অর্ণবের মৃত্যু রহস্যের কিনারা নেই, পরিবারের দাবি হত্যা—পুলিশ বলছে আত্মহত্যার সম্ভাবনা

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:১৯:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
রাজধানীর ধানমণ্ডিতে আল মুক্কাবির ইসলাম অর্ণবের রহস্যজনক মৃত্যুর ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ পরিবারের। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় তদন্তও দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অন্যদিকে অর্ণবের পরিবার শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, শতকোটি টাকার সম্পত্তির বিরোধকে কেন্দ্র করে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, এখন পর্যন্ত তদন্তে পাওয়া তথ্য ও ঘটনাস্থলের ফুটেজে অর্ণব একাই ছিলেন। প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার সম্ভাবনাই বেশি মনে হচ্ছে। অবশ্য তদন্ত শেষ হওয়ার আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যেতে চায় না পুলিশ।
যেভাবে মৃত্যু অর্ণবের
গত ২ মে দুপুরে ধানমণ্ডির ১১ নম্বর সড়কের একটি ১১তলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে ৩৪ বছর বয়সী অর্ণবের মৃত্যু হয়। পুলিশ জানায়, ভবনের লিফটের মেশিন কক্ষের ওপর থেকে নিচে পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
প্রথমে এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়। পরে অর্ণবের মা হালিমা খাতুন গত ২১ মে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১২ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
মামলায় অর্ণবের কয়েকজন চাচা ও ফুপুসহ স্বজনদের বিরুদ্ধে সম্পত্তির বিরোধকে কেন্দ্র করে হত্যার পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হয়।
সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের অভিযোগ
এজাহারে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, অর্ণবের বাবা রফিকুল ইসলাম মারা যাওয়ার পর তার রেখে যাওয়া বিপুল সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরিবারের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। অর্ণব নিজের পৈতৃক সম্পত্তি ভোগদখল, বিক্রি বা হস্তান্তরের চেষ্টা করলে স্বজনদের সঙ্গে তার বিরোধ আরও বাড়ে।
পরিবারের দাবি, অর্ণবকে বিভিন্নভাবে মানসিক চাপ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এমনকি তাকে সম্পত্তি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও দাবি করা হয়েছে, অর্ণবকে ঘুমের ওষুধ বা অন্য কোনো অচেতনকারী দ্রব্য খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে তাকে হত্যা করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ পরিবারের।
তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন; আদালতে প্রমাণিত নয়।
মৃত্যুর আগে কী বলেছিলেন অর্ণব?
অর্ণবের মা হালিমা খাতুনের দাবি, মৃত্যুর আগের দিন রাতে অর্ণব তাকে ফোন করেছিলেন। রাত ১০টার দিকে ফোন করে অর্ণব নাকি বলেছিলেন, ‘মা, চলো আমরা দেশের বাইরে চলে যাই।’
তার মায়ের ভাষ্য, অর্ণব নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং গত দুই বছর ধরে কয়েকজন স্বজনের কাছ থেকে হুমকি ও অপমানের শিকার হচ্ছিলেন।
হালিমা খাতুন দাবি করেন, বাসায় কর্মরত দুই গৃহকর্মী ও অর্ণবের এক চাচাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনার প্রকৃত তথ্য পাওয়া যেতে পারে। খাবারে চেতনানাশক বা অন্য কোনো পদার্থ মেশানো হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
কী বলছে পুলিশ?
ধানমণ্ডি থানার ওসি মো. ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব বলেন, পুলিশ যে সিসিটিভি ফুটেজ পেয়েছে, তাতে অর্ণবকে একাই দেখা গেছে। ছাদ থেকে পড়ার সময় তার পাশে অন্য কেউ ছিল না বলেও জানান তিনি।
ওসি বলেন, অর্ণবের বাবার সম্পত্তি নিয়ে চাচাদের সঙ্গে বিরোধের বিষয়টি তদন্তে পাওয়া গেছে। তবে অর্ণবকে হত্যা করা হয়েছিল নাকি তিনি আত্মহত্যা করেছেন—এখনো নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
তার ভাষ্য, তদন্ত শেষ হওয়ার পর এবং প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বলা যাবে।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষা
পরিবারের অভিযোগ, মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের এখনো যথাযথভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা ইতোমধ্যে কয়েক দফা সময় নিয়েছেন বলেও দাবি করেছে পরিবার।
অর্ণবের মা হালিমা খাতুন বলেন, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তারা তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছেন না। মামলার আসামিরা জামিনে থাকলেও সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
এ ঘটনায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ধানমণ্ডি থানার এসআই আব্দুল করিম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অর্ণবের মৃত্যুকে ঘিরে তাই এখনো দুটি প্রশ্নই সামনে—এটি কি আত্মহত্যা, নাকি পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, সাক্ষ্য-প্রমাণসহ তদন্তের অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণের পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে।





















