বাবা খুঁটিতে বাঁধা, হাতে চা-রুটি ছোট্ট মেয়ের—কী ঘটেছিল সেখানে?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৬:৫৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
খুঁটির সঙ্গে হাত-পা বাঁধা এক ব্যক্তি। চারপাশে মানুষের ভিড়। আর সেই ভিড়ের মধ্যেই বাবার মুখে চায়ে ভেজানো রুটি তুলে দিচ্ছে ছোট্ট এক শিশু। বরিশালের উজিরপুরের এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ভিডিওটি ধারণ করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী মিরাজ হোসেন ফরাজি। তিনি ফেসবুকে ভিডিওটি পোস্ট করে লেখেন, চুরির অভিযোগে ওই ব্যক্তিকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল। পাশে থাকা তার ছোট মেয়ে বাবাকে রুটি ও চা খাওয়াচ্ছিল।
মিরাজ হোসেন ফরাজি বলেন, বাজারে গিয়ে তিনি দেখতে পান, স্থানীয় কয়েকজন ওই ব্যক্তিকে চুরির অভিযোগে আটক করে রেখেছেন। পরে তার মেয়েকে বাবাকে চায়ে ভেজানো রুটি খাওয়াতে দেখেন। দৃশ্যটি দেখে তিনি ভিডিও করেন এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন।
কী ঘটেছিল সেদিন?
পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুক্রবার রাতে স্থানীয় একটি বাজারের কয়েকজন ব্যক্তি ওই ব্যক্তিকে আটক করেন। তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ আনা হয়। পরে তাকে মারধর করে একটি খুঁটির সঙ্গে রাতভর বেঁধে রাখার অভিযোগ ওঠে।
শনিবার সকালে বিষয়টি জানতে পেরে সেখানে যায় তার বড় মেয়ে। স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এই শিক্ষার্থী বাবার কাছে গিয়ে তাকে চা ও রুটি খাওয়াতে থাকে।
সেই মুহূর্তের ভিডিওই পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওটির সঙ্গে মিরাজ হোসেন ফরাজি লেখেন, শিশুটির কাছে জানতে চাইলে সে জানায়, খুঁটির সঙ্গে বাঁধা ব্যক্তি তার বাবা। এরপর তিনি দেখেন, মেয়েটি রুটি ছোট ছোট টুকরো করে চায়ে ভিজিয়ে বাবাকে খাওয়াচ্ছে।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই শিশুটির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং ঘটনাটিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার আহ্বান জানান।
চুরির অভিযোগ কতটা সত্য?
আটক ওই ব্যক্তি অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা চুরির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে চুরির অপবাদ দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল।
অন্যদিকে স্থানীয়দের ভাষ্য, এর আগেও তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। তার মাদক সেবনের অভিযোগও রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
উজিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ফারুক হোসেন বলেন, স্থানীয়রাই ওই ব্যক্তিকে আটক করেছিলেন এবং পরে ছেড়ে দেন। স্থানীয়দের কাছ থেকে তার মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগের কথা পুলিশ জানতে পেরেছে। তবে লিখিত অভিযোগ না থাকায় তখন পুলিশ কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি।
প্রশাসনের উদ্যোগ
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয় বাসিন্দা ও শিশুটির পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন।
তিনি জানান, স্থানীয়দের কাছ থেকে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ এবং মাদক সেবনের বিষয়ে তথ্য পেয়েছেন। তবে শিশুটিকে বাবাকে খাওয়ানোর দৃশ্যটি তাকে নাড়া দিয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিশুটির পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং শিশুটির নামে একটি স্টুডেন্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ইউএনও বলেন, শিশুটি যেন ঘটনার নেতিবাচক প্রভাবের কারণে পড়াশোনা থেকে ঝরে না পড়ে, সে বিষয়েও প্রশাসন নজর রাখবে।
বাবাকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো
উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ওই ব্যক্তিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউএনও।
তার ভাষ্য, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে ওই ব্যক্তিকেও সহায়তা করা হবে।
এদিকে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে, শিশুটির আরও এক বোন রয়েছে। পরিবারটি ওই এলাকাতেই বসবাস করে। শিশুটির বাবা জানিয়েছেন, জমিজমা নিয়ে বিরোধের কারণেই তাকে চুরির অপবাদ দেওয়া হয়েছে।
তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা চুরির অভিযোগের সত্যতা এখনো আইনগতভাবে প্রমাণিত হয়নি।
একটি শিশুর হাতে বাবাকে চা-রুটি খাওয়ানোর সেই দৃশ্যই শেষ পর্যন্ত সামনে এনেছে আরও বড় একটি বাস্তবতা—অভিযোগের বিচার বা আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো ব্যক্তিকে মারধর করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখার ঘটনা যেমন গুরুতর, তেমনি এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে পরিবারের শিশুদের ওপর।






















