব্যাংকিং খাতের এই অনিয়ম এখন শুধু আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়, বরং পুরো অর্থনীতির আস্থার সংকট তৈরি করেছে। নিয়ন্ত্রণহীন ঋণ প্রবাহ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নজরদারির দুর্বলতা মিলিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—তা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কঠোর তদন্ত, বিচার এবং কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই।
বিআইবিএম-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেছেন, ঋণ বিতরণ, মেয়াদ ও সীমা—সবই নির্ধারিত নীতিমালার আওতায় পরিচালিত হয়। তাই বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে অতিরিক্ত সুবিধা বা ওয়েভার দেওয়া হলে তার দায়ভার বাংলাদেশ ব্যাংককেও নিতে হবে।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, “এসব নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্বই তো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। শুধু ব্যাংক বা বড় গোষ্ঠীর ওপর দায় ছেড়ে দেওয়া যায় না।”
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের কারণে বিগত সময়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে তারা বাধ্য হয়েছিল, যা পরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের সুযোগ তৈরি করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, “বিভিন্ন সময় বহিরাগত প্রভাব এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে চাপ ছিল। অনেক ক্ষেত্রে এসব উপেক্ষা করার সক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থারও সীমিত ছিল।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং সংশ্লিষ্ট অনিয়মের উৎস চিহ্নিত করতে কাজ চলছে।
এই বক্তব্য ঘিরে ব্যাংক খাতে নিয়ন্ত্রণ, দায় নির্ধারণ এবং অতীত অনিয়মের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

























