৪ হাজার ইউনিয়নের তালিকা পুনরায় যাচাইয়ের নির্দেশ
ইউপি নির্বাচন সামনে রেখে ইসির তোড়জোড়

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৫৯:১৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন ঘিরে প্রস্তুতি জোরদার করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটের সম্ভাব্য সময়সূচি সামনে রেখে নির্বাচন উপযোগী ইউনিয়নের তালিকা, সীমানা, আইনি জটিলতা এবং ভোটকেন্দ্রের তথ্য পুনরায় যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে কমিশন। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নতুন নির্দেশনা দেওয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রস্তুতির প্রশাসনিক ধাপ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে শুধু ভোটের তারিখ নির্ধারণই বড় বিষয় নয়; কোন ইউনিয়নে নির্বাচন করা সম্ভব, কোথায় সীমানা বা মামলা-সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে এবং ভোটার তালিকা পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন আছে কি না—এসব বিষয়ও সময়মতো নিষ্পত্তি করা জরুরি। এসব তথ্যের কোনো অসংগতি থাকলে নির্বাচনী তফসিল ও পরবর্তী কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ইসির উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন দেশের সব জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে এ-সংক্রান্ত চিঠি পাঠান। এতে নির্বাচন উপযোগী ইউনিয়ন পরিষদের তালিকা পুনরায় যাচাই করে সঠিক তথ্য পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, আসন্ন ইউপি নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট জেলার সব উপজেলার নির্বাচন উপযোগী ইউনিয়ন পরিষদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ তালিকা তৈরি হয়েছে। তবে তালিকায় কোনো ইউনিয়নের নাম বাদ পড়েছে কি না, সব নির্বাচন উপযোগী ইউনিয়ন সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না এবং সীমানা ও আইনি জটিলতার সর্বশেষ তথ্য যুক্ত রয়েছে কি না, তা আবারও যাচাই করতে হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যাচাই-বাছাই শেষে ইউনিয়ন পরিষদের নাম, তারিখ, মামলা, সীমানাসংক্রান্ত জটিলতা, ভোটার তালিকা পুনর্বিন্যাস কিংবা অন্য কোনো বিষয়ে সংশোধনের প্রয়োজন হলে আগামী ৮ নভেম্বরের মধ্যে সংশোধিত তথ্য নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়-৩ শাখায় পাঠাতে হবে।
পাঁচ ধাপে ভোটের পরিকল্পনা
ইসি সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণের মধ্য দিয়ে ইউপি নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ নির্বাচনের তফসিল আগামী ১০ ডিসেম্বর ঘোষণা করা হতে পারে। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাঁচ ধাপে স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
দেশে বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৮০টি। এর মধ্যে চলতি বছর ৩ হাজার ৯৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন উপযোগী হবে। বাকি ইউনিয়ন পরিষদগুলোর নির্বাচন উপযোগী হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০২৭ ও ২০২৮ সাল। অর্থাৎ সব ইউনিয়নে একসঙ্গে ভোট আয়োজনের সুযোগ নেই; মেয়াদ, নির্বাচন উপযোগিতা ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ধাপে ধাপে নির্বাচন করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে ইউনিয়নভিত্তিক তথ্যের নির্ভুলতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ইউনিয়ন ভুলবশত তালিকা থেকে বাদ পড়লে কিংবা মামলা বা সীমানা বিরোধের হালনাগাদ তথ্য অন্তর্ভুক্ত না হলে নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণে অসামঞ্জস্য দেখা দিতে পারে। তাই ৮ নভেম্বরের মধ্যে তথ্য সংশোধনের সময়সীমাকে নির্বাচনী প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষ প্রস্তুত
নির্বাচন আয়োজনের আরেকটি বড় প্রস্তুতি হিসেবে ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষের তালিকাও চূড়ান্ত করেছে ইসি। এবার মোট ৪৬ হাজার ৩৯৭টি ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে স্থায়ী ভোটকেন্দ্র ৪৫ হাজার ৯৭২টি এবং অস্থায়ী কেন্দ্র ৪২৫টি।
এসব কেন্দ্রে স্থায়ী ভোটকক্ষ রয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ১৫৯টি এবং অস্থায়ী ভোটকক্ষ ১৩ হাজার ৫৮০টি। সব মিলিয়ে ভোটকক্ষের সংখ্যা ২ লাখ ১৫ হাজার ৭৩৯টি। পাশাপাশি আগামী ২৫ নভেম্বর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে কমিশন। বর্তমানে দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন।
প্রস্তুতির পাশাপাশি নিরপেক্ষতার প্রশ্ন
ইউপি নির্বাচন দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে বিস্তৃত নির্বাচনী আয়োজনগুলোর একটি। বিপুলসংখ্যক ইউনিয়নে ভোট পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক সমন্বয়, সীমানা নির্ধারণ, ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় নির্ভুলতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর প্রভাব, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিরোধের সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে নির্বাচন পরিচালনার প্রস্তুতি নিতে হবে।
নির্বাচন উপযোগী ইউনিয়নের তালিকা পুনরায় যাচাইয়ের নির্দেশ তাই কেবল দাপ্তরিক তথ্য সংশোধনের বিষয় নয়; এটি নির্বাচনের আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তি নিশ্চিত করারও অংশ। তবে তালিকা চূড়ান্ত করা, ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ কিংবা ভোটার সংখ্যা প্রকাশের মধ্যেই নির্বাচন প্রস্তুতির সাফল্য সীমাবদ্ধ নয়। ভোটের পরিবেশ, প্রার্থীদের সমান সুযোগ, ভোটারদের নিরাপত্তা এবং ভোটের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
জানুয়ারিতে প্রথম ধাপের ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাই ও সংশোধন শেষ করার পাশাপাশি নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট বিরোধগুলোও নিষ্পত্তির পথে এগিয়ে নিতে হবে। শেষ পর্যন্ত পাঁচ ধাপের এই নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ভর করবে প্রস্তুতির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কমিশনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার সক্ষমতার ওপর।





















