৮৭ টাকার মাল্টা ৫২০! শুল্কের পর বাজারে বাড়তি দামের ‘ঝড়’
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:১৬:৪৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে
বিদেশ থেকে যে মাল্টা বাংলাদেশে ঢুকছে কেজিপ্রতি প্রায় ৮৭ টাকায়, সেই মাল্টাই বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা কেজি। অর্থাৎ আমদানি মূল্যের তুলনায় ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে দাম বেড়ে যাচ্ছে পাঁচ গুণেরও বেশি।
দক্ষিণ আফ্রিকা ও মিসর থেকে আসা হলুদ মাল্টার দামের এই ব্যবধান এখন ভোক্তাদের মধ্যে প্রশ্ন তুলেছে—আমদানি থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত কোন ধাপে কত টাকা যোগ হচ্ছে?
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দামের বড় ধাক্কাটি আসছে আমদানি পর্যায়েই। মাল্টার ওপর বর্তমানে মোট শুল্ক-কর ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ফলে কেজিপ্রতি ৮৭ টাকা আমদানি মূল্যের মাল্টায় শুল্ক-করই পড়ছে প্রায় ১০৭ টাকা। বন্দর থেকে খালাসের সময় কেজিপ্রতি ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৯৩ থেকে ১৯৪ টাকা।
এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে কনটেইনার, বন্দর, পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ। ব্যবসায়ীদের হিসাবে এসব খরচ মিলিয়ে ব্যয় পৌঁছায় প্রায় ২০৪ থেকে ২০৯ টাকা। পচনশীল ফল নষ্ট হওয়া ও অন্যান্য ঝুঁকি হিসাব করলে আমদানিকারকদের প্রকৃত ব্যয় কেজিতে ২৩০ থেকে ২৪০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
কিন্তু সেখানেই শেষ নয়। পাইকারি বাজার পেরিয়ে খুচরা পর্যায়ে এসে সেই মাল্টার দাম ঠেকছে ৫০০ টাকার কাছাকাছি।
করেই দ্বিগুণের বেশি দাম
বাংলাদেশ কাস্টমসের হিসাবে কমলা ও মাল্টাজাতীয় তাজা ফল আমদানিতে মোট করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর।
অর্থাৎ বিদেশে মাল্টার মূল দাম না বাড়লেও বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই করের কারণে এর দাম দ্বিগুণের বেশি হয়ে যাচ্ছে।
আগে করভারও এত বেশি ছিল না। ২০২১-২২ অর্থবছরে মাল্টাসহ কয়েক ধরনের আমদানি করা ফলে মোট করভার ছিল প্রায় ৮৯ শতাংশ। ডলার-সংকটের সময় আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ২০২২ সালের মে মাসে ফলসহ বিভিন্ন পণ্যে ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়।
পরবর্তী সময়ে করভার আরও বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একপর্যায়ে ১৩৬ দশমিক ২০ শতাংশে পৌঁছায়। পরে কিছুটা কমে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশে।
চার বছরে আমদানি প্রায় অর্ধেক
উচ্চ শুল্ক-কর যে আমদানিতে প্রভাব ফেলছে, তার চিত্রও পাওয়া যাচ্ছে পরিসংখ্যানে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে মাল্টা আমদানি হয়েছিল ২ লাখ ৯৪ হাজার টন। শুল্ক-কর বাড়ার পর ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে হয় ২ লাখ ২০ হাজার টন।
এরপর—২০২৩-২৪: ১ লাখ ৭৩ হাজার টন, ২০২৪-২৫: ১ লাখ ৬৮ হাজার টন, ২০২৫-২৬: ১ লাখ ৫৩ হাজার টন। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে মাল্টা আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।
চলতি অর্থবছরেও কমতির ধারা অব্যাহত। প্রথম প্রায় তিন মাসে আমদানি হয়েছে মাত্র ২১ হাজার টন।
পাইকারিতেই দাম উঠেছে ৫০০ টাকায়
আমদানি করা মাল্টা চট্টগ্রাম ও ঢাকার পাইকারি বাজারে যাওয়ার পর শুরু হয় আরেক দফা মূল্যবৃদ্ধি।
চট্টগ্রামের ফলমন্ডির ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র তিন সপ্তাহ আগেও পাইকারিতে মাল্টার দাম ছিল ২২০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি। এরপর সরবরাহ সংকটে দ্রুত বাড়তে থাকে দাম। একপর্যায়ে ১৫ কেজির একটি কার্টন বিক্রি হয়েছে ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকায়। অর্থাৎ পাইকারি দামও উঠে যায় প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজিতে।
গত বুধবার চট্টগ্রামের বিভিন্ন খুচরা বাজারে সেই মাল্টা বিক্রি হয়েছে ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা কেজি।
সরবরাহ কম, সঙ্গে ডেঙ্গুর চাহিদা
মাল্টার দাম বাড়ার পেছনে শুধু কর নয়, সাম্প্রতিক সরবরাহ সংকটও বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত অনেক আমদানিকারক লোকসান করেছেন। ফলে পরবর্তী সময়ে আমদানি কমে যায়। সেপ্টেম্বরে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
এর মধ্যে দেশে বেড়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বছর ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৯ হাজার ৬২০ জন, মারা গেছেন ২৪৫ জন।
ফল ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, জ্বর ও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের পরিবারের মধ্যে মাল্টা ও কমলার মতো ফল কেনার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে সরবরাহ সংকটের সময় বাড়তি চাহিদা দামকে আরও ওপরে ঠেলে দিয়েছে।
‘খুচরায় কেজিতে ১০০ টাকা বেশি’
মাল্টা আমদানিকারক এইচআর করপোরেশনের কর্ণধার মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন বলেন, শুল্ক-কর, বন্দর মাশুল ও কনটেইনার পরিবহনসহ সব ধরনের খরচ বেড়েছে। তবে তাঁর দাবি, আমদানিকারক ও পাইকারি পর্যায়ের দামের তুলনায় খুচরা বাজারে অনেক ক্ষেত্রে কেজিতে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে রেলওয়ে মেন্স সুপার মার্কেটের ফল ব্যবসায়ী মো. বাবুল বলেন, নতুন চালান আসায় দাম ইতিমধ্যে কমতে শুরু করেছে। সরবরাহ আরও বাড়লে আগামী সপ্তাহে দাম কমতে পারে।
অভিযানে জরিমানা, নজরদারি অব্যাহত
খুচরা বাজারে অস্বাভাবিক দামের বিষয়টি নজরে এসেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরেরও।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ জানান, বাজারে অভিযান চালানো হয়েছে। বুধবার ফলমন্ডিতে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ১৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ বিষয়ে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
সব হিসাব মিলিয়ে মাল্টার বর্তমান বাজারচিত্রে দেখা যাচ্ছে, ৮৭ টাকার আমদানি মূল্যের একটি ফল বন্দরে পৌঁছেই শুল্ক-করসহ প্রায় ১৯৪ টাকা হয়ে যাচ্ছে। এরপর পরিবহন, নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি, সরবরাহ সংকট, পাইকারি-খুচরা পর্যায়ের মূল্য সংযোজন এবং বাড়তি চাহিদা যোগ হয়ে সেই মাল্টাই ভোক্তার বাজারে পৌঁছাচ্ছে সর্বোচ্চ ৫২০ টাকায়।
অর্থাৎ প্রশ্নটা শুধু মাল্টার দাম কত, তা নয়—৮৭ টাকা থেকে ৫২০ টাকার এই দীর্ঘ পথের প্রতিটি ধাপে আসলে কত টাকা যোগ হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।






















