বাবাকে খুঁটিতে বাঁধা দেখেছিল তুবা, এখন স্বপ্ন বিচারক হওয়ার

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৩:০৬:৪২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৪ বার পড়া হয়েছে
এক হাতে খাবারের প্লেট, অন্য হাতে বাবার মুখের কাছে খাবার তুলে দিচ্ছে ছোট্ট তুবা। অথচ তার বাবা তখন স্বাভাবিকভাবে বসে নেই—একটি খুঁটির সঙ্গে বাঁধা। চারপাশে মানুষের ভিড়। ছোট্ট মেয়েটির চোখের সামনে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন তার বাবা অনিক সরদার।
গত ২৬ সেপ্টেম্বরের সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছিল ফেসবুকে। মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় ভিডিওটি। বরিশালের উজিরপুরের বামরাইলের অনিক ও তার পরিবারের জীবনের কঠিন বাস্তবতা তখন পৌঁছে যায় দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহু মানুষের কাছে।
সেই ঘটনার কয়েক দিন পর বদলেছে দৃশ্যপট। মাদকাসক্তি থেকে মুক্ত করতে অনিককে ভর্তি করা হয়েছে বরিশালের নিউ লাইফ নামের একটি বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে। আর বাড়িতে দুই মেয়েকে নিয়ে অপেক্ষায় স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদাউস—একটাই আশা, চিকিৎসা শেষে স্বামী আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন।
কিন্তু স্বামী ফিরলেও সামনে যে জীবন, সেটি কীভাবে সামলাবেন—এই প্রশ্নটাই এখন জান্নাতুলের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।
৩০ সেপ্টেম্বর সকালে বামরাইল গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুই মেয়েকে নিয়ে শ্বশুরের ভিটায় দিন কাটছে জান্নাতুলের। এইচএসসি পাস করেও তাঁর নিজের কোনো আয়ের পথ নেই। স্বামী মাঝেমধ্যে দিনমজুরের কাজ করতেন। সংসারে অভাব ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী।
অনিকের সঙ্গে বিয়ের পর নিজের পরিবারের কাছ থেকেও অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন জান্নাতুল। এখন স্বামী আর দুই মেয়েই তাঁর সবচেয়ে আপনজন। তাই স্বামীকে হারানোর ভয় নয়, বরং তাঁকে সুস্থ করে আবার সংসারে ফেরানোর আশাই আঁকড়ে আছেন তিনি।
তবে সেই আশার পাশাপাশি রয়েছে অনিশ্চয়তা।
সংসারে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ নেই। দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ, পড়াশোনা, খাবার—সবকিছু কীভাবে চলবে, সেটিও জানেন না জান্নাতুল। তবু পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ করতে চান না তিনি। সুযোগ ও সহায়তা পেলে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে চান।
এই অনিশ্চিত সংসারের মাঝেও সবচেয়ে উজ্জ্বল স্বপ্নটি ছোট্ট তুবার।
বাবার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনার সাক্ষী তুবা এখনো বাবাকে ভালোবাসে আগের মতোই। তার চোখে ভবিষ্যতের ছবিটাও পরিষ্কার—ভালো একটি স্কুলে পড়বে, অনেক দূর এগিয়ে যাবে, একদিন বিচারক হবে।
বাবাকে মানুষের সামনে হেনস্তা করার সেই দৃশ্যও ভুলতে পারেনি সে।
তুবার ভাষায়, অনেক মানুষের সামনে তার বাবাকে হেনস্তা করা হয়েছিল। সে সেখানে না থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত বলেও মনে করে সে।
একটি ভাইরাল ভিডিও হয়তো অনিকের পরিবারের দরজায় মানুষের সহানুভূতি এনে দিয়েছে। কিন্তু তুবার কাছে ঘটনাটি শুধু একটি ভিডিও নয়—এটি তার ছোট্ট জীবনে দেখা এক গভীর ক্ষত।
ঘটনার পর মুচলেকা নিয়ে অনিককে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে চিকিৎসার জন্য তাঁকে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এখন চিকিৎসা চলছে তাঁর। আর বাড়িতে বসে দিন গুনছেন জান্নাতুল ও দুই মেয়ে।
অনিকের চিকিৎসা ও পরিবারের খোঁজ নিতে এরই মধ্যে স্থানীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বাড়িটিতে গেছেন। উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা জানান, বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনায় আসার পর তিনি একাধিকবার পরিবারটির খোঁজ নিয়েছেন। সরকারি উদ্যোগে পরিবারটিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
মানুষের সহযোগিতাও পাচ্ছে পরিবারটি।
তবে সহযোগিতার চেয়েও জান্নাতুলের চাওয়া যেন আরও সহজ—স্বামী সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরুক, দুই মেয়ে মানুষের মতো মানুষ হোক।
আর তুবার স্বপ্নটা আরও বড়।
খুঁটির সঙ্গে বাঁধা বাবাকে খাবার খাওয়ানো সেই ছোট্ট মেয়েটি একদিন বিচারকের আসনে বসতে চায়। হয়তো সেদিন তার নিজের জীবনের সেই দৃশ্যটিও বারবার মনে পড়বে—যেদিন একজন অসুস্থ বাবার পাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট হাতে খাবার তুলে দিয়েছিল সে।
তুবার স্বপ্ন তাই শুধু নিজের ভবিষ্যৎ বদলের গল্প নয়; তার বাবার মতো আর কোনো মানুষ যেন প্রকাশ্যে অপমানিত না হন—সেই আকাঙ্ক্ষারও গল্প।






















