সংকটের মধ্যেই এলপিজির বাড়তি দামের বোঝা কার ঘাড়ে?
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:২১:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
বাজারে যখন ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারই মিলছে না, কোথাও আবার নির্ধারিত দামের কয়েকশ টাকা বেশি দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না—ঠিক সেই সময়ই নতুন করে দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। অক্টোবর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম একলাফে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।
রোববার (৪ অক্টোবর) নতুন এ দাম ঘোষণা ও কার্যকর হওয়ার পর বাজারে সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ, সরকারি দাম বাড়ানোর আগেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রির অভিযোগ ছিল। কোথাও কোথাও একটি সিলিন্ডারের জন্য ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন শুধু দাম কত বাড়ল, তা নয়; বরং সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকায় ভোক্তা আদৌ এলপিজি পাবেন কি না—সেটিই বড় প্রশ্ন।
দাম বাড়ল, কিন্তু সংকটের কারণ কী?
বিইআরসির হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে বেসরকারি এলপিজির ভোক্তা পর্যায়ের দাম প্রতি কেজি ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে যা ছিল ১৩২ টাকা ৮ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে বেড়েছে ২১ টাকা। এর প্রভাবেই ১২ কেজির সিলিন্ডারে ২৫২ টাকা মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে।
মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের সৌদি কনট্রাক্ট প্রাইস বা সৌদি সিপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিইআরসি জানিয়েছে, অক্টোবর মাসে প্রোপেন ও বিউটেনের গড় সৌদি সিপি প্রতি টন ৭১২ দশমিক ৫০ ডলারে উঠেছে। সেপ্টেম্বরে যা ছিল ৬৪৭ দশমিক ৭৫ ডলার।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির কাঁচামালের দাম বৃদ্ধিকে দেশে মূল্য সমন্বয়ের প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা নিয়েও রয়েছে বড় প্রশ্ন।
আমদানি যথেষ্ট হলে বাজারে সিলিন্ডার নেই কেন?
এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোয়াবের দাবি, সেপ্টেম্বরে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের একাংশের হিসাবে আগস্টে আমদানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন।
যদি আমদানি চাহিদা মেটানোর মতোই হয়ে থাকে, তাহলে খুচরা বাজারে সংকট তৈরি হচ্ছে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
ব্যবসায়ীদের একাংশের অভিযোগ, আমদানি করা কার্গো আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, তারা কোম্পানির কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাচ্ছেন না।
অর্থাৎ উৎপাদনকারী থেকে ডিলার, ডিলার থেকে খুচরা বিক্রেতা—সরবরাহ ব্যবস্থার কোথায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে, সেটিই এখন অনুসন্ধানের বিষয়।
সরকারি দামের সঙ্গে বাজারদরের এত ব্যবধান কেন?
সেপ্টেম্বরে বিইআরসি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু ভোক্তারা সেই দামেও গ্যাস পাননি। বিভিন্ন এলাকায় ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দিয়ে সিলিন্ডার কেনার অভিযোগ ওঠে।
অর্থাৎ সরকারি মূল্য কমলেও বাজারে তার সুফল পৌঁছায়নি। বরং সরবরাহ সংকটের অজুহাতে কোথাও ২ হাজার, কোথাও ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম নেওয়া হয়েছে।
এখন যখন সরকারি দামই ১ হাজার ৮৩৭ টাকা, তখন পুরোনো সংকটকে অজুহাত করে বাজারদর আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে কি না—এ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলমের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই কৃত্রিম সংকটের সুযোগ নিয়ে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। সিলিন্ডারপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়ার প্রবণতাও তিনি তুলে ধরেছেন।
এ অভিযোগ সত্য হলে সমস্যাটি শুধু মূল্যবৃদ্ধির নয়; বরং সরবরাহব্যবস্থা, বাজার তদারকি এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
অটোগ্যাসের দামও বাড়ল, চাপ পড়বে পরিবহনে
এলপিজির পাশাপাশি যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ লিটারপ্রতি বেড়েছে ১১ টাকা ৫৩ পয়সা বা প্রায় ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ।
