বাংলাদেশে অল্প বয়সে আকস্মিক মৃত্যুর প্রধান পাঁচ কারণ

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৯:১০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
অফিসে কর্মব্যস্ততার মধ্যেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া, কিছুক্ষণের মধ্যে জ্ঞান হারানো কিংবা বাসায় ফেরার পর হাসপাতালে মৃত্যু—সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনা প্রায়ই সামনে আসছে। অনেক ক্ষেত্রেই বাইরে থেকে সুস্থ মনে হওয়া মানুষের আকস্মিক মৃত্যুর পেছনে থাকে এমন কিছু অসংক্রামক রোগ, যেগুলো দীর্ঘদিন নীরবে শরীরে বাসা বাঁধতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর বড় একটি অংশের জন্য দায়ী স্ট্রোক, হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ক্যান্সার ও কিডনি জটিলতার মতো অসংক্রামক রোগ। এসব রোগ শুধু বয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; কর্মক্ষম বয়সেও এগুলো মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
অল্প বয়সে আকস্মিক বা অকাল মৃত্যুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি কারণ হলো—
১. হৃদ্রোগ ও হার্ট অ্যাটাক
আকস্মিক মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ হৃদ্রোগ। হার্টে রক্ত সরবরাহকারী ধমনিতে বাধা তৈরি হলে হৃদ্যন্ত্রের পেশিতে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। এ অবস্থাই হার্ট অ্যাটাকে রূপ নিতে পারে।
আগে থেকে বড় কোনো রোগ ধরা না পড়লেও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা, ব্যথা হাত-ঘাড়-চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমিভাব বা বমি—এসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
২. স্ট্রোক
হার্ট অ্যাটাকের মতোই স্ট্রোকও জীবনহানির বড় কারণ। তবে দুটির অবস্থান ও প্রক্রিয়া আলাদা। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে অথবা কোনো রক্তনালি ছিঁড়ে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হতে পারে।
হঠাৎ শরীরের এক পাশ অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া, মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা, ভারসাম্য হারানো, তীব্র মাথাব্যথা, বমি বা খিঁচুনি—স্ট্রোকের সতর্কসংকেত হতে পারে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে কর্মরত ৪২ বছর বয়সী মুকসেমুল হাকিমের ঘটনাটিও এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ। কর্মস্থলে অসুস্থ বোধ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি গুরুতর বলে বুঝতে পারেননি তিনি। রাতে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা জানান, দুপুরেই তার স্ট্রোক হয়েছিল।
৩. উচ্চ রক্তচাপ ও এর জটিলতা
উচ্চ রক্তচাপকে অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়, কারণ দীর্ঘদিন কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই এটি শরীরে ক্ষতি করতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ হৃদ্যন্ত্র, মস্তিষ্ক, কিডনি ও রক্তনালির ওপর চাপ বাড়ায়।
দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ থাকলে হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিউর ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই বয়স কম হলেও নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
৪. ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতা
ডায়াবেটিস দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে হৃদ্রোগ ও কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে।
কিডনির কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেলে শরীরে বর্জ্য ও অতিরিক্ত তরল জমতে পারে এবং হৃদ্যন্ত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগ অনেক সময় ধীরে ধীরে এগোয় বলে নিয়মিত পরীক্ষা না করলে সমস্যা দেরিতে ধরা পড়তে পারে।
৫. দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ক্যান্সার
ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD), হাঁপানির মতো দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগও গুরুতর অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। শ্বাসনালির সমস্যা তীব্র হলে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে ক্যান্সারের কিছু ধরন দীর্ঘদিন উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। রোগ শনাক্ত হওয়ার আগেই কখনো কখনো জটিলতা তৈরি হয়ে গুরুতর অবস্থার সৃষ্টি হয়।
কেন বাড়ছে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি?
অসংক্রামক রোগের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। জিনগত প্রবণতার পাশাপাশি অনিয়মিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের ঘাটতি, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন ঝুঁকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আইইডিসিআরের গবেষণাতেও অসংক্রামক রোগকে অকাল মৃত্যুর গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাকেও কিছু গবেষণায় আকস্মিক মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
উপসর্গকে অবহেলা নয়
আকস্মিক মৃত্যু সবসময় আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব নয়। তবে শরীরে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে সাধারণ অসুস্থতা ভেবে উপেক্ষা করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষ করে বুকের মাঝখানে তীব্র বা চাপধরনের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, হঠাৎ শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া, মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
অল্প বয়স মানেই হৃদ্রোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি নেই—এমন ধারণা ভুল। নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা, রক্তচাপ-রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।