এর সরাসরি প্রভাব পড়বে অটোগ্যাসচালিত যানবাহনের পরিচালন ব্যয়ে। আর জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে ভাড়া বাড়ানোর দাবি আসার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
এর পরোক্ষ প্রভাব পড়বে পণ্য পরিবহনেও। কৃষিপণ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহনের খরচ বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারেই পড়ে।
অর্থাৎ এলপিজি ও অটোগ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দুটি আলাদা খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি জ্বালানি → পরিবহন → উৎপাদন → পণ্য ও সেবা—একটি চেইন তৈরি করে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
শুধু বাসাবাড়ি নয়, বাড়বে ব্যবসার খরচও
এলপিজি এখন শুধু রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয় না। রেস্তোরাঁ, হোটেল, বেকারি, খাবারের দোকান এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও এর ব্যবহার রয়েছে।
ফলে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারে ২৫২ টাকা বাড়তি খরচ মানে শুধু একটি পরিবারের রান্নার বাজেট বাড়া নয়। একই সঙ্গে বাড়বে রেস্তোরাঁর রান্নার খরচ, বেকারির উৎপাদন ব্যয় এবং বিভিন্ন ব্যবসার পরিচালন ব্যয়।
এরই মধ্যে বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তি। সেখানে রান্নার জ্বালানির ব্যয় আরও বাড়লে ব্যবসায়ীরা সেই অতিরিক্ত ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা করবেন—এটাই স্বাভাবিক।
ফলে একজন ভোক্তা একই সঙ্গে গ্যাসের বাড়তি দাম, পরিবহন ব্যয় এবং খাদ্যপণ্যের বাড়তি দাম—তিন দিক থেকেই চাপের মুখে পড়তে পারেন।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট
সরকারি মূল্য ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় নজরদারির জায়গা হওয়া উচিত বাজারে সরবরাহের স্বাভাবিকতা।
কারণ ইতোমধ্যে জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটররা জানিয়েছেন, বাজারে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে বিক্রির বিষয়ে সতর্ক করেছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জেলা প্রশাসকদের বাজার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—সরকারের কাছে যদি পর্যাপ্ত মজুতের তথ্য থাকে, আমদানিও যদি চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট হয়, তাহলে ভোক্তা পর্যায়ে সংকট কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু খুচরা বাজারে অভিযান চালালেই হবে না। আমদানির পর এলপিজি কোথায় যাচ্ছে, কী দামে ডিপো থেকে বের হচ্ছে, কোন ডিলার কত পরিমাণ পাচ্ছেন এবং শেষ পর্যন্ত খুচরা বিক্রেতা কী দামে বিক্রি করছেন—পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল অনুসরণ করতে হবে।
মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি বাজার তদারকিই এখন মূল চ্যালেঞ্জ
বিইআরসি মূল্য নির্ধারণ করেছে—এটি এক দিক। কিন্তু নির্ধারিত মূল্যে পণ্যটি ভোক্তার হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করা আরেকটি বড় দায়িত্ব।
আগের মাসের অভিজ্ঞতা বলছে, কাগজে দাম নির্ধারণ করলেই বাজারে সেই দাম কার্যকর হয় না। সেপ্টেম্বর মাসে সরকারি দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা, অথচ অনেক ভোক্তাকে তার চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিতে হয়েছে।
তাই অক্টোবরের নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পর যদি আবারও ২ হাজার, ২ হাজার ৫০০ কিংবা ৩ হাজার টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি হয়, তাহলে মূল্যবৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্ত ভোক্তার জন্য আরও বড় সংকটে পরিণত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থায় ডিপো, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি, মজুতের তথ্য যাচাই এবং নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কারণ এলপিজির দাম ২৫২ টাকা বাড়া হয়তো আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মূল্য সমন্বয়ের ফল; কিন্তু সরকারি দামের চেয়ে হাজার টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হলে সেটি আর আন্তর্জাতিক বাজারের সমস্যা থাকে না—সেটি হয়ে যায় দেশের বাজার ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা।
আর সেই ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সাধারণ ভোক্তাকেই।




























